বন সংরক্ষণ ও গুটিবাজি- রেং ইয়ং ম্রো

বাংলাদেশের বন বৈচিত্র‍্যের রক্ষক কারা এবং ভক্ষক কারা?এই প্রশ্নের উত্তর আগে আমাদের নিশ্চিত হয়ে নেওয়া দরকার। সাঙ্গু মাতামুহুরির রিজার্ভ ফরেস্টের জন্য যে পরিমাণ হাহাকার সম্প্রতি সৃষ্টি হয়েছে বন বৈচিত্র্য সংরক্ষণবাদীদের মধ্যে সেটারও একটা মূল্যায়ন আসবে তাতে করে। বাংলাদেশের যেসব জায়গায় বন টিকে আছে সেগুলো মূলত অধিকাংশই আদিবাসীদের বাসভূমি। রাষ্ট্রের উন্নয়ন কৌশল, ব্যপকভাবে আদিবাসী উচ্ছেদ, বিভিন্ন কোম্পানিকে ভূমি লিজ দিয়ে প্রাকৃতিক বন ধবংস করে রাবার, সেগুন প্রভৃতির বন সৃষ্টি ও পর্যটনসহ বিভিন্ন কাঠামোগত উন্নয়নের নামে নির্বিচারে বন ধবংস, সামাজিক বনায়নের নামে মনোপ্লান্টেশনের (Monoculture tree plantation) মাধ্যমে গাছ লাগিয়ে বনায়ন – এসবের কারণেই মূলত বন ধ্বংস হয়েছে। এই যে বনায়নের নামে রাবার, সেগুন, একাশিয়া, ইউক্যালিপটাস গাছগুলোর মনোপ্লান্টেশন হচ্ছে। এর ফলে মাটি,পরিবেশ ও প্রকৃতির কেমন ক্ষতি হচ্ছে সেটা সবাই জানি। এই বনায়নের কারণে পাহাড়ের মাটি অনুর্বর, মৃত হয়ে গেছে। প্রাকৃতিক বন ও ভূমি না থাকায় জুম ভূমি কমে গেছে। জুম নির্ভর মানুষগুলো জীবিকার প্রয়োজনে আরও প্রান্তিক সীমানায় সরে যেতে বাধ্য হয়েছে।

জুমচাষ ছাড়াও যেসব আদিবাসী জনগোষ্ঠী অন্যান্য চাষাবাদ পদ্ধতিতেও অভ্যস্ত ছিল তারাও বনায়নসহ বিভিন্ন নামে বেনামে উচ্ছেদের শিকার হয়েছে। চিম্বুকের নীচে টংকাবতী ও সুয়ালক ইউনিয়নের মাঝখানে এগার হাজার পাঁচশ একরের যে জায়গা একোয়ার করা হয়েছিল সেখান থেকে উচ্ছেদ হয়েছিল ২২ টি গ্রামের ম্রো পরিবার। এই গ্রামগুলোর অধিকাংশই জুমচাষের পাশাপাশি কৃষি জমি চাষ করত। ম্রো পাড়া থাকাকালীন সময়ে সেখানে পাড়াবন ছিল, প্রাকৃতিক গাছ ছিল, ছড়াগুলো ছিল জীবন্ত। আর এখন সেখানে বিভিন্ন কোম্পানি মনপ্লান্টেশন বাগান বসিয়েছে যথারীতি। বন ও বনের বৈচিত্র‍্যতা কোথাও চোখে পড়ে না।

লামা, রোয়াংছড়ি, বান্দরবান সদর, নাইক্ষ্যংছড়িতে বিভিন্ন কোম্পানির লিজ নেওয়া জায়গার পরিমাণ প্রায় ২০,০০০ একরেরও বেশি। এই লিজকৃত জায়গাগুলোয় রাবার বাগান ও বিশাল পরিমাণ জায়গাজুড়ে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এমন গাছের বনায়ন করা হয়েছে। এবং বলা বাহুল্য এই জায়গাগুলো থেকে বছরের পর বছর মানুষ উচ্ছেদ হয়েছে। এখনও হচ্ছে। এই গ্রামগুলো যখন ছিল বন তো ছিলই, বনের বৈচিত্র‍্যতাও ছিল। বন সংরক্ষণের জন্য দরকার ছিল এই বনকে ঘিরে যাদের জীবনযাপনের ধরণধারণ গড়ে উঠেছিল, বনের সাথে যাদের অভিযোজিত জীবন গড়ে উঠার সম্ভাবনা ছিল তাদের সাথে বোঝাপড়া করা। তাঁদের জীবনের মূল্যবোধ, সংস্কৃতিকে যথার্থ সম্মান দেওয়া। তাঁদের উপেক্ষিত না করে তাঁদের জীবন বিকশিত হওয়ার সুযোগগুলো অবারিত করে দেওয়া। বন বিভাগ নামে আমাদের দেশে যে একটা বিভাগ আছে এবং এই বিভাগের অন্যতম কাজ যে মধ্যে বালিশের নীচে টাকা জমানো এই পুরনো তথ্যও আমাদের কাছে অতীত হয়ে গেছে। এই অবস্থায় আমরা যখন কোন আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করব বন ও বনের সম্পদের শত্রু হিসেবে তখন খানিকটা খটকা লাগবেই।

সাঙ্গু, মাতামুহুরি রিজার্ভ ফরেস্টের আশেপাশে যেসব আদিবাসী জনগোষ্ঠী বাস করেন তাদের অধিকাংশই রাষ্ট্রের এই উন্নয়নের নামে চালানো আগ্রাসন, কোম্পানির লিজের নামে বন ভক্ষণ এবং এর ফলে বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদের শিকার হয়ে প্রান্তিকতার সীমানায় চলে যাওয়া মানুষ। প্রকৃতি ও বন সম্পর্কে তাদের সহজাত মূল্যবোধ কী কী সেগুলোর একটা ধারণা দেওয়া যেতে পারে এখানে। তাদের অধিকাংশই জুমচাষী এবং প্রকৃতি নির্ভর জীবনযাপন করেন। বনের গাছ (বিশেষ করে আপনারা যেগুলোকে মাদার ট্রি বলছেন) এবং বনের পশু হত্যা করাই তাদের একমাত্র কাজ এমনটা নয়। ম্রোদের মধ্যে একটা সামাজিক গোত্রভিত্তিক কিছু বিশ্বাস ও প্রথা এখনও বিদ্যমান। যেমন ম্রোদের চেন (গোত্র) ভিত্তিক বিশ্বাস অনুযায়ী অনেক প্রাণী হত্যা করা বারণ। যেমন- কোয়াং চেনদের ঈগল হত্যা ও খাওয়া নিষিদ্ধ, একইভাবে নাংচেনদের নাং নামের বন্য বিড়াল জাতীয় প্রাণী ও শিমুল ফুল খাওয়া নিষিদ্ধ। এইরকম প্রায় ৫৫ টিরও বেশি চেন রয়েছে ম্রোদের। একই সাথে জানিয়ে রাখি, সেখানে বাস করা মানুষগুলো সামাজিক রীতিনীতির প্রয়োজনে প্রচুর পরিমাণে শুকর ও মুরগি পালন করে থাকে। আর বনের মাদার ট্রি কাটার ব্যাপারটা জুমচাষীদের মধ্যে প্রচলিত নয়। মাদার ট্রি কেটে জুমচাষ করে না কেউ। মূলত রিজার্ভ ফরেস্ট কিংবা প্রাকৃতিক বন থেকে মাদার ট্রি কাটার ব্যাপারটা অনেক পুরনো বিষয়। উন্নয়নের সড়কে চড়ে যে ট্রাক পাহাড়ের বুক চিড়ে গিয়ে পৌঁছেছে, তার সাথে পৌঁছেছে লগারবৃত্তির ধ্যান ধারণা। লগারদের দৌরাত্ম্য আর যে উন্মাদনা শুরু হয়েছিল সেটা ছড়িয়েছিল স্থানীয় প্রতিনিধিদের মধ্যেও। এই যে বড় বড় গাছ কাটার প্রবণতা এটা আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীদের জীবনের মূল্যবোধের সাথে জড়িত নয়। বরং পাড়াবাম বা পাড়াবন সংরক্ষণের প্রথা আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের মধ্যে প্রচলিত একটি ঐতিহ্যবাহী প্রথা। পাড়ার লোকের প্রয়োজন অনুযায়ী এই সংরক্ষিত বন থেকে গাছ, বাঁশ বা প্রয়োজনীয় সম্পদ নেওয়া হয়ে থাকে।

এই মানুষগুলোকে প্রকৃতির বিরুদ্ধে দাড় করিয়ে দেবার আগে তাঁদের ফেলে আসা অতীত, বঞ্চনা ও উচ্ছেদের ও অস্বীকৃতির ইতিহাসকে অবশ্যই মাথায় আনতে হবে। এইসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন রেখে দুম করে তাঁদের স্থানান্তর করে তাঁদেরকে সভ্যতার কাতারে আনতে চাওয়াটা হবে খুবই অসৌজন্যমূলক ও গর্হিত কাজ। একটা সভ্য জাতের সদস্য হিসেবে নিজেদের জীবনযাপনের ধরণধারণ নিয়ে কেউ যখন গর্ব অনুভব করেন তখন তাঁকে একই সাথে অন্য জাত, সম্প্রদায়ের জীবনযাপনের ধরণধারণকেও শ্রদ্ধার চোখে দেখতে হবে।

এই মানুষগুলোকে আমরা যখন মনে করব যে চাইলেই তাদেরকে স্থানান্তরিত করে ফেলব সেটা হবে আসলে তাদের পুরনো অতীতকে একটু ঘষেমেজে সামনে এনে দেওয়া। স্রেফ নতুন বোতলে পুরান মদের মত ব্যাপার। যে মানুষগুলো প্রতারিত হয়েছে বারবার, তাঁদের নিজের মত করে বাঁচবার যে অধিকার ছিল সেটাকে যে অনেক আগেই বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিয়েছে এই রাষ্ট্রযন্ত্রের সিস্টেম, সেই সিস্টেমকে বৈধতা দেওয়া এবং তাঁদেরকে উপেক্ষিত রাখা ছাড়া আর কিছু নয়। থানছি থেকে আলীকদমের রাস্তা হওয়ার সাথে সাথে আশেপাশের সব বন, বনের গাছ এবং বনের বৈচিত্রতা উধাও হয়ে গেল! কেউ টু শব্দটিও করল না। থানচি থেকে তাজিংডং হয়ে শেষ সীমানা পর্যন্ত উন্নয়নের মহাসড়ক এগিয়ে যাচ্ছে। তাজিংডং এ ইটভাটা হয়েছে। কেউই কথা বললেন না! ক্রাউডং (আপনাদের ঘোড়াড্ডিম পাহাড়) থেকে লিক্রির দিকে সড়ক হচ্ছে। বন, বনের গাছ, মাদার ট্রি সব উধাও হচ্ছে। এই মাদার ফাদার ট্রি কোথায় যায়? শহুরে, সভ্য মানুষের ঘরে ঘরে যে সৌখিন সোফা, খাট, আলমারির কাঠ কোত্থেকে আসে? কারা নিয়ে যায়? এই মাদার ট্রিগুলোর সোফা তো কোন আদিবাসী মাচাংঘরে দেখলাম না! মানুষগুলো উচ্ছেদ হচ্ছে! এখন আবার সাংগু, মাতামুহুরির বন রক্ষার দায় তাঁদের ওপর চাপানো কি ঠিক হবে? এরা যাবেটা কোথায়?। কেন আমরা বাংলাদেশের সব বন সংরক্ষণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব না। বন সংরক্ষণের নামে কেন এই আদিবাসী মানুষগুলোকে খেসারত দিতে হবে বারবার?
বন সংরক্ষণের নামে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করার জন্য পুরনো ষড়যন্ত্র ছিল এবং এখনো চলছেই। আমি আশা রাখতে চাই, বন রক্ষার নামে কেউই কিংবা কোন সংগঠন যেন এই ষড়যন্ত্রের গুটি হিসেবে ব্যবহৃত না হয়।

রেং ইয়ং ম্রো, শিক্ষার্থী; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *