প্রতিষ্ঠার ৩১ বছরঃ জুম্ম ছাত্র সমাজের প্রতি – নিপন ত্রিপুরা

২০ মে ১৯৮৯ পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগনের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক দিন। এদিন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বে জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এক নতুন মাত্রা যোগ হয়। ১৯৮৯ সালে ৪ মে রাঙ্গামাটির লংগদুতে জুম্ম জগণের বিরুদ্ধে শাসকশ্রেণির পরিকল্পিত জঘন্যতম হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে রক্তচক্ষু ও বুলেট উপেক্ষা করে ২০ মে ১৯৮৯ সালে ঢাকার বুকে জন্ম নেয় পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ। সময়ের হাত ধরে তার অকুতোভয় আপোষহীন দীর্ঘ গণতান্ত্রিক লড়াই সংগ্রাম এ বছর ৩১ বছর পূর্ণ হতে চলেছে।

ছাত্র সমাজ যেকোন দেশ, সমাজ ও জাতির ভবিষ্যৎ ও কান্ডারি। যখন অপসংস্কৃতির আগ্রাসন, বিজাতীয় শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক শাসন-শোষণ, জাতীয় মূল্যবোধের নৈতিক অবক্ষয় ঘটে তখন ছাত্র সমাজ সুসংগঠিত হয়ে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও আদর্শকে ধারণ করে মুক্তির নিশানা নিয়ে সর্বাগ্রে এগিয়ে এসেছে। ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের আন্দোলনের ধারাক্রম পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাজনৈতিক আন্দোলনে ছাত্র সমাজ সক্রিয় ভূমিকা পালন করে এসেছে। ছাত্র সমাজের আন্দোলনকে বাদ দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূথানের কথা কখনোই কল্পনা করা তথা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস রচিত হতে পারেনা। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুথান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ছাত্র সমাজের শক্তিশালী ভূমিকা রয়েছে।

পাহাড়ী ছাত্র সমিতি
ইতিহাসের পরিক্রমায় পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক আন্দোলনের বুকে ছাত্র সমাজের একগাদা ইতিহাস আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে। খুব বেশী দূরে নয়, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের অ- মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রামকে জুম্ম জনগণের মতামত ব্যতিরেকে জোরপূর্বক পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিবাদে জুম্ম ছাত্র সমাজ স্নেহ কুমার চাকমা ও ঘনশ্যাম দেওয়ানের নেতৃত্বে ভারতের অন্তর্ভক্ত করার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছিল। পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নির্মিত ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম প্রতিবাদ জানিয়েছিল এম এন লারমার নেতৃত্বে তৎকালীন জুম্ম ছাত্র সমাজ। কাপ্তাই বাঁধ বিরোধী লিফলেট লেখা,বন্টন এবং জনগণকে সংগঠিত করার দায়িত্বও পালন করেছিল। প্রয়োজনের তাগিদে সালে পাহাড়ী ছাত্র সমিতি গঠন। যার নেতৃবৃন্দ ষাট- সত্তর দশক পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাংগঠনিক কাজে নেমে যাওয়া। ৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে পাহাড়ী ছাত্র সমিতি সমর্থিত প্রার্থী তরুণ জম্ম ছাত্রনেতা আওয়ামীলীগের প্রার্থীকে হারিয়ে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ ছাত্র সমাজকে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের দিকে বেশী টানে। দেশ স্বাধীন করার জন্য সংগ্রামের জোয়ারে পাহাড়ী ছাত্র সমাজের নেতৃবৃন্দ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করার জন্য প্রস্তুতি নিলে পাকিস্তানে সরকারের রোষানলে পড়ে আতœগোপনে যেতে বাধ্য হয়। গণ আন্দোলনের সময়ের দিঘীনালায় পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উড়ালে দিঘীনালা থানায় বর্তমান আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ( সন্তু লারমা) সহ আরও অনেক জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা দায়ের করা হয়। ‘৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান প্রনয়ণ করার প্রাক্কালে রাঙ্গামতির শহরে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে পাহাড়ী ছাত্র সমিতি কর্তৃক প্রতিবাদ মিছিল হয়েছিল। এম এন লারমার উত্থাপিত ৪ দফা ভিত্তিক আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের রুপরেখা শেখ মুজিব রহমান কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর সময়ের দাবিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের বুকে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি গঠনে এম এন লারমার নেতৃত্বে বড় ভূমিকা পালন করেছিল তরুণ জুম্ম ছাত্র সমাজ । ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ জাতীয় নির্বাচনে সেসময় ভূমিধস জনপ্রিয় দল আওয়ামীলীগ ও জাসদের প্রার্থীকে মুখ থুবড়ে দিয়ে উত্তরাঞ্চল থেকে এম এন লারমা ও দক্ষিণাঞ্চল থেকে চাথোয়াই রোয়াজা বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ জুম্ম জনগণের মুক্তির সংগ্রামকে আরও বেগবান করে তোলে। সুগম ও সুদৃঢ় হয়ে উঠে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ। সে সময় সংসদের ভেতরে বাইরে এম এন লারমার সাথে সর্বক্ষণ ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রম জনসংহতি সমিতির বর্তমান সহ- সভাপতি শ্রী ঊষাতন তালুকদার, আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য শ্রী গৌতম কুমার চাকমা প্রমুখ পাহাড়ী ছাত্র সমিতির সাবেক নেতৃবৃন্দ। ‘৭৩ সালে পাহাড়ী ছাত্র সমাজ গণতান্ত্রিক আন্দোলন থামিয়ে অনিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের দিকে উজ্জিবিত হয়ে উঠে । ‘৭৫ এর ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবর রহমানকে হত্যাকান্ডের পর দেশে সেনাশাসন শুরু হলে পাহাড়ী ছাত্র সমিতির নেতৃবৃন্দ এম এন লারমাকে নিয়ে গেরিলা জীবনের দিকে রাঙ্গামাটি শহর ত্যাগ করেন। দীর্ঘ ২২ বছর যাবত অসম যুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীকে পরাস্ত করে বাংলাদেশ সরকারকে চুক্তিতে আসতে বাধ্য করা পাহাড়ী ছাত্র সমিতির এক গৌরবময় অর্জন । এখনও লোকমুখে শান্তিবাহিনীর বীরত্বগাথার কথা শুনি।


পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ
আশির দশক। অধিকারের দাবিতে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামে চলছে তখন প্রতিরোধ সংগ্রাম। সেই উত্তাল সময়ের দিনগুলোর কথা পার্টির, বর্তমান ও সাবেক পিসিপির নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে শুনলে তাজা একটা স্মৃতি ভেসে উঠে। তখন চলছিল চলছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বে আতœনিয়ন্ত্রাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জুম্ম জনগণের সশস্ত্র আন্দোলন। সারা পার্বত্য চট্টগ্রাম নিরাপত্তার ছাউনীতে ঢাকা। গণতান্ত্রিক কন্ঠ রুদ্ধ ও মানবাধিকার বিপর্যস্ত। অস্ত্রের ঝনঝনানী আর গোলাবারুদের পোড়াগন্ধে আকাশ-বাতাস ভারাক্রান্ত। মানবতা লুন্ঠিত। পাহাড়ে কি হচ্ছে কি হচ্ছে না সে বার্তাটুকু সমতল অঞ্চলের দুই একজন ছাড়া বাকিরা তেমন কিছুই জানত না। স্বৈরাচার ও জলপাইয়ের শাসনের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে টু শব্দ করার মতন হাতেগোনা দুয়েক জন ছাড়া কোন ব্যক্তি বা সংস্থাকে দেখা যায়নি। এসব অন্যায়- অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিভিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত জুম্ম ছাত্ররা বিছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে প্রতিবাদ করলেও শাসকগোষ্ঠীকে আঘাত দেয়ার মতন এসব প্রতিবাদ সমাবেশ যথেষ্ট ছিল না। অনেকের মুখে শুনেছি হীরক রাজার দেশের কায়দায় সে সময় বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করে কারোর কাছে পড়ার পাঠ্য পুস্তক পাওয়া গেলে সে বইও পুড়িয়ে দেয়া হত যাতে তারা শান্তিবাহিনীর আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হতে না পারে। ১৯৮৯ সালের ৪ ঠা মে ঘটে যাওয়া বিভিষিকাময় লংগদু গণহত্যা সমগ্র পাহাড়ী ছাত্র সমাজের মধ্যে বিশাল রেখাপাত করে। অধিকার আদায়ের দাবিতে জুম্ম ছাত্র সমাজ তখন ঐক্যবদ্ধতার পতাকা তলে সমবেত হওয়ার তাড়না জাগে। যার প্রেক্ষিতে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের জন্মলাভ। প্রতিষ্ঠার পর পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ জুম্ম জনগনের উপর সংঘটিত সকল প্রকার অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম, নির্যাতন, নিপীড়নের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিকভাবে তীব্র আন্দোলন ও সংগ্রাম সূচনা করে। পাশাপাশি এ ন্যায় সংগত আন্দোলনে সারা দেশের প্রগতিশীল শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীও রাজনৈতিক সংগঠনসমূহকে যুক্ত করেন। বলা যেতে পারে পিসিপির মাধ্যমে সর্বপ্রথম সমতলের জনগণের সাথে পাহাড়ের জনগণের সেতুবন্ধন তৈরী হয়। পিসিজেএসএস ও পিসিপি মিলে জুম্মদের আতœনিয়ন্ত্রাধিকার আন্দোলনকে শক্তের উপর দাঁড় করায়। শুরু হয় জুম্ম জনগণকে অধিকার দেয়া ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন বন্ধ করার দাবিতে পাহাড়ী জনগনের সাথে একাতœতা জানিয়ে সমতলের এলাকার প্রগতিশীল ব্যক্তি, সংগঠনসমূহের আন্দোলন। যা এখনো অবধি বহমান। বলা যায় যা পিসিজেএসএসের আন্দোলনের কৌশলকে কিছুটা সহজ করে দেয়। আজও বাংলাদেশের নানান জায়গায় পাহাড়ীদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে সদা সোচ্চার। পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কর্মীরাও গ্রামে গ্রামে গিয়ে জনগণকে জনসংহতি সমিতির আন্দোলন সংগ্রামে যুক্ত হওয়ার জন্য ব্যাপক উদ্বুদ্ধ করেন।

মানব সমাজের ইতিহাস উৎপাদন সংগ্রাম, শ্রেণি সংগ্রামে ইতিহাস। পৃথিবীতে যা কিছু অগ্রগতি ও পরিবর্তন, বিবর্তন এসেছে হয়েছে তার সবই হয়েছে দ্বন্ধের মধ্যে দিয়ে প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে প্রগতির শক্তির জয়লাভের মধ্যে দিয়ে। রাজনৈতিক অধিকার ছাড়া পৃথিবীতে কোন জাতি, সমাজ টিকে থাকতে পারেনা। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতৃবৃন্দ শাসকগোষ্ঠীকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের জন্য আহবান জানিয়েছিলেন বটে কিন্তু তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী সেসব কর্ণপাত না করে সামরিকবাহিনীর ধমন-পীড়নের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করার জন্য হঠকারীতামূলক সিধান্ত নিলেও শেষ পর্যন্ত পরাজয় মেনে চুক্তিতে যেতে বাধ্য হয়। যা পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের অধিকারের সনদ নামে পরিচিত । ১৯৯৭ সালে ২ ডিসেম্বর যে সরকারের সাথে পার্টির চুক্তি হয়েছিল সে দল সরকার ২০০৯ সাল থেকে টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকারের ক্ষমতায় । সর্বশেষ ভূমি কমিশন আইন ২০০১ সংশোধনের কাজে হাত দেওয়া ছাড়া আর কোন চুক্তি বাস্তবায়নের কার্যক্রম দৃশ্যত দেখা যায়নি। তথাপি তার বিধি এখনো প্রণয়ন করা হয়নি। দীর্ঘ ২২ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও চুক্তি দুই-তৃতীয়াংসহ মৌলিক বিষয়সমূহ বাস্তবায়ন না করে কালক্ষেপনের দৌড়ে সরকার এখন মশগুল। বরং চুক্তিকে পাশ কাটিয়ে দুর্দান্তগতিতে চুক্তিবিরোধী, জুম্মস্বার্থপরিপন্থী কাজ এগিয়ে চলছে। কাজে আঞ্চলিক পরিষদের শ্রদ্দেয় চেয়ারম্যানের মতে , “এ সরকারের কাছ থেকে চুক্তি বাস্তবায়ন আশা করা মস্ত বড় ভূল। নিজেদের পথ নিজেদের ঠিক করে নিতে হবে”। প্রতিষ্ঠার ৩১ বছর যাবত চোখে চোখে রেখে শাসকগোষ্ঠীর চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে লড়াই এখনো অব্যাহত রেখেছে। পিসিপির আন্দোলন সংগ্রাম এখনও শেষ হয়ে যায়নি। আশির দশকে পাহাড়ী ছাত্র সমিতি যেভাবে অধিকতর আন্দোলনে হাল ধরেছিল পাহাড়ী ছাত্র পরিষদও সেভাবে হাল ধরবে। প্রতিক্রিয়াশীল, চুক্তিবিরোধী ও জুম্মস্বার্থপরিপন্থীদের রুখে দিয়ে আত্মনিয়ন্ত্রাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নিবে । নতুন করে জুম্ম জনগণকে সংগঠিত করবে। ক্যজাই , লাল রির্জাভ, সনজিত, রুপম, সুকেশ, মনতোষ, সমর বিজয়, পেজকা, মংচসিং সহ গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে শহীদ হওয়া কর্মীদের রক্ত শপথে বলীয়ান হয়ে আত্মবলিদানের মন্ত্রে উজ্জিবিত হয়ে মুক্তি মিছিলে আগুয়ান হয়ে এগিয়ে যাবে।

জুম্ম ছাত্র সমাজের প্রতি
জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব আজ খাদের কিনারায়। অস্তিত্ব বাঁচানোর জন্য আমাদের জন্য তিনটা রাস্তা খোলা আছে। এক, সব অন্যায় মেনে নিয়ে চুপচাপ কি হয়েছে, কি হচ্ছে এসব না ভেবে ইসালাম ধর্মে ধমান্তরিত হওয়া। দুই, প্রাণ বাঁচানোর জন্য দেশান্তরী হওয়া। তিন, প্রতিরোধ সংগ্রামে সামিল হওয়া। প্রথম দুইটি রাস্তার সাপেক্ষে যদি প্রশ্ন করা হলে দিনশেষে আমরা কি আমাদের পরিচয়, স্বকীয়তা, বিশ্বাস যা জন্মলগ্ন থেকে পেয়েছি সেটাকে বিসর্জন দিতে পারি? প্রাণ বাঁচাতে পার্শ্ববর্তী দেশে আশ্রয় নিলে কি আমাদের জীবনে নিরাপত্তার কোন গ্যারান্টি পাওয়া যাবে? সেখানে গেলে কি সুখ পাব? সুখ- দুঃখ, শান্তি জন্মভূমিতে পাওয়ার মতন হয়না সুতরাং নিজের জন্মভূমিতে মানুষের মতন মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে। সে হিসেবে প্রথম দুটো রাস্তা আমাদের জন্য তেমন কোন সমাধানের নয়। সে হিসেবে আমাদের তৃতীয় পথটাকে চূড়ান্ত হিসেবে ধরে নিতে হবে। অন্যথায় পার্বত্য চট্টগ্রামের বুকে নিজেদের টিকিয়ে রাখা যাবেনা। তাই সংগ্রাম বিনা কোন বিকল্প নেই।

কিউবা বিপ্লবের মহানায়ক চে গুয়েভারা তার পিসিকে এক চিঠিতে লিখেছেন, “ আমার জীবনে আগেরকার অনেক সংকল্প নষ্ট হয়ে গেছে অপূর্ণতায় যতক্ষণ না আমি কাঁধের ঝোলা নিয়ে কমরেড গার্সিয়ার সঙ্গে বেড়িয়ে পড়েছি চড়াই উতরাই এর পথে, যে পথ আমাকে এখানে টেনে এনেছে । রাস্তায় ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির সাম্রাজ্যের মধ্যে দিয়ে আসার সুযোগ আমার হয়েছে এবং আমি বুঝে গেছি কতটা ভয়ংকর এ ধনী অক্টোপাসগুলো। আমি বৃদ্ধ ও শোকাহত স্তালিনের ছবির সামনে শপথ নিয়েছি যে যতদিন পর্যন্ত এই অক্টোপাসগুলোকে আমি খতম করতে না পারব ততদিন আমি থামব না। গুয়াতেমালাতে আমি নিজেকে আরও তৈরি করব এবং সত্যিকারের বিপ্লবী হতে যা যা করার আমি করব। আর্জেন্টিনায় বুয়েন্স এয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা শাস্ত্র নিয়ে অধ্যয়নের সময় নিছক আনন্দ পাবার জন্য ভ্রমণ যদি চে গুয়েভারাকে বিপ্লবী হতে অনুপ্রেরণা যোগালে চোখের সামনে চলমান ঘটনা পঞ্জি কি আমাদের কোন রকমের প্রতিরোধের মন্ত্র কি যোগাতে পারে না? এ যুগের ছাত্র সমাজ কি আত্মকেন্দ্রীকতায় জনম ভরে থেকে যাবে? পাহাড়কে নিজের মতন করে পেতে ইচ্ছা করে না? ধুদুকছড়া থেকে ঘুনধুম পর্যন্ত সর্বত্র কালো চশমার নিরাপত্তার ছাউনি দিয়ে অপারেশন উত্তরণ নাম দিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিশ্বাসী অধিকার কামী জুম্ম জনগন, সংগঠন ও কর্মী বাহিনীর উপর কাউন্টার ইন্সার্জেন্সি অব্যাহত রাখা, চুক্তি বাস্তবায়ন কার্যক্রম বসিয়ে রাখা,চুক্তিকে পাশ কাটিয়ে চুক্তি বিরোধী , জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী কার্যক্রম চালু করা, চুক্তিকে বাস্তবায়ন না করে উন্নয়নের বোঝা চাপিয়ে দেয়া, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কতৃক বৈষম্যমূলক ১১ দফা জারি করা , চুক্তি মোতাবেক অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার না করা, জুম্ম দালাল ও প্রতিক্রিয়াশীলদের দাপট , পর্যটনের নামে ভূমি বেদখল করে আদিবাসীদের দেশান্তর হতে বাধ্য করা, সেটেলার ও শাসক গোষ্ঠী কতৃক গোয়াবলেসীয় কায়দায় ইলেকট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়ায় অপপ্রচার, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ২০০ মারমা ও ম্রো পরিবারের কাপ্রু ম্রো পাড়া নাম বদলে চাকচিক্যের নীলগিরি, ৬৫ টি ত্রিপুরা পরিবারকে উচ্ছেদ করে রমরমা সাজেক পর্যটন, ট্রেনিং ক্যাম্প নাম করে তংকাবতীর দুই ম্রো গ্রামকে উচ্ছেদ, সেপ্রু পাড়ার নাম বদলে জীবন নগর, আলেক্ষ্যং থেকে আলিকদম, ১০০ ত্রিপুরা-মারমা ও তঞ্চগ্যা পরিবারকে উচ্ছেদ করে হুতাশনের নীলগিরি পর্যটন। লেফটেনান্ট ফেরদৌস কতৃক নারী নেত্রী কল্পনা চাকমার অপহরণের ঘটনা আমাদের রক্তে অণুরন ঘটায় না? গভীর রাতে অপারেশনের নাম করে দুই সেনাসদস্য কর্তৃক বিলাইছড়ি দুই মারমা বোনকে ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানি করার ঘটনা; বিজিবি সদস্য কর্তৃক বান্দরবানের আলীকদমের দুই ত্রিপুরা নারীকে ধর্ষণের ঘটনা কি আমাদের রক্তে স্পর্শ করেনা? নিরীহ জুম্মদের ধরে নিয়ে গিয়ে সন্ত্রাসী সাজিয়ে ক্রসফায়ার করার ঘটনা। সন্ত্রাসীর খোঁজার নাম করে গ্রামে গ্রামে রাতের আঁধারে হানা, শিক্ষিত যুবকদের মারধর, জোরপূর্বক জবানবন্দী আদায়। নামে বেনামে ভূমি বেদখল, জুম্মদের উচ্ছেদ, সেটেলার ও সেনা কতৃক জুম্ম নারী ধর্ষণ, হত্যা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি মানা যায় কি? যদি না হয়ে থাকে তাহলে বিকল্প রাস্তায় কেন হাঁটছিনা?

প্রতিরোধের আরেক সাহসী উদাহরণ হতে পারে পৃথিবীর বুকে রোমান সাম্রাজ্যকে সবর্শক্তিমাণ বলে মনে করা হত।। এ রোমান সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল দার প্রথার উপর ভিত্তি করে। দাসদের গরু ছাগলের মত্তো হাট বাজাড়ে বিক্রি করা হত। তাদের ব্যক্তি জীবনের উপর কোন অধিকার ছিলোনা। দাস মালিক তাদের যেভাবে ব্যবহার করত তাদের সেভাবেই চলতে হত। সমস্ত ধরনের নির্যাতনের স্টিম রোলার চালানো হত দাসদের উপর। অত্যাচারী সামন্তীয়দের বিরুদ্ধে দাসদের পক্ষে মুক্তির দূত হয়ে আসে স্পার্টাকাস। তার নেতৃত্বে দাসেরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সেই রোমান সাম্রাজ্যের উপর বছরের পর বছর ধরে আঘাত হেনেছিল। ঠিক তেমনি একদিকে প্রতিক্রিয়্শাীল সামন্ত সমাজ যখন পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম সমাজকে অক্টোপাশের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে সামনে অগ্রসর হতে দিচ্ছিলো না; পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জাতি যখন আপন সত্তা ও বৈশিষ্ট্য হারাতে বসলো; উগ্র ইসলামিক ধর্মান্ধ স্বৈরাচারী পাকিস্তান সরকার যখন কাপ্তাই বাঁধ থেকে শুরু করে একের পর এক হীন চেষ্টায় মেতে উঠলো ; স্বাধীন বাংলাদেশ হওয়ার পরও উগ্র জাতীয়তাবাদী সরকার জুম্ম ন্যায্য দাবি মেনে না নিয়ে উল্টো করে জুম্ম জাতিকে ধবংস করার চেষ্টায় লিপ্ত হলে ঠিক তখনই পাহাড়ের বুকে মুক্তির দূত হয়ে এম এন লারমার সমগ্র জুম্ম জাতিকে একতাবদ্ধ করে শাসকগোষ্ঠীর বুকে কড়াঘাত করেছিল। শাসকগোষ্ঠী জুম্ম জনগনের আন্দোলনকে নসাৎ করে দেওয়ার জন্য অনেক ষড়যন্ত্রের ফাঁদ পেতেছিল বটে; সে ফাদে কিছু সুবিধাবাদী, দালালী ও প্রতিক্রিয়াশীল দুই একজন পা দিলেও জুম্ম জনগণ তার আন্দোলনের রাস্তা ঠিকই খুজে নিয়েছিল। শাসকগোষ্ঠী যতই শক্তিশালী হোক না কেন ইতিহাসের পাতায় তারা কোন অজেয় নয়। জার্মানির হিটলার, ইতালির মুসোলিনী ,ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী, পাকিস্তানের আইয়ুব খান, স্বৈরাশাসক এরশাদেরা যতই বড় শক্তিশালী ছিল না দিনশেষে তারাই তো আবার শোচনীয় পরাজয় বরণ করেছিল। সুতরাং আমরাও সে ইতিহাসকে সামনে রেখে বলতে পারি ঐক্যবদ্ধ শক্তি দিয়ে আরও একবার শাসকগোষ্ঠীকে আঘাত করতে চাই। মানুষ স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে । পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ তার স্বপ্ন যাত্রা থামিয়ে রাখবেনা। অস্তিত্ব রক্ষার স্বপক্ষে রোমান সাম্রাজ্যের গ্লাডিয়েটরদের মতো সময়ের সাহসীর বুলেট শাসকগোষ্ঠীর বুকে চালাবে। ২২ বছর অনেক সময় হয়ে গেছে। শাসকগোষ্ঠীকে চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য অনেক সময় দেয়া হয়েছে, এখন সময় নিজেদের প্রস্তুত করা, পাল্টা আঘাত হানা । তার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ও পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের পতাকা তলে আপনাদের আহবান জানাই ।

এ লড়াই বাঁচার লড়াই, এ লড়াইয়ে জিততে হবে।

নিপন ত্রিপুরা;সাংগঠনিক সম্পাদক, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ।

পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের একত্রিশতম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে সংগঠনটি মুখপত্র কেওক্রডং এ প্রকাশিত।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *