রক্তাক্ত লোগাংঃ পাহাড়ী মানুষের অশ্রু- ইমতিয়াজ মাহমুদ

(১)
লোগাং গণহত্যা দিবস আজ। আপনি কি এই দিনটার কথা জানেন? বয়স্ক লোকজন অনেকেই জানার কথা। কিন্তু আমাদের সমতলের তরুণ বন্ধুরা, আপনারা কি জানেন এই গণহত্যাটির কথা? চলেন আপনাদেরকে এই ঘটনাটির কথা জানাই। মনে রাখবেন, এটা কোন গল্প নয়, অজানা অচেনা কোন বিদেশী রাষ্ট্রের ঘটনা নয়। নিতান্ত দিশী সত্য ঘটনা।

ঘটনার কাল ১৯৯২ সনের এপ্রিল মাসের দশ তারিখ। স্থান খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার লোগাং গ্রাম। দুইটা নদী বয়ে যায় গ্রামটার পাশ দিয়ে, একটা হচ্ছে চেঙ্গি নদী আরেকটা হচ্ছে লোগাং নদী। লোগাং নদী ছোট একটা নদী, অনেকে এটাকে নদীও বলে না, লোগাং খাল নামে চেনে। লোগাং এর নাম লোগাং কি করে হলো? এই সরু নদীটার পানির রঙ হয় একটু লালচে ধরনের, অনেকটা রক্তের মতো। রক্তের মতো ঐরকম গাঢ় লাল নয়, তবুও রক্তের মতোই। সেই থেকে এই নদীটার নাম হয়েছে লোগাং। লো বা লৌ মানে হচ্ছে রক্ত আর গাং মানে নদী- রক্তের নদী।

লোগাং নদীর এই নাম কে রেখেছিল কবে রেখেছিল জানিনা, কিন্তু যারাই এই নাম রেখেছিলেন ওরা যেন নদীটার এই নাম রেখে একটা প্রফেসি করেছিলেন, একটা ভবিষ্যতবাণীর ইঙ্গিত করেছিলেন যে একদিন এই নদী আসলেই একটা রক্তের নদীতে পরিণত হবে। যারা এই নদীর নামে নাম রেখেছিলেন নিজেদের গ্রামের, ওরা যেন সেই ব্যাপারটাই বলেছিলেন তখন- এই গ্রামের মানুষের এতো রক্ত ঝরবে, এতো রক্ত ঝরবে যেন একদিন সত্যিই এই নদীটা হবে রক্তের নদী। (বাংলায়ও আমাদের একইরকম একটা কথা আছে- রক্তগঙ্গা।)

(২)
সেদিন সেই লোগাংএর গুচ্ছ গ্রামের পাশে গরু চড়াতে না যেন কি কাজে গয়েছিল দুইজন পাহাড়ি নারী। সেখানে কয়েকজন বাঙালী সেটেলার ছেলে ওদেরকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। দুই দুইজন বাঁচার জন্যে চিৎকার চ্যাঁচামেচি শুরু করে দেয় আর নিজেদের হাতের দা দিয়ে নিজেদেরকে রক্ষার চেষ্টা করে। ওদের চিৎকার শুনে একজন কি দুইজন পাহাড়ি পুরুষ গিয়েছিল সেখানে। এইরকম পরিস্থিতিতে কি হতে পারে সে তো আপনি কল্পনা করতে পারেন। মেয়ে দুইটা আহত হয়েছিল। দুই তিনজন সেটেলার ছেলেও আহত হয়েছিল। এই আহত সেটেলারদের মধ্যে কবির নামের একজন পরে হাসপাতালে মারা যায়।

এই ঘটনার পর সন্ধ্যার দিকে লোগাং গ্রামের পাশে জড়ো হয়ে বাঙালী সেটেলার আর বিডিআরএর লোকজন পাহাড়িদের গুচ্ছগ্রাম ঘিরে ফেলে। ওদের হাতে ছিল দেশী ধারালো হাতিয়ার বন্দুক রাইফেল সবকিছু। গ্রাম ঘিরে ওরা আগুন জ্বালিয়ে দেয় শোন বাঁশ বেতের তৈরি সাড়ে পাঁচশ কি ছয়শ ঘরে। পাহাড়িরা যারা সেইসব জ্বলন্ত ঘর থেকে পালানোর চেষ্টা করেছে ওদের উপর হামলাকারীরা ঝালিয়ে পড়েছে, কুপিয়ে মেরেছে, গুলি করে মেরেছে। দৃশ্যটা কল্পনা করুন, শত শত ঘর জ্বলছে আগুনে আর সেই আগুণের আলোয় যখনই কোন পাহাড়িকে দেখা যাচ্ছে পালানোর চেষ্টা করতে তাকেই গুলি করে মারার চেষ্টা করছে হামলাকারীরা। সেদিনের চৈত্রের সেই সন্ধ্যায় সেখানে যেন লেগেছিল এক পাহাড়ি হত্যার উৎসব।

কতজনের মৃত্যু হয়েছিল সেদিন? প্রকৃত সংখ্যা হয়তো আমরা আর কোনদিনই জানতে পারবো না। কেননা এই ঘটনার পর ঐ এলাকায় যেতে দেওয়া হয়নি কাউকে। ঘটনার পরদিন ঢাকা থেকে একদল বুদ্ধিজীবী লেখক আইনজীবী সাংবাদিক যেতে চেয়েছিলেন ঘটনাস্থল দেখতে। এই দলে ছিলেন প্রফেসর আনু মোহাম্মদ, ব্যারিস্টার লুতফর রহামান শাহজাহান (ইনি মারা গেছেন), ব্যারিস্টার সারা হোসেন, সাংবাদিন বিপ্লব রহমান এরক আরও অনেকে। এই দলটিকে পানছড়ির ওখানে এক জায়গায় থামিয়ে দেও মিলিটারির লোকেরা। ওদেরকে ঘটনাস্থলে যেতে দেওয়া হয়নি।

সাধারণভাবে অনুমান করা হয় যে চারশর মতো পাহাড়ি আদিবাসীকে হত্যা করা হয়েছিল সেদিন। এদের মধ্যে নারী আছে, শিশু আছে বয়োজ্যেষ্ঠ- সবাই আছে। হত্যা করা হয়েছে গুলি করে, কুপিয়ে, আগুনে পুড়িয়ে।

(৩)
এই ঘটনার নিয়ে সেসময় ঢাকায় এবং দেশের বাইরে বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ হয়েছিল। ভালোই প্রতিবাদ হয়েছিল। এইসব প্রতিবাদ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সরকার একটা তদন্ত কমিটিও গঠন করেছিল। এক সদস্যের সেই তদন্ত কমিশনের সদস্য ছিলেন জাস্টিস সুলতান হোসেন খান। সুলতান হোসেন খানের তদন্ত কমিশন একটা রিপোর্ট দিয়েছিল বটে, কিন্তু সেই রিপোর্ট কোনদিন প্রকাশিত হয়নি। সরকার এই রিপোর্টের সারাংশ বিতরণ করেছিল সেসময়। কিন্তু সুলতান হোসেন খান আর তার তদন্ত কমিশন আর তার রিপোর্ট এইগুলি কোনটারই বিশ্বাসযোগ্যতা নাই।

সেই সময় কার খবরের কাগজগুলিতেও এই ঘটনা নিয়ে কিছু কিছু খবর ছাপা হয়েছিল। ঢাকায় রাজনীতিবিদদের মধ্যে অনেকেই প্রতিবাদ করেছেন, বিবৃতি ইত্যাদি দিয়েছিলেন অনেকেই। ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যে ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন এরা প্রতিবাদ করেছিল। বাসদ ওয়ার্কার্স পার্টি এরাও প্রতিবাদ করেছিল। কিছু প্রতিবাদ বিক্ষোভ রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতেও হয়েছিল। এই ঘটনার পর সেই বছর রাঙ্গামাটি আর খাগড়াছড়িতে আর সেইভাবে বিজু পালন করা হয়নি।

এই ঘটনার একমাস পর বেগম খালেদা জিয়া ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। পরে ওখানে কোথায় যেন সেটেলারদের একটা সমাবেশে তিনি বক্তৃতাও করেছেন। বক্তৃতায় তিনি পুরো ঘটনার জন্যে দোষ চাপান শান্তি বাহিনীর উপর, নিরাপত্তাবাহিনীর লোকজনদের খুব প্রশংসা করেন আর দম্ভভরে সেখানে ঘোষণা করেন যে প্রয়োজনে এইরকম ব্যাবস্থা আরও গ্রহণ করা হবে।

(৪)
লোগাং গণহত্যার কোন বিচার আর হয়নি। আর কোনদিন হবে বলেও মনে হয় না। একটা গ্রামের পাঁচশর মতো ঘরে আগুন লাগিয়ে, ইচ্ছামত গুলি করে কুপিয়ে, শিশুদেরকে জ্বলন্ত আগুনে ছুড়ে ফেলে এতোগুলি মানুষকে হত্যা করা হলো, এর কোনদিন কোন বিচার হবে না!


ইমতিয়াজ মাহমুদ, লেখক ও আইনজীবী

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *