আদিবাসী জনগণের বর্ষ বিদায় ও বর্ষবরণ: কুধু যেই বর চেম?

।।পাভেল পার্থ।।

বিজু ফুল নেই

বর্ষ বিদায় ও বর্ষ বরণ ঘিরে আয়োজিত বিজুই চাকমাদের সবচে বড় পরিসরের সামাজিক উৎসব । ফুল বিজু, মূল বিজু ও গয্যাপয্যা দিন এ তিন পর্বে বিভক্ত বিজুর শুরু হয় বাংলা চৈত্র মাসের ২৯ তারিখ। পাহাড়-টিলা-বন ও গ্রাম ঘুড়ে ঘুড়ে এদিনে শিশু, কিশোর ও বালিকারা সংগ্রহ করেন নানান পদের ফুল। ভাতজরা ফুল বা বেইফুল ছাড়া বিজু জমে না। ভাতজরা ফুল বিজুর সময়ে ফুটে বলে অনেকে একে বিজুফুলও বলে। ফুল বিজুর দিনে সকলেই সকাল সকাল স্নান সেরে পরিপাটি হয়ে নেয়। স্নানের সময় ডুব দিলে বিজুগুলা নামের সুস্বাদু ফল পাওয়া যেতে পারে আশায় কেউই স্নানের জন্য দেরী করে না। সংগৃহীত ফুল নদী বা ছড়ার পাড়ে পূজা করে জলে ভাসিয়ে দেয়া হয়। ঘরবাড়ি ফুল দিয়ে সাজানো হয়। ফুল বিজুর দিন থেকে পরবর্তী সাতদিন চাকমারা ঘরের দরজা, ঘরের খুঁটি ও বাড়ির আশেপাশে সন্ধ্যাবাতি জ্বালিয়ে রাখে। ফুল বিজুর পরের দিনই শুরু হয় মূল বিজু। এদিনে চাকমা বাড়িতে বাড়িতে নানান পদের রান্না হয়। এসবের ভেতর বিজুর পাজোন বা একধরণের মিশ্র সব্জী হলো সবার কাংখিত খাবার। পাজানোর তরিতরকারি খুজতে জংগলে যাওয়াকে চাকমা ভাষায় বলে ‘তোনতগা যানা’। সান্যা পিঠা, বিনি পিঠা, বিনি হগা, বড়া পিঠা বানানো হয় ঘরে ঘরে। খবরক, গ্যাল্লং, লংকাপোড়া বিনি, কালাবিনি, লালবিনির মতো নানান জুমধান থেকে তৈরি করা জগরা, কানজি ও দোয়াচুয়ানির আনন্দিত আসর জমে ওঠে। চাকমারা নববর্ষের দিনকে গয্যাপয্যা বলে মানে আরামআয়েশ গড়াগড়ি করে কাটানোর দিন। নারীরা এদিন মালোকখীমার উদ্দেশ্যে ভাত উৎসর্গ করেন। বিজুর সময় চাকমা গ্রামে গ্রামে গেংখুলীরা উভোগীত, রাধামন ধনপুদি পালা, চাদিগাং ছড়া পালাসহ নানান পালাগানের আয়োজন করেন। বিজু নিয়ে চাকমা সমাজে রচিত হয়েছে নানা গীত বাদ্য ও আখ্যান। কেবল মৌখিক সাহিত্য নয়, সমকালীন মূলত: চাকমা কবি সাহিত্যিকদের বিজু ঘিরে রচিত কবিতা গানসমূহ বিকশিত করে চলেছে দেশের জাতীয় সাহিত্য সম্ভার। বিজুর মতো সামাজিক আনন্দ আয়োজনের পরব নিয়ে লেখা কবিতা কি গান গুলো কেমন হতে পারে?

‘তুরু রুতু তুরু তু বাজি বাজেত্তে/পাড়া পাড়া বেরেবং বেক্কুন মিলেনি/এইচে বিজু/বিজু বিজু/এইচে বিজু নুঅ নুঅ..’। এরকম অনেক প্রচলিত গান আছে বিজুর। গানটির একরকম বাংলা মানে এমন, ‘তুরু রুতু তুরু তু বাঁশি বাজছে, সবাই মিলে পাড়া ঘুরব, বিজুর দিন এসেছে আজ, এই বিজু নতুন বিজু…’। কিন্তু সমকালীন চাকমা কবিরা বিজু নিয়ে এমন আনন্দমুখর কবিতা বা গীত রচনা করেননি। বিজু নিয়ে সমকালীন চাকমা কবিদের কবিতা পাঠে কলিজা উথলে ওঠে, বুকের গহিনে তড়পায়। সমকালীন বিজু নিয়ে রচিত কবিতায় তরতাজা রক্তের আহাজারি। তার মানে সমকালে বিজুর ভেতরে বঞ্চনার অন্যায় প্রবাহ মিশে আছে। দেশব্যাপি পালিত বাঙালি শহুরে নববর্ষ মাতম দিয়ে এই বঞ্চনা ঠাহর করা সম্ভব নয়। বিজু নিয়ে কবি মৃত্তিকা চাকমার একটি কবিতার নাম ‘মন-মুরো কানি যার’ মানে ‘হৃদয়ে পাহাড় কাঁদে’। কবি লিখেছেন, ‘কেল্যা এযের বিঝু, এ বিঝুত কিঙিরি যেম/কেল্যা এযের মন খুলনীর দিন, এ মন কিঙিরি খুলি দিম/ফুলুনও আর তুলিবের নেই, পাগোর ঝরি যেইয়ে/পানিও নেই বিঝু গুলো ভাঝেবার/কুধু যেই বর চেম, ভাঙি যেইয়ে সারেক ঘর আর গৌঁই মাঝা…’। কবি এর বাংলা করেছেন এভাবে, কাল আসতেছে বিঝু দিন, এ বিঝুতে কি করে যাবো/কাল আসতেছে হৃদয় খোলার দিন, এ হৃদয় কি করে খুলে দেব/ফুল গুলোও তোলার মত নেই, পাঁপড়ি ঝরে গেছে/পানিও নেই বিঝু ফুল ভাসানোর/কোথায় আর্শীবাদ চাইবো, ভেঙে গেছে প্রার্থনার ঘর…। মৃত্তিকা চাকমার কবিতাখানি কী যাতনা তুলে ধরে? বিজুর আনন্দ নয়, বিজু না পালনের যন্ত্রণা। কারণ রাষ্ট্র বিজু পালনের অবস্থা রাখেনি পাহাড়ে, বারবার তা ছিন্নভিন্ন হয়েছে। রাঙামাটির বন্ধুকভাঙার মুগছড়িতে ১৯৫৯ সনে জন্ম মৃত্তিকা চাকমার। ১৯৬২ সনে কর্ণফুলী নদীতে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য পুরো পাহাড়ি সভ্যতা তছনছ হয়ে যায়। মৃত্তিকা চাকমাদের পরিবার জন্মমাটি থেকে উদ্বাস্তু হন লাখো পাহাড়ি আদিবাসীদের সাথে। চলে আসেন খাগড়াছড়ির পানছড়ির লোগাংয়ে। আবারো লোগাংয়ে সংগঠিত হয় বিচারহীন গণহত্যা। একের পর এক এভাবে চলছেই। বিজু তো আনন্দযাপনের উৎসব। প্রকৃতির নির্দেশনা গুলো বুকে আগলে দাঁড়ানোর উৎসব। পাহাড় জুড়ে উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ও বাস্তুসংস্থান উল্টেপাল্টে ফেলা হয়েছে। পাহাড়ি ঝিরি ও ছড়াগুলোকে খুন করা হয়েছে। বিজুর বার্তা নিয়ে পাহাড়ে ফুল ফুটবে কোথায়? সবখানেতেই জলপাই রঙের বাহাদুরি। অভিবাসিত বাঙালিদের দখলদারিত্ব। বিজু ফুল ছাড়া কি বিজু হয়, বিজু ফুল ভাসানোর জলস্রোত ছাড়া কি বিজু কৃত্য পালন করা যায়। এসব উৎসব কৃত্য তো আর এমনি এমনি পালন করা যায় না। কোনো চেইনশপ বা সুপার মার্কেটে গিয়ে হাজার টাকার ইলিশ মাছ আর লাল-সাদা কাপড় কিনে, মাটির সানকিতে পান্তা-ইলিশ খেয়ে বর্ষ বিদায় ও বর্ষ বরণের আয়োজনকৃত্য হয় না। এটি বহমান জীবনের ব্যাকরণ, প্রকৃতিই জানান দেয় তার সন্ধিক্ষণের বাণী। চাকমা বা ম্রো, বাঙালি কি সাঁওতাল সকল সমাজেই নিজ নিজ আয়োজনে প্রকৃতির এ বাণীকে পাঠ করেছে। তৈরি হয়েছে ভূগোল ও যাপিতজীবন ভেদে নানা কৃত্য, নানা পরব, নানা আচার। চলতি আলাপখানি কোনোভাবেই দেশের জাতিগত নিম্নবর্গ মানে আদিবাসী জনগণের বর্ষ বিদায় ও বর্ষ বরণের বিবরণমূলক কোনো নথি নয়। বরং আদিবাসী বর্ষ বিদায় ও বরণের কৃত্যসমূহের আহাজারি ও রক্তাক্ত ক্ষতকে আগলে নিয়েই আলাপখানির বিস্তার।

উধাও জাহেরথান

বাংলা বছরকে ঘিরে বাঙালি সমাজে চৈত্রসংক্রান্তি, হালখাতা, নববর্ষ যেমন বাংলার জনউৎসব তেমনি দেশের আদিবাসী সমাজে বর্ষবিদায় ও বরণের কৃত্যসমূহও জনউৎসবে রূপ নেয়। অঞ্চল ও জাতিভেদে বর্ষবিদায় ও বরণ উৎসবের নামগুলিও ভিন্ন ভিন্ন। সমতলের কোচ ও হাজং আদিবাসীরা বর্ষবিদায় ও বরণ উৎসবকে ‘বিহু’ বলেন। ভাওয়াল ও মধুপুরগড়ের বর্মণ ও কোচ আদিবাসীরা সন্যাসীপূজা, গাজন, চড়কপূজার মাধ্যমে চৈত্রসংক্রান্তি পালন করেন। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীরা এ উৎসবকে বলেন বিষু। সিলেট অঞ্চলের চা বাগানের আদিবাসীদের অনেকেই এসময় পালন করেন দন্ডবর্ত। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমারা বর্ষবিদায় ও বরণের এ উৎসবকে বলেন বিজু। মারমারা বলেন সাংগ্রাই। রাখাইনদের ভাষায় সাংগ্রেং। ত্রিপুরারা বলেন বৈসু বা বৈসুক কোথাও বুইসুক। গুর্খা ও অহমিয়ারা বলেন বিহু। তঞ্চংগ্যারা বলেন বিষু। ম্রোরা এ উৎসবের নাম দিয়েছেন চানক্রান। চাক আদিবাসীরা এ উৎসবকে বলেন সাংগ্রাইং। খিয়াং আদিবাসীদের অনেকেই এ উৎসবকে সাংলান বলে থাকেন।

সাঁওতালি ভাষায় মাস বলতে বঙ্গা, চাঁন্দো শব্দ গুলির চল আছে। ফৗগুন (ফাল্গুন) মাস থেকেই শুরু হয় সাঁওতালি বর্ষ। বর্ষ বিদায় ও বরণের উৎসব বাহাও পালিত হয় এ মাসেই। এ সময় গাছে গাছে সারজম, ইচৗক, মুরুপ্‌ আর মহুয়া ফুল ফোটে। বাহা পরবের ভেতর দিয়েই সাঁওতাল সমাজ এসব ফুলের মধু পান ও ব্যবহারের অনুমতি প্রার্থনা করে প্রকৃতির কাছে। বাহার আগে এসব ফুলের ব্যবহার সামাজিকভাবে নিষেধ।কিন্তু বাংলাদেশের সাঁওতাল জনপদে কী এখন এসব বৃক্ষ গুল্ম আছে? বীরগাজার (বনজংগল) আছে? বৃহত্তর উত্তরাঞ্চল ও সিলেট বিভাগের চাবাগানগুলোতে এখন শালবন ও বর্ষারণ্যসমূহ নিশ্চিহ্ন। দিনাজপুরের সিংড়া, কুকরি ও শারশা শালবন। ঠাকুরগাঁওয়ের ঠুমনিয়া ও সাগুনী শালবন। নওগাঁর আলতাদীঘি ও লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা শালবন। উত্তরাঞ্চলের এসব শালবনের বাস্তুসংস্থান ও বৈচিত্র্য উন্নয়নের নামে ছিন্নভিন্ন করে ফেলা হয়েছে। প্রাকৃতিক বন দখল ও ডাকাতি করে আগ্রাসি গাছের বাগান তৈরি করা হয়েছে। এসব বনে আর শাল, মহুয়া, মুরুপ, ইচৗক বৃক্ষের সমারোহ নেই। নিশ্চিতভাবে একাশিয়া বা ইউক্যালিপটাস গাছে নতুন পাতা গজালে বা ফুল ফুটলে সাঁওতাল সমাজ বাহা পরব আয়োজন করবে না। কারণ এটি এই জনপদের নিম্নবর্গের জীবনদর্শন নয়। এটি কেবলমাত্র আদিবাসী বা বাঙালি জাতিসমূহের আত্মপরিচয়ের ব্যাকরণ নয়। এটি এ জনপদের সকল ভূগোল ও জীবনভিন্নতায়ই এক। আর তাই বাঙালি জনপদেও বর্ষ বিদায়ের চৈত্রসংক্রান্তি পরবে গিমাতিতা, পাট, দন্ডকলস, নিম, নিশিন্দা, গিমা, আমরুল, থানকুনি, কাঁটাক্ষুদি, তেলাকুচা এসব শাক রান্না করে খাওয়া হয়। কারণ প্রকৃতিতে এসময় এসব লতাগুল্মই ঋতুর অদলবদলের নির্দেশনা জানান দেয়। মানুষের সমাজ সেই নির্দেশনা নিজের শরীর ও সংস্কৃতিতে গ্রহণ করে। তৈরি করে প্রাণ ও প্রকৃতির সাথে এক জটিল সম্পর্ক। আর এ সম্পর্ককে গায়েব করে ঋতুর ক্রান্তিকালীন উৎসবকে কেবলমাত্র শখের পান্তা-ইলিশ আর লাল-সাদা পোশাক বাণিজ্যের ভেতর আটকে ফেলা অন্যায়। সাঁওতালি বর্ষ বরণের বাহা পরবটি দুই দিনে আয়োজিত হয়। প্রথম দিনকে উম ও দ্বিতীয় দিনকে বাহা সৗরদি দিন বলে। গ্রামের পবিত্রস্থল ‘জাহেরথানে’ মারাংবুরো, পারগানা বঙ্গা ও জাহের এঁরা দেবতার কৃত্য পালিত হয়। সাঁওতালদের কাছ থেকে নিরন্তর প্রশ্নহীনভাবে জংগল ও জমি জোর করে কেড়ে নেয়া হচ্ছে। দখল হয়েছে জাহেরথানগুলো, রাতবিরেতে জাহেরথানগুলি গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। জন্মমাটি হারিয়ে সাঁওতালরা রাষ্ট্রের চোখের সামনে উদ্বাস্তু ও নিরুদ্দেশ হয়ে যাচ্ছে। ফুলবিহীন, বাদ্যবিহীন, জাহেরথান হারানো সাঁওতাল সমাজে তাহলে কিভাবে আজ বাহা পরব আয়োজন করে?

ঋতুর রক্তলাগা সন্ধিক্ষণ

নাটোরের চলনবিল অঞ্চলের বাগদী সমাজ চৈত্রসংক্রান্তির দিন নীলকন্ঠ পূজা করে। বৈশাখের প্রথম দিনে গোয়ালঘরে আয়োজন করে ‘দুধ-উদলানো’ কৃত্য। গরুর দুধ জ্বাল দিয়ে সেই দুধ গোয়ালঘরের মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখা হয়। বছরের প্রথম দিনে এভাবেই ভূমিজননীকে দুধ দিয়ে নতুনবার্তা বয়ে আনবার আহবান জানায় বাগদী সমাজ। যাতে বছর জুড়ে গোয়ালভরা সুস্থ দুধেল গরু থাকে, সংসারের আয় রোজগার ভাল হয়, সংসারের মঙ্গল হয়। রবিদাসদের ভেতর হাজরা-কৃত্যের মাধ্যমে বর্ষবিদায় পালিত হয়। এদিন যবের ছাতু ও কাঁচা আম একত্রে মিশিয়ে আম-ছাতুয়া খাওয়া হয়। মৌসুমি ফল আমকে বর্ষবিদায়ের এ রীতির ভেতর দিয়েই সমাজ গ্রহণ করে। বছরের প্রথম দিন ঘরের দেওকুড়ি নামের পবিত্রস্থলে কর্মের পূজা করা হয়। রবিদাসদের ভেতর যে যে কর্মপেশায় জড়িত তারা সেই কর্মের সাথে জড়িত আনুষঙ্গিক উপকরণগুলি দেওকুড়িতে রাখে। হাতুড়ি, কোদাল, শাবল, কাঁচি, ছুরি, বাটাল যার কর্মে যা লাগে সব। এ সময় ঢোল, খাজরি, ঝাল বাজানো হয়। রবিদাসদের ভেতর এসময় বাইশাখী পূজাও পালিত হয়। আদিবাসী বেদিয়া-মাহাতোরা চৈত্রসংক্রান্তির দিন বথুয়া, কাঁটাখুঁড়ে, গিমাসহ নানান জাতের তিতাশাক খায়। বর্ষবিদায় ও বরণের কৃত্য হিসেবে মুন্ডারা গ্রামপূজা হিসেবে পালন করে মুড়ই পূজা। ত্রিপুরাদের ভেতর বৈসুক পালিত হয় ত্রিপুরাব্দের তাল্লাং মাসের ৩০ তারিখে। এদিনেই ত্রিপুরা বর্ষপঞ্জিকা প্রবর্তিত হয়েছিল। এসময় ত্রিপুরা কর্ম ও প্রেমের দেবতা গড়িয়ার আরাধানা করে গড়িয়া নাচের ভেতর দিয়ে। পূর্বজনদের স্মুতির উদ্দেশ্যে পালিত হয় পারিবারিক কৃত্য। ছড়া বা নদীর স্রোতে প্রদীপ ভাসিয়ে অবিবাহিত ত্রিপুরা মেয়েরা পালন করে সিমতুং পূজা। তঞ্চংগ্যারা ফুল বিষু, মূল বিষু ও গয্যাপয্যা বিষু এ তিন দিনে পালন করেন বর্ণাঢ্য বিষু। বিষুর দিনে তঞ্চংগ্যারা বিনি চালের গুড়া ও দুধের তৈরি মু পিঠা বানান বাড়িতে বাড়িতে। অনেকেই বিজু বিষুর দিনে ক্যাঙ বা বৌদ্ধমন্দিরে খাদ্য ও উপঢৌকন দান করে। মারমারাও প্রায় তিনদিন ধরেই পালন করে বর্ষবরণ উৎসব সাংগ্রাই। যদিও দীর্ঘদিন ধরে ত্রিপুরাদের বৈসুক, মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিজু এ তিনটি উৎসবের আদ্যক্ষর নিয়ে বর্ষবরণের এ উৎসবের বাঙালি নাম হয়েছে ‘বৈসাবি’। বাঙালি নববর্ষের মতোই করপোরেট বাহাদুরি মোড়কে সমকালে পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘বৈসাবি’ উৎসব আয়োজিত হচ্ছে শহরে। যার সাথে পাহাড় জংগলে বিজু ফুল ফোটা না ফোটা, পাজনের জন্য বুনো তরকারি সংগ্রহ করা না করার কোনো সম্পর্ক নেই। বিজু ফুল ফোটা না ফোটার সাথে প্রকৃতির বহমান বিবর্তনের সম্পর্ক। কিন্তু বিজু ফুলের জন্য মাটি ও পরিবেশ থাকবে কীনা বা পাহাড় থেকে বিজু ফুল সংগ্রহ করা যাবে কীনা এটি খোদ রাষ্ট্রের খবরদারির সাথে সম্পর্কিত। পাহাড় থ্যাৎলে যদি ইকোপার্ক হয় কিংবা জংগলটিলা সাফ করে যদি বিজিবির সদরদপ্তর স্থাপিত হয়, তবে বিজু ফুল ফুটবে কোথায়? শহরের দালানে টবের মাটিতে? রাষ্ট্র কি এই চায়? প্রকৃতির বিরাজমান বিকাশকে রুদ্ধ করে দিতে চায়। মানুষ, ফুল, পাখি, ঝিরি, মাটি কি মেঘ সব মিলিয়েই সংসার। এটিই এ জনপদের নিম্নবর্গীয় দর্শন। এক এক ঋতুতে প্রকৃতির এক এক নির্দেশনা। এক এক ঋতুতে প্রকৃতির এক এক উপহার। মানুষের সমাজ তা গ্রহণ করে প্রকৃতির কাছে অনুমতি নিয়ে। প্রকৃতির কাছে নতজানু হয়ে। প্রকৃতির কাছে আর্শীবাদ প্রার্থনা করে। আর তাই ঐতিহাসিক কায়দায় রচিত হয়েছে বর্ষ বিদায় ও বরণের নানা কৃত্য, নানা আয়োজন।কিন্তু দিনে দিনে আদিবাসী অঞ্চলের সকল স্থল ও ব্যাঞ্জনা গুলো বদলে ফেলা হয়েছে। দখল করা হয়েছে। ঋতুর সন্ধিক্ষণ কি নির্দেশনা এখন আর একই কায়দায় জাগিয়ে তুলে না আদিবাসী বৈভব।

উপড়ানো নাগেশ্বর

বর্ষবরণের উৎসব সাংগ্রাইং এর প্রথমদিনকে বান্দরবানের চাক আদিবাসীরা বলেন পাইংছোয়েত বা ফুল দিন। চাকরা সাংগ্রাইংয়ের সময় কাইনকো বা নাগেশ্বর ফুল সংগ্রহে মুখরিত হয়ে ওঠেন। পাইংছোয়েতর দিন গ্রামে গ্রামে আয়োজিত হয় পেকো (গিলা), গ্যাং (লাটিম), মাইকানিকছা (কানামাছি) নামের নানান চাক খেলা। সাংগ্রাইংয়ের দ্বিতীয় দিন হলো আক্যাই। এদিনে পাড়ার যুবসমপ্রদায় বাইক (ঢোল), লাংহোয়াক (ঝাঁঝ) ও হ্নে (বাঁশী) বাজিয়ে ক্যাং বা বৌদ্ধমন্দিরে যায় আর্শীবাদ গ্রহণের জন্য। সাংগ্রাইংয়ের শেষ দিনকে চাকরা বলেন আপ্যাইং। নববর্ষের এ দিনে বাড়ি বাড়ি নানা পদের রান্না হয়। নিমন্ত্রণ খায় মানুষ এ বাড়ি ও বাড়ি। কিন্তু চাকরা কি বর্ষবরণ উৎসব করতে পারছেন আপন মহিমায়? বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের চাকরা বহিরাগত বাঙালি, রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন বলপ্রয়োগ এবং বিভিন্ন নামে বেনামে কোম্পানির জোরজবরদখলের ফলে আজ নিরুদ্দেশ হতে বাধ্য হয়েছেন। চাকদের ভূমি হারানোর ঘটনার প্রতিকার চেয়ে আদিবাসী মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন কাপেং ফান্ডেশন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে আবেদন করেছিল। মানবাধিকার কমিশনের প্রস্তাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে ১১/৬/২০১৩ তারিখে সংযুক্তিসহ ৩৩ পাতার একটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করে (সূত্র : নং ২৯.২২৪.০০০.০০৬.১৯৮.২০১৩-১১৪)। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব জনাব মো. আলমগীর হোসেন ২৯/৫/১৩-৩১/৫/১৩ পর্যন্ত ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্তটি করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাদুরঝিরি চাক পাড়া থেকে ১০টি চাক পরিবার চলে গেছে এবং বাকী ৪টি পরিবার চলে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে। ৫ বছর আগে অত্যাচার নির্যাতনে অতিষ্ট হয়ে এখানকার লংগদু চাকপাড়া থেকে সবাই নিরুদ্দেশ হতে বাধ্য হয়। চাকদের ভূমি দখলের জন্য প্রাক্তন ইউপি চেয়ারম্যান জনাব শামসুল আলম ও জালাল আহমেদসহ ১৪জন বাঙালি ভ’মিদখলকারীর নাম উল্লেখ করে উক্ত প্রতিবেদন এদেরকে গ্রেফতার করে চাকদের জমি চাকদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার সুপারিশ করেছে। তদন্ত প্রতিবেদন ডেসটিনি গ্রুপ, মোস্তফা গ্রুপ, লাদেন গ্রুপ, শামীন গ্রুপ, এস এ আলম গ্রুপ, একমি গ্রুপ, পিএইচপি গ্রুপ, মেরিডিয়ান গ্রুপ, এক্সিম গ্রুপ, বাবুল গ্রুপের মতো কোম্পানির অবৈধ ভূমি দখলের সত্যতা খুঁজে পেয়েছে। চাকদের ভূমি আজ বাণিজ্যিক তামাক বাগান, সেগুন বাগান আর প্রভাবশালী বাঙালিদের সম্পত্তি। উপরানো নাগশ্বের নিখোঁজ হতে চলেছে। হয়তো তারপরও টিকে থাকবে চাক মানুষেরা,কিন্তু নাগেশ্বর? নাগেশ্বর ছাড়া কে জানান দেবে সাংগ্রাইংয়ের সময় হয়েছে। কিংবা হয়তো থাকবে নাগেশ্বর। কিন্তু যদি চাকরা না থাকে, ঋতুর প্রথম নাগেশ্বর ফুলকে কারা বরণ করে নেবে সামাজিক প্রথায়। কারা প্রার্থনা করবে আর আর্শীবাদ চাইবে প্রবীণ বৃক্ষতলে? মানুষ বৃক্ষ জলধারা কি প্রাণের এই যে সম্পর্ক ও মিলন, এরই নাম বর্ষ বিদায় ও বরণ উৎসব। ভূগোল, ভাষা ও যাপিতজীবনের ভিন্নতায় যা বৈচিত্র্যময়। রাষ্ট্রকে দেশের সকল জনগণের এই ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যের দায় ও দায়িত্ব নিতে হবে।

চাকদের ভেতর কেউ মারা গেলে স্বজন প্রতিবেশীরা ক্‌মাঙ চিকহ্রান গেয়ে থাকে। এইসব গানের ভেতর দিয়ে আত্মাকে আবার নিজ রক্ত বংশে জন্মের আহবান ও অনুরোধ জানানো হয়। এরকম একটি গানে আছে, ‘ ‘আক্রাঃ হ্‌ য়াগ্‌তা তুঙলাঙে/আক্রাঃ হ্‌ নিঙয়াগ্‌ তুঙলাঙে/নাঙগা প্রেঃঙা প্রেং গো ভেঙ নোহ’। এর বাংলা মানে করলে দাঁড়ায়, পথে একদিন থেকো না/পথে দু’দিন থেকো না/তোমার কূলে বংশে আবার চলে এসো। আদিবাসী জীবনের সকল কৃত্য উৎসব ও পরবের ভেতরেই নিরন্তর এই আহবান ধ্বনিত হয়। প্রকৃতির প্রবাহে বারবার বিকশিত ও বিরাজিত হওয়ার আহবান।
………………………………………………………………………………………………………….
পাভেল পার্থঃ গবেষক ও লেখক। animistbangla@gmail.com

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *