পাহাড়ে হাম উন্নয়নের এক পরিহাস- ইমতিয়াজ মাহমুদ

সাজেক ইউনিয়নের তিন চারটি গ্রামে আর বান্দরবান জেলার কয়েকটা গ্রামে হামের প্রকোপে শিশুরা মারা যাচ্ছে। জাতীয় ও আঞ্চলিক নানা সংবাদ মাধ্যমে এই খবরটা দেখে খুব বিচলিত লাগছে। এ পর্যন্ত কতজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, কতজন শিশু আক্রান্ত হয়েছে সেসবের কোন আনুষ্ঠানিক তথ্য নেই। খবরের কাগজগুলিতে একেক জায়গায় একেক সংখ্যায় দেখাচ্ছে।

সাজেকের কথা তো আপনারা সকলেই জানেন। সেখানে কয়েকটা গ্রামে আদিবাসীদেরকে নিজেদের জায়গা থেকে উৎখাত করে পর্যটন কেন্দ্র করা হয়েছে। সেই পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে আপনারা বেড়াতে যান, বিলাসিতার চূড়ান্ত করে আসেন। কিন্তু সেখানে যারা প্রজন্মের পড় প্রজন্ম ধরে বসবাস করে আসছিল সেইসব আদিবাসী মানুষেরা নিজেদের বাড়িঘর থেকে উৎখাত হয়ে হতদরিদ্র অবস্থায় জীবন যাপন করে। প্রায় বছরই কয়েকটা মাস সেখানকার কয়েক হাজার মানুষ দুর্ভিক্ষ অবস্থার মধ্যে বাস করে। সেখানে শিশুদের মধ্যে যখন হামের প্রকোপ দেখা দেয়, শিশুদেরকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

শিশু মৃত্যু সহ্য করা যায় না। একটি শিশু যখন অসুখে মারা যায় সেটি যেন হয় গোটা মানব সভ্যতার একটা পরাজয়, একটা ব্যর্থতা। আমাদের এই দেশে নাকি এখন চিকিৎসা ব্যবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। গ্রামে গঞ্জে আমাদের ছোটবেলায় যেখানে একজন হাতুড়ে ডাক্তার পাওয়াও কঠিন ছিল এখন কিনা প্রতিটা ইউনিয়ন পর্যায়েও কোয়ালাইফাইড এমবিবিএস ডাক্তার আছে। পাহাড়ে কি এই উন্নয়ন ঘটেনি? পাহাড়ের গ্রামগুলিতে তো ডাক্তার বা ঔষধ মিলে না।

কয়েক মাস আগে আমাদের রেজাউল করিম সুমন আমাকে বলছিল বান্দরবানে ওর অভিজ্ঞতার কথা। বান্দরবানের একটু দুর্গম এলাকার গ্রামগুলিতে সামান্য জ্বরজারিতে শিশুদের মৃত্যু ঘটে। ডাক্তার নাই, ওষুধ নাই। সুমন বলছিলেন যে সেসব জায়গায় যদি একজন প্যারামেডিক্স ধরনের কেউও থাকতো, আর থাকতো কিছু নিত্যদিনে কাজে লাগে এরকম ওষুধ তাইলেও হয়তো অনেক শিশুর প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হতো। ওরা নিজেদের উদ্যোগে একটু চেষ্টা চরিত্র করছে। কিন্তু এইসব উদ্যোগের তো কিছু উদ্যোগের তো কিছু সীমাবদ্ধতা থাকেই আরকি।

এই যে কয়েক সপ্তাহ ধরে হামে মারা যাচ্ছে শিশুরা, খবর নিয়ে দেখেছি সেখানে সরকারিভাবে সেরকম কোন জরুরী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কিনা কেউ বলতে পারলো না। একটা গ্রাম থেকে মিলিটারির লোকেরা কয়েকটি শিশুকে নাকি হেলিকপ্টারে করে চট্টগ্রামে নিয়ে গেছে উন্নত চিকিৎসার জন্যে। ধন্যবাদার্হ কাজ নিশ্চয়ই। কিন্তু সাজেকে জরুরী ভিত্তিতে একটা মেডিকেল টিম পাঠানো কি খুব কঠিন কাজ?

সাজেক ইউনিয়নটা নেহায়েত ছোট নয়। পাহাড়, সেখানে লোকজনের বসবাস একটু কম, মানুষের ঘনত্বও কম। এই বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে শিশুরা হামে আক্রান্ত হয়ে ভুগছে, মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে একেকটা শিশু। বিনা চিকিৎসায়। শিশুদেরকেই যদি বাঁচাতে না পারি তাইলে আপনি দেশের এতো উন্নয়ন দিয়ে কি করবেন?

ইমতিয়াজ মাহমুদ; লেখক ও আইনজীবী
ইমতিয়াজ মাহমুদের ফেসবুক পোস্ট থেকে

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *