অসুখ, মহামারী ও সংক্রান্তির শক্তি: পাভেল পার্থ

হাম বসন্ত ওঠল তাতে
ফুল ছড়ালো সকল পথে
এ ফুল যাবে মায়ের চরণে।
মা শীতলা ওঠল রথে
ফুল ছড়ালো সকল পথে
এ ফুল যাবে মায়ের চরণে।
(বসন্ত রোগবিনাশী শীতলা পূজার গীত)

প্রকৃতির অসুস্থতাই মানুষের সমাজে ‘রোগ’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই রোগ ক্রমান্বয়ে ‘অসুখ’ ও ‘মহামারী’ তৈরি করে। রোগের সাথে উপনিবেশ আর উন্নয়নের এক গভীর যোগসূত্র আছে। কলম্বাস যেমন লাল আদিবাসীদের আমেরিকায় নানা রোগ-ব্যাধি নিয়ে গেছিলেন, এই বাংলাতেও উপনিবেশকালে বহিরাগতদের মাধ্যমে ঘটেছে নানা রোগের বিস্তার। মানুষের লাগামহীন চলাচলই রোগের সংক্রমণকে মহামারী করে তোলে। চলতি করোনারকালেও বাংলাদেশ আক্রান্ত হয়েছে দেশের বাইরে থেকে আসা মানুষের মাধ্যমেই। যখন দেশে প্রথম রেললাইন হলো, বাড়লো ম্যালেরিয়া। একইভাবে দেশে কয়েকবছরে মেট্রোরেলসহ দশাসই সব উন্নয়নপ্রকল্প ডেঙ্গু কী চিকুনগুনিয়ার বিস্তার বাড়িয়েছে। আবার এই রোগের বিস্তার ও সংক্রমণ রোধে তৈরি হয় রাষ্ট্র কী বহুজাতিক কোম্পানির নানা কর্তৃত্ব। দরিদ্র মানুষের শরীর হয়ে ওঠে নতুন প্রতিষেধ বাণিজ্যের বায়োমেডিক্যাল গবেষণার মাঠ। কোনো মহামারী কেবলমাত্র মৃত, সুস্থ কী আক্রান্ত মানুষ কী ভূগোলের পরিসংখ্যান মাত্র নয়। এর সাথে জড়িয়ে থাকে নানামুখী শংকা, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, অনাস্থা, আহাজারি, গুজব, আতংক কী আশার হাতছানি। মহামারী অনেক কিছু বদলে দেয়, তছনছ করে ফেলে। পারিবারিক গল্পের আঙিনা থেকে হাটবাজার, কারখানা থেকে উৎপাদন, ব্যক্তিগত অভ্যাস থেকে রাষ্ট্রনীতি, স্থাপত্য পরিকল্পনা থেকে বৈশ্বিক কর্তৃত্ব। কলেরা কী কালাজ্বর, বসন্ত কী ম্যালেরিয়ার কালে আমাদের গ্রামজনপদে বহু নি¤œবর্গীয় সুরক্ষার চল ঘটেছিল। আমরা মহামারীকে সমষ্টির অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই দেখেছি। এককভাবে ব্যক্তির রোগ নয়, মহামারী থেকে গ্রামের সুরক্ষা দিতে লড়াইয়ের নজির আমাদের আছে। আমরা কেন করোনারকালে আমাদের মহামারী সামাল দেয়ার সেইসব সমষ্টিগত অভিজ্ঞতাকে স্মরণে আনতে পারছি না? এমন স্মৃতিবিমুখ প্রজন্ম কেন হয়ে ওঠছি আমরা? মহামারীকালে ‘রোগ’ এমনসব সামাজিক অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে বাহিত হয়, যখন তার স্থানীয় পরিচয় ও পরিধি নির্মিত হতে থাকে। ওলাওঠা নামের এক রোগে ভুগত গ্রামবাংলার মানুষ। ১৮ শতকে এই ওলাওঠা রোগটিই বিশ্বব্যাপি কলেরা নামে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। কলেরার বিস্তার ঠেকাতে অনেক গ্রামে ওলাবিবি/ওলাইচন্ডী/ওলাদেবীর থান গড়ে ওঠেছিল। ওলাদেবীর পূজা, মাগন ও মানত হতো সেখানে। এমনকি গুটিবসন্ত ঠেকাতেও গ্রামীণ নি¤œবর্গ শীতলাদেবীর থান তৈরি করেছে। শীতলাদেবীর সারাগায়ে গুটি বসন্তের দাগ। কোনো গ্রামে ওলাওঠা কী গুটিবসন্ত ছড়িয়ে গেলে মানুষ ‘গ্রামবন্ধ’ করে দিত কিছুদিনের জন্য। বাইরের কেউ গ্রামে ঢুকতে পারতো না, গ্রামের কেউ বেরুতে পারতো না। টানা কয়েক বছর এমন অভিজ্ঞতার ফলে মৌসুমভিত্তিক রোগ সামাল দেয়ার জন্য গ্রামবাংলার মানুষের মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতিও গড়ে ওঠেছিল। টাঙ্গাইল শালবন এলাকায় আঠার শতকের শেষ থেকে উনিশ শতকের শুরুতে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে কালাজ্বর। রোগের সংক্রমণ কী মহামারীর বিপদ থেকে গ্রামকে বাঁচাতে মান্দিরা ‘দেনমারাংআ’ পূজার আয়োজন করতেন। কোচ, বর্মণ, রাজবংশীদের ভেতরেও অসুখের বিপদ থেকে গ্রামের সুরক্ষায় প্রতি বছর কয়েকদিনের জন্য গ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে ‘গেরাম পূজা’ আয়োজনের রেওয়াজ ছিল। খাগড়াছড়ির পাহাড়ে দেখেছি ত্রিপুরা আদিবাসীরা ‘ম্যালেরিয়ার’ বিস্তার রোধে ‘সুকুন্দ্রায়-বুকুন্দ্রায়’ পূজার সময় গ্রামকে ‘শুদ্ধ’ করতে চলাচল সীমিত করেন। মহামারীর বিস্তার ও সংক্রমণ ঠেকাতে নিজেদের এলাকাকে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন করা কী নানাবিধ সঙ্গনিরোধের বহু নজির আমাদের নি¤œবর্গের অভিজ্ঞতা ও আখ্যানে আছে। গ্রামীণ নি¤œবর্গের বর্ষপঞ্জিকা প্রাণ ও প্রকৃতির নির্দেশনাকে মেনেই গড়ে তুলেছিল নানা কৃত্য ও বাৎসরিক আয়োজন। সংক্রান্তি হলো বর্ষপঞ্জিকার এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। প্রতিমাসের শেষ হলো সংক্রান্তি আর প্রতি মাসের শুরু হলো মাস-পয়লা। ঋতুভিত্তিক পরিবর্তনে সমাজকে প্রস্তুত করবার সকল আয়োজন গড়ে ওঠেছিল এ সময়টাতেই। এর ভেতর আবার চৈত্রসংক্রান্তি, ফাল্গুন সংক্রান্তি, পৌষসংক্রান্তি, ভাদ্রসংক্রান্তি, শ্রাবণসংক্রান্তি, কার্তিকসংক্রান্তির আয়োজন পার্বণময়। কারণ এ সময়গুলো মাস নয়, বদলে যায় প্রকৃতির ঋতুকাল। চলতি আলাপে আমরা বাঙালি ও আদিবাসী জীবনের অসুখ ও মহামারী সামাল দেয়ার সংক্রািন্তগুলো নিয়ে কথা বলবো। আলাপের কেন্দ্রে রাখবো বর্ষবিদায়ের সংক্রান্তিপরবগুলো। কারণ এ সময়টাতে সমাজ পরবর্তী ৩৬৫ দিনের জন্য সামগ্রিক প্রস্তুতি নেয় শরীর ও মনে। আর এখানেই চৈত্রসংক্রান্তির শক্তি, অসুখ ও মহামারী মোকাবেলার লোকায়ত সাহস।

চইতপরব
প্রকৃতিতে তিতা জাতীয় শাকের উপস্থিতি জানান দেয় চৈত্র মাস শেষ হয়ে যাচ্ছে, বৈশাখ সমাগত। এটি বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের সন্ধিস্থলের এক অনন্য চিহ্ন। তিতাশাক ছাড়া বাঙালি কী আদিবাসী সমাজে বর্ষবিদায়ের সংক্রান্তি কৃত্য হয় না। গিমা তিতা, নাইল্যা, গিমা, দন্ডকলস, আমরুল, থানকুনি, নিম, নিশিন্দা, তেলাকুচা, মালঞ্চ, কানশিরা এ রকমের ১৩ থেকে ২৯ রকমের তিতা স্বাদের শাক খাওয়ার চল আছে দেশের নানা জনপদে। আদিবাসী বেদিয়া-মাহাতোরা চৈত্রসংক্রান্তির দিন বথুয়া, কাঁটাখুঁড়ে, গিমাসহ নানান জাতের তিতাশাক খায়। হাওরাঞ্চলে চৈত্র সংক্রান্তির দিন আয়োজিত এ কৃত্যের নাম ‘বেগুন পাতার বর্ত’। হাওরাঞ্চলে ব্রতকে ‘বর্ত’ বলে। এ দিনটিকে অনেকে ‘হার বিষুও’ বলেন, কেউ বলেন ‘চইত পরব’। চইত পরবে বর্তের আগ পর্যন্ত বাড়ির নারীরা উপবাস থাকেন। ভোর রাতে ওঠে বাড়ি ঘর সাফসুতরো ও লেপামোছা করতে হয়। বেগুন পাতার বর্তের জন্য বাড়ির বিছরাক্ষেতের (আঙ্গিনা বাগান) বেগুন গাছ থেকে ৫ থেকে ১৩টি পাতা সংগ্রহ করা হয়। পাতা গুলি ধুয়ে ১৩টি পাতায় ১৩ জাতের তরিতরকারি রান্না করে ভাতসহ দেয়া হয়। বর্ত শেষে বেগুন পাতা গুলো নদীর জলে ভাসিয়ে দেয়া হয়। চাকমারা এ সময় আয়োজন করে বিজু। ফুল বিজু, মূল বিজু ও গয্যাপয্যা দিন এ তিন পর্বে বিভক্ত বিজুর মূলে থাকে নানাপদের পাহাড়ি শাকসব্জীর তৈরি পাজোন। বান্দরবানের চাকরা সাংগ্রাইংয়ের সময় কাইনকো বা নাগেশ্বর ফুল সংগ্রহে মুখরিত হয়ে ওঠেন। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীরা এ সময় বিষু আয়োজন করেন। মারমা ও রাখাইনরা সাংগ্রাই আয়োজনে পবিত্র জল দিয়ে আগত সবাইকে ভিজিয়ে শুদ্ধ করেন। চৈত্র সংক্রন্তির আরেক অনবদ্য চিহ্ন হলো গ্রামাঞ্চলে ঘুরে বেড়ানো গাজন বা চড়কের দল। লাল সালু কাপড় পরিধান করে এবং শিব-গৌরি সেজে, কেউবা মুখোশ চাপিয়ে মাগন সংগ্রহ করেন। আয়োজনে বৈচিত্র্য থাকলেও চৈত্রসংক্রান্তির মূলে আছে সুস্থতার জন্য প্রকৃতির তিতারস গ্রহণ ও চারপাশের পরিচ্ছন্নতা। অনাগত রোগ ও মহামারী থেকে আসন্ন বছরকে সুরক্ষিত করতেই চৈত্রসংক্রান্তির সকল আয়োজন।

হাজরা ও বাইশাখী
রবিদাসদের ভেতর বাইশাখী পূজা ও হাজরা-কৃত্যের মাধ্যমে বর্ষবিদায় পালিত হয়। এদিন যবের ছাতু ও কাঁচা আম একত্রে মিশিয়ে আম-ছাতুয়া খাওয়া হয়। মৌসুমি ফল আমকে বর্ষবিদায়ের এ রীতির ভেতর দিয়েই সমাজ গ্রহণ করে রোগব্যধি সামাল দেয়ার জন্য। বছরের প্রথম দিন ঘরের দেওকুড়ি নামের পবিত্রস্থলে কর্মের পূজা করা হয়। রবিদাসদের ভেতর যে যে কর্মপেশায় জড়িত তারা সেই কর্মের সাথে জড়িত আনুষঙ্গিক উপকরণগুলি দেওকুড়িতে রাখে। হাতুড়ি, কোদাল, শাবল, কাঁচি, ছুরি, বাটাল যার কর্মে যা লাগে সব। কেবল মানুষ নয় এ সময় পেশায় জড়িত সকল উপকরণ ও গৃহস্থালী সকল কিছু ধোয়ামোছা করতে হয়।

চইত বিশমা
দিনাজপুরের বিরলের কড়া আদিবাসীরা চৈত্রসংক্রান্তিতে আয়োজন করেন চইতবিশমা। সংক্রান্তির কয়েকদিন আগ থেকেই পাড়া গ্রাম পরিচ্ছন্ন করা হয়, বহিরাগতদের গ্রামে প্রবেশ সীমিত করা হয়। চইতবিশমার দিনে নিমপাতার কাঁচা রস ও নানাপদের তিতাশাক খাওয়া হয়। পেঁয়াজ-রসুন-শুকনো মরিচ ঝুলানো হয় ঘরের দরজায়। কড়াদের প্রতিটি বাড়িতে পিড়াঘার নামে এক পবিত্র পূজাস্থল থাকে। এখানে চইতবিশমা পূজা শেষে হাড়িয়া পান ও নৃত্যগীতের আয়োজন হয়।

বাহা
ফৗগুন (ফাল্গুন) মাস থেকেই শুরু হয় সাঁওতালি বর্ষ। বর্ষ বিদায় ও বরণের উৎসব বাহাও পালিত হয় এ মাসেই। এ সময় গাছে গাছে সারজম, ইচৗক, মুরুপ্ আর মহুয়া ফুল ফোটে। বাহা পরবের ভেতর দিয়েই সাঁওতাল সমাজ এসব ফুলের মধু পান ও ব্যবহারের অনুমতি প্রার্থনা করে প্রকৃতির কাছে। বাহার আগে এসব ফুলের ব্যবহার সামাজিকভাবে নিষেধ। বাহা পরবে রোগজরা নিরাময়ে নতুন ফুলের স্পর্শ গ্রহণের ভেতর দিয়ে প্রকৃতির কাছে প্রার্থনা করে সাঁওতাল সমাজ।

হেচড়া
হেচড়পেচড় হেচড়া ঠাকরন,
পেচড়াভরা চুল গো তোমার
পেচড়াভরা চুল।
তাইতে আমি আইন্যা দেবো
কুমড়ালতার ফুল।
গোপালগঞ্জ-মাদারীপুরের চান্দারবিল এলাকায় হেচড়া দেবী পূজিত হন বসন্তকালে খোস-পাঁচড়া, বসন্ত, চুলকানি নিরাময়ের মানতে। এদিনে গো-ফাল্গুন রীতিও পালন করা হয়। গোবরের দলায় বউন্যা (বরুণ) ও ভাটির (ভাঁট) ফুল গেঁথে দিয়ে সুনামগঞ্জের হাওর এলাকাতে ফাল্গুন মাসে এবং কোথাও চৈত্রসংক্রান্তিতে ভাঁট এবং বরুণ ফুল দিয়ে এ কৃত্য পালিত হয়।

পঞ্চমদোল
ফাল্গুন সংক্রান্তিতে আয়োজিত পঞ্চমদোল উৎসব বেশ কয়েকটি পর্ব ও আচারকৃত্যে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলে। প্রথম দোলভিটে মেরামত, তারপর দোলপূর্ণিমার প্রথম দিন কুড়া পোড়ান পর্ব, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন দোলপূজা, চতুর্থ দিন হোলি, পঞ্চম দিন পূণ্যাহ বা সমাপ্তি। দোলভিটের সামনে পূবমুখী করে বগাঝোল, বাইল্যাবাত, মধুশাইল, নেপালদীঘা, ভাওয়াইল্যা, কইতরমণি, পোখরাজ এরকম স্থানীয় আমন ধানের পল (খড়) ও মুলী বাঁশ দিয়ে পুরুষেরা কুড়াঘর তৈরি করেন। পঞ্চমদোলের প্রথম দিন এই কুড়া পোড়ানো হয়। গ্রাম থেকে অশান্তি, রোগশোক ও অশুভ শক্তিকে দূর করার জন্য এই কৃত্য পালিত হয়।

শীতলা পূজা
বসন্তরোগবিনাশী দেবী শীতলা। সারা গায়ে গুটি বসন্তের দাগ। ফাল্গুন-চৈত্রে আয়োজিত শীতলা পূজা ঘিরে নরসিংদী, গাজীপুর, মৌলভীবাজার, সিলেট, সাতক্ষীরাসহ দেশের নানাপ্রান্তেই জমে ওঠে রকমভিন্ন আয়োজন ও মেলা। গ্রামে গ্রামে শ্যাওড়া, বট, অশ্বত্থ, পাকুড়, ষষ্ঠী বট, খেজুর, বকুল গাছতলায় গড়ে ওঠেছে শীতলাতলা ও শীতলাথান। শীতলা পূজায় ১০৮টি মাটির ছোট প্রদীপ লাগে। একটি দেবী ঘট, একটি ফুল-জলের হাড়ি লাগে। এতে দুধ-বাতাসা-বেলপাতা-তুলসীপাতা-ডাবের জল মিশানো হয়। পূজার পরে সকলকেই এটি খেতে দেয়া হয়। কেউ কেউ এটি শরীরে মাখেন। শেষে হোম যঞ্জের কালি ও ঘি একত্রে মিশিয়ে সকলের মাথা-কপালে লাগানো হয়। সাতক্ষীরার সুন্দরবন অঞ্চলে প্রতিবছর মানুষের হাম-বসন্ত-পাতলা পায়খানা-জ্বর হলে এবং গরু-ছাগলের পশ্চিমে-গায়ে গুটি বের হলে-সর্দি লাগলে-পাতলা পায়খানা করলে শীতলা পূজার মানসী (মানত) করা হয়।

সারুল
অসুখ ও অশুভশক্তি থেকে গ্রামকে মুক্ত রাখতে বসন্তকালে মুন্ডারা পালন করে সারুল/সারহুল কৃত্য। সুন্দরবন অঞ্চলে এ পূজায় সিন্ধ্রি(সুন্দরী) গাছের পাতা লাগে। মাটির থানে ও ঘরের ভেতর পূজা হয়। কৃত্যকালিন সময়ে কঠোরভাবে বহিরাগতদের গ্রামে প্রবেশ সীমিত করা হয়।

ঘাটাবান্ধাবর্ত
হাওরাঞ্চলে বসন্তকালীন রোগব্যধি থেকে মুক্ত থাকতে এই ব্রত পালিত হয়। চালতাপাতা দিয়ে ঘাটা বাঁধা হয় এবং ঘরবাড়ির চারপাশ, জমিন ও গৃহপ্রবেশের মুখে এসব স্থাপন করা হয় যেন কোনো ব্যাধি ও অশুভ কিছু প্রবেশ না করতে পারে। একইভাবে কমপক্ষে আটরকমের শাকসব্জি দিয়ে আটআনাজবর্তও পালিত হয় যাতে মানুষের শরীরে কোনো জরাব্যাধি প্রবেশ না করতে পারে।

দেনমারাংআ
রোগের সংক্রমণ কী মহামারীর বিপদ থেকে গ্রামকে বাঁচাতে মান্দি বা গারোরা ‘দেনমারাংআ’ পূজার আয়োজন করতেন। গ্রামের প্রবেশের পথ গুলো মাটি-শণ দিয়ে কয়েকস্তর উঁচু করে বন্ধ করে দেয়া হতো। একে ‘কুশি’ বলে। কোচ, বর্মণ, রাজবংশীদের ভেতরেও অসুখের বিপদ থেকে গ্রামের সুরক্ষায় প্রতি বছর কয়েকদিনের জন্য গ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে ‘গেরাম পূজা’ আয়োজনের রেওয়াজ ছিল।

জরা-ব্যাধি বিনাশী সংক্রান্তির শক্তি
ষড়ঋতুর বাংলাদেশ এখন কত ঋতুর দেশ তা আরেক লম্বা তর্কের তল। প্রতিটি ঋতুর সন্ধিক্ষণ হলো সংক্রান্তি। আর এই সময়টা জরা-ব্যাধি জয় করে নতুন আরেক বছরের জন্য সঞ্জিবনী সঞ্চয়ের সময়। গ্রামীণ নিম্নবর্গ অসুখ ও মহামারীকে সামাল দিতেই সংক্রান্তির সময়গুলোতে নিজেদের নানা প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল। খাদ্য থেকে শুরু করে চারপাশের পরিচ্ছন্নতা, সাময়িক বিচ্ছিন্নতা থেকে নানামুখী সঙ্গনিরোধ এসব মিলিয়েই আমাদের সংক্রান্তি আয়োজন। সংক্রান্তি কেবলমাত্র গাজনের গীত বা তিতাশাকের পরব নয়। মহামারী থেকে বাঁচার এক সামষ্টিক স্থানীয় কায়দা। প্রকৃতিকে জানাবোঝার জন্য এক সামাজিক আহবান। সংক্রান্তিতেই সমাজ প্রকৃতির বিশেষ কিছু বিশেষভাবে গ্রহণ করে ও সামাজিক বিধিনিষেদ গুলোর পাবলিক চর্চা করে। মূলত এর ভেতর দিয়ে সমাজ জানাতে চায় প্রকৃতিতে বেঁচে থাকার জন্য মানুষ হিসেবে আমাদের কিছু করণীয় ও বিধি আছে। এসব বিধিগুলো আন্ষ্ঠুানিকভাবে জানাতেই সংক্রান্তির নানা কৃত্য আয়োজন। বাঙালি জনপদে চৈত্র মাসে শিমুইর (শিম), ফাল্গুনে মূলা, শ্রাবণে কচু, আষাঢ়ে ওল, জৈষ্ঠ্যে গিমাতিতা শাক, কার্তিকে ওল খায় না অনেকেই। গ্রামের প্রবীণ অনেকেই এখনও মনে করেন বাংলা জৈষ্ঠ্য মাসে কোনো শস্য ফসল লাগাতে হয় না, কারণ এতে জেষ্ঠ সন্তানের অমঙ্গল হয়। শ্রাবণ মাসে কলা গাছ লাগানোর নিয়ম নেই। শ্রাবণ মাসে মনসাবর্ত হয় এবং এর সাথে জড়িত বেহুলা-লক্ষিন্দরের কাহিনিতে বেহুলা কলাগাছ দিয়ে ভেলা বানিয়ে ছিল বলেই শ্রাবণ মাসে কলাগাছ পুতার নিয়ম নেই। শনি ও মঙ্গলবারে সাধারনত: কোনো শস্যফসল লাগানোর নিয়ম নেই। ত্রিসন্ধ্যা, সন্ধ্যা, রাত ও ভোর রাতে কোনো কিছু লাগানোর নিয়ম নেই। সমতল অঞ্চলের বাঙালি মুসলিম পরিবারের অনেকেই বুধবারে বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ কাটে না, কারণ তারা বুধবারকে মাদারিয়া বার হিসেবে দেখে। মাদার পীরের বারকে মাদারিয়া বার বলে। টাঙ্গাইলের চারান বিলের বাঙালি জেলে পরিবারে রাগা মাছ খাওয়া হয় না। অনেকে বিশ্বাস করেন এই মাছ সর্পদর্শনের পর ভেলায় ভাসমান লক্ষিন্দরের পায়ের টাখনুগিরা খেয়ে ফেলেছিল। ঠিক যেমন সিলেটসহ দেশের অনেক অঞ্চলের বাঙালি মুসলিম পরিবার হযরত শাহজালালের স্মৃতির সাথে সম্পর্কিত বলে জালালি কবুতরের মাংশ খান না। কিন্তু আমাদের তথাকথিত আধুনিক ও ‘সভ্য’ শহুরে সমাজে প্রতিদিন প্রকৃতির ব্যাকরণকে অমান্য ও তছনছ করা হয়। আমাদের নাগরিক জীবনে প্রকৃতিঘনিষ্ঠ কোনো বিধিনিষেধ নেই। এখন সারাবছর বাজারমুখী শস্যফসল মেলে। কোনোকিছু দেখে বোঝার উপায় নেই এটা কোন ঋতু। আমরা তাহলে এমন করপোরেট ভোগবাদী উন্নয়ন দিয়ে কার লাভ আর কার ক্ষতি করছি? প্রকৃতির ধারাপাত চুরমার করে দিচ্ছি বলেই ইবোলা, ডেঙ্গু কী আজ করোনায় দুনিয়া বিপর্যস্ত। কিন্তু আমাদের গ্রামীণ নিম্নবর্গের সংক্রান্তি পালনের ভেতর প্রকৃতির বিজ্ঞানকে মান্য করবার এক অবিস্মরণীয় শক্তি ও দর্শন আছে। অসুখ ও মহামারী মোকাবেলার নিম্নবর্গীয় আদি কায়দা গুলোর শিক্ষা ও স্মৃতি থেকে বিমুখ ও বিস্তৃত হলেও এখনো আমরা সেগুলোই পালন করতে মরিয়া হয়েছি। অসুখ ও মহামারী সামাল দিতে গ্রামীণ নিম্নবর্গ সংক্রান্তি ও নানা পূজাকৃত্যের মাধ্যমে ব্যক্তি নয়, সামষ্টিক সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ‘সাময়িক বিচ্ছিন্নতা’ ও ‘সঙ্গনিরোধের’ কঠোর নিয়ম পালন করেছেন। পরবর্তীতে রোগের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিয়েছেন। চলমান করোনা সংকটেও আমরা ‘কোয়ারেন্টিন’ আর ‘লকডাউনের’ পদ্ধতিই গ্রহণ করেছি, তাকিয়ে আছি প্রতিষেধকের দিকে। সংক্রান্তির শক্তি এই জানায়, যেকোনো সংকট ও মহামারীকাল কেটে আবার এক স্বপ্নময় জীবন শুরু হবে। তবে তার জন্য দরকার শরীর ও মনের প্রস্তুতি। করোনা সংকট মোকাবেলায় আমরা সংক্রান্তির ঐতিহাসিক শক্তির প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারি। ব্যক্তি নয়, সামষ্টিক অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই সংকট ও মহামারী মোকাবেলা করতে হবে। নিয়ম ও বিধি মেনে চলতে হবে। প্রকৃতির প্রতি বিশ্বাস রাখলে প্রকৃতিই নাশ করবে সংকটকাল।
………………………….
পাভেল পার্থ, গবেষক ও লেখক।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *