আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের উদ্যোগে ছায়ানটে আলোচনা, নারী সম্মাননা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

ফাল্গুনী ত্রিপুরা: আজ বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক নারী দিবস- ২০২০ উপলক্ষে রাজধানীর ছায়ানটে এক আলোচনা সভা, সম্মাননা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সমন্বয়ক ফাল্গুনী ত্রিপুরার সঞ্চালনায় এবং সদস্য তুলি লাবণ্য ম্রংয়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ ওয়ার্কাস পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরুপা দেওয়ান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ঈশানী চক্রবর্তী, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্চীব দ্রং, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোহাম্মদ জাহেদ হাসান এবং স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব চঞ্চনা চাকমা প্রমুখ।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো: জাহেদ হাসান বলেন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের রিপোর্ট অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে আদিবাসী নারীর উপড় সহিংসতার মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেড়ে চলেছে। এর থেকে পরিত্রাণের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট সকলকে একসাথে আন্দোলন করার জন্য আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্চীব দ্রং বলেন, আদিবাসীরা পৃথিবীর জন্য, পৃথিবীর মানুষের জন্য, পৃথিবীকে বসবাসযোগ্য করে তোলার জন্য পৃথিবীর জনম্মলগ্ন থেকেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। কিন্ত সময়ের পরিক্রমায় সেই আদিবাসীদের মৌলিক অধিকারকেও খর্ব করে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে আদিবাসীদের বিভিন্ন অধিকারের কথা বলা থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুসারে একটা মানবিক মর্যাদার রাষ্ট্র গড়ে তোলার কথা বলা হলেও তা আজও অনুপস্থিত। তিনি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে ভবিষ্যত পৃথিবী বিনির্মাণের জন্য তরুণ প্রজন্মকে আহ্বান জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ঈশানী চক্রবর্তী বলেন, আজকের পৃথিবীর বাস্তবতায় স্লোগান সর্বস্ব অনুষ্ঠান না করে প্রকৃত অর্থে নারীদের সমঅধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আন্দোলন পরিচালনা করতে হবে। তিনি বলেন, এখনো পৃথিবীর ৯০ ভাগ পুরুষ নারীদের সমানাধিকারে বিশ্বাস করেনা যার কারণে পৃথিবীব্যাপী নারীর উপড় সহিংসতার মাত্রা বেড়ে চলেছে। তাই নারী অধিকার সুরক্ষার আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য নারীদের পাশাপাশি পুরুষদেরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরুপা দেওয়ান বলেন, পিতৃতান্ত্রিক সমাজ বাস্তবতায় সমাজের নারীরা অনেক কিছু করার চেষ্টা করলেও করতে পারেনা। অথচ সমাজ, রাষ্ট্র গঠনে, মানব সভ্যতা উন্নয়নে নারীর ভূমিকা প্রশ্নাতীত। তিনি অভিযোগ জানিয়ে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে অ-আদিবাসী দ্বারা আদিবাসী নারী ধর্ষণের শিকার হলে সেই ধর্ষককে বাঁচানোর জন্য সেখানকার সামরিক, বেসামরিক প্রশাসন উঠেপড়ে লেগে যায়। সামাজিক বাস্তবতা ছাড়াও প্রশাসনের এরুপ সাম্প্রদায়িক মনোভাবের দরুন পাহাড়ের আদিবাসী নারীদের উপড় সহিংসতার মাত্রা বেড়ে চলেছে।
ওয়ার্কাস পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, দেশে নারীর ক্ষমতায়নের এ সময়েও নারীর প্রতি নেগেটিভ দৃষ্টিভঙ্গি, পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার দরুণ নারীরা এখনো নিপীড়িত, নির্যাতিত। দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী প্রান্তিকতায় বসবাস করার কারণে আদিবাসী নারীদের অবস্থা আরো বেশী শোচনীয়। আদিবাসী নারীদের অধিকার সুরক্ষায় তাই আদিবাসী নারী অধিকার আন্দোলনকে মূল ধারার নারী অধিকার আন্দোলনের সাথে সংযুক্ত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, একটা সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের অংশগ্রহণ করতে হবে।
আলোচনা সভার সভাপতি তুলি লাবণ্য ¤্রংয়ের সমপনী বক্তব্যের আগে নিজ নিজ জায়গায় সফল তিন আদিবাসী নারীকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। তাঁরা হলেন, প্রথম আদিবাসী নারী আইনজীবি এ্যাডভোকেট সৃজনি ত্রিপুরা, নারী অধিকার কর্মী বিচিত্রা তির্কী এবং উদ্যোক্তা হেবাং রেষ্টুরেন্ট।
আলোচনা সভা শেষে বাংলাদেশ আদিবাসী কালচারাল ফোরাম, নবনীতা চৌধুরী, ইউ মিনি মারমা সূচি এবং আদিবাসী নারী ব্যান্ড ক্রেমলিন ব্যান্ডের পরিচালনায় এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *