সাবাঙ্গীদের গল্পকথা: আদিবাসী নারী উদ্যেক্তাদের জন্য অসীম অনুপ্রেরণা

সতেজ চাকমা: সাবাঙ্গী- একটি চাকমা ভাষার শব্দ। বাংলা অর্থ যদি বলি সেটা দাঁড়াবে- বন্ধু কিংবা সহকর্মী। একসাথে হাতে হাত মিলিয়ে সহযোগীতার সম্পর্ক নিয়ে থাকা বা কাজ করা- এই যদি হয় বন্ধু বা সহকর্মী শব্দদ্বয়ের সারার্থ তবে রাজধানী ঢাকার আদিবাসী নারী উদ্যোক্তাদের চাকমা ভাষায় দেওয়া- ‘সাবাঙ্গী’ শব্দটির মাধ্যমে পারষ্পরিক সহযোগীতায় উদ্যেক্তা হয়ে ওঠার কাজটি খুবই প্রাসঙ্গিক এবং অনুপ্রেরণার। এই কাজটি চলমান সমাজ বাস্তবতায় খুব একটা সহজ নয় কিংবা মসৃণও নই। সমস্ত বাঁধাকে উপেক্ষা করে কয়েকজন আদিবাসী নারীদের উদ্যেক্তা হওয়ার গল্পই বলছি।

বিগত ২৩ মে ২০১৯ চাকমা সার্কেল চীফ ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায়’এর উদ্ধোধনের মধ্য দিয়ে এই নারী উদ্যোক্তারা ৩ দিন ব্যাপী ‘সাবাংগী মেলা’র আয়োজন করে। উক্ত আয়োজনে অংশগ্রহনের সুযোগ ঘটে আইপিনিউজ এর এই প্রতিবেদকের। মেলায় কথা হয় এই নারী উদ্যোক্তাদের সাথে। এই মেলার মধ্য দিয়ে ছয় আদিবাসী নারী উদ্যোক্তা সম্মিলিতভাবে রাজধানী ঢাকার কাজীপাড়ায় একটি আউটলেটের মাধ্যমে উদ্যোক্তা জগতে আত্মপ্রকাশ করেন। তার প্রায় ছ’ মাস পর (ডিসেম্বর-২০১৯) আবারও এই প্রতিবেদকের যাওয়ার সুযোগ ঘটে তাঁদের আউটলেটে। কেমন চলছে এই উদ্যোক্তাদের ‘সাবাংগী’ হয়ে যুথবদ্ধ কাজ। সে গল্পে যাওয়ার আগে প্রসঙ্গ না বললে তাঁদের গল্পটা অপূর্ণই থেকে যাবে।

ঈশী তালুকদার। এই নারী উদ্যোক্তার আউটলেটের নাম ‘তুঙোবী’। তাঁর আউটলেটে পাওয়া যায় মেয়েদের নানা ধরণের পোশাক। টপ,স্কার্ট, ত্রি-পিস থেকে শুরু করে নানা ধরণের ড্রেস। তবে সেই ড্রেসগুলো অন্য দশটি আউটলেটের মত গতানুগতিক নয়। রয়েছে আদিবাসী নারীদের ঐতিহ্যবাহী স্বকীয় রঙের মিশ্রণ এবং ডিজাইনের মধ্যেও পাহাড়ী জুম্ম নারীদের পোশাকের একধরণের স্বকীয়তার ছাপ।
অন্যদিকে সুচিন্তা চাকমা’র আউটলেটের নাম ‘বিয়োং’। বিয়োং হল চাকমা নারীদের নিজস্ব কোমড় তাতে কাজ করার জন্য নানা যন্ত্রপাতির মধ্যে কাঠের তৈরী একটি সামগ্রী। চাকমা সমাজে এক ধরণের শৌর্য, বীর্যের প্রতীক হিসেবেও দেখা হয় এই বিয়োং কে। এই বিযোং এর কারুকার্যে চাকমা রমনীদের স্বকীয় মেধা-মননের নিঁখুত সুতার মায়াবী গাথুনিতে সেজে ওঠে পিনোনের বুকে রঙিন ‘সাবুগী’। এই সাবুগীতে হাসতে থাকে রেবেক ফুল। সে যাই হোক, তাঁর আউটলেটে গিয়ে দেখা পেলাম সেখানে সাজানো রয়েছে চাকমা রমনীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘পিনোন’ এবং ‘হাদি’র। রেয়ন সুতা’র তৈরী নানা কারুকার্যে সৌভিত এই পিনোন ও হাদি বেশ চড়া দামে রাজধানীর বুকে বিক্রি হয় বলে জানলাম। বিশেষ করে বিয়ের মৌসুমে চাকমা সমাজে যুবা-যুবতীদের যুথবদ্ধ পথচলার যে আয়োজন চলে সেখানে এই পিনোন-হাদির চাহিদা বেশ প্রবল। কেবল পিনোন নই সেখানে পাওয়া যায় ভারত থেকে আমদানীকৃত মেয়েদের জন্য কাশ্মীরের ব্যাগ, কুর্তি, শাল, জামা, ফেসপেক, কিছু অর্গানিক তৈল সহ নানা পদের সামগ্রী।

অন্যদিকে জিলিয়ান তালুকদারের আউটলেটের নাম- কোরিয়ান গ্রাম-বাংলাদেশ।তাঁর আউটলেটে পাওয়া যায় মেয়েদের জন্য সাজ-সজ্জ্বার নানা জিনিস। বিশেষ করে উন্নতমানের ফেস ওয়াশ, ক্রিম, ক্লিনিং ওয়েল, স্কিন টোনার। মূলত এই আউটলোটটি সৈন্দর্য্য চর্চা বা যারা একটু যত্নশীল তাঁদের জন্য।

ত্রিশিলা চাকমা’র আউটলেটের নাম ‘তারেং’। এটিও চাকমা ভাষার একটি শব্দ। মূলত উঁচু পাহাড়ের ঢালের খাদগুলোকেই চাকমা’রা বলে তারেং।তাঁদের আউটলেটে পাওয়া যায় বিভিন্ন ধরণের টি-শার্ট, পুরুষদের জন্য পাঞ্জাবি, পাজামা, শীতকালের হুদি, চাকমা নারীদের কোমড় তাতে বোনা বরগী(এক ধরণের কাঁথা) সহ নানা পোশাক। টি-শার্টগুলোতে সেজে উঠেছে পাহাড়ের বিভিন্ন ছবির আয়োজন। কখনো কাপ্তাই বাঁধের ফলে পানিতে ডুবে যাওয়া চাকমা রাজবাড়ীর ডুবন্ত অবস্থার স্মৃতিচারণ পূর্ণ ছবির ছাপ, কিংবা কখনো চাকমা নারীদের পিনোন-খাদি বুননের অন্যতম সামগ্রী ঐতিহ্যবাহী ‘আলাম’এর উজ্জ্বল হাসি। অন্যদিকে অনেক টি-শার্ট ডিজাইন করা হয়েছে চাকমাদের বর্ণমালা দিয়ে আবার কিছু কিছুতে পাহাড়ে বসবাসরত আদিবাসী জীবনের সুখ,দু:খ, বিরহ মিলনের নানা চিত্র সহ যুথবদ্ধ সাংস্কৃতিক মিলনের সুন্দর অবয়ব ফুটে উঠেছে। এইসব কিছু ডিজাইনের সাথে ত্রিশিলা চাকমা’র অন্যতম সহযোগী নিঁখুত চাকমা বেশ প্রশংসার দাবীদার।
‘রানজুনি’ নামে আরেকটি আউটলেট পাশাপাশিতে দেখা মিললো। এই আউটলেটটির উদ্যোক্তা উপমা চাকমা। তাঁর আউটলেটে দেখা মিললো চাকমা নারীদের ঐতিহ্যবাহী পিনোন এর আদলে বিভিন্ন কাপড়ের তৈরী স্কার্ট, টপ, ত্রি-পিস। কেবল চাকমা নারীদের পিনোন-খাদির সাজ নয় সেসব পোশাকগুলোতে ত্রিপুরা মেয়েদের ঐতিহ্যবাহী রিনাই-রিসাই এর নতুন আবহও দেখতে পেলাম। অন্যদিকে বিভিন্ন ধরণের ক্রপ-টপ সহ পাহাড়ী মেয়েদের পোশাকের যে আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে সেটার কিছুটা নতুন ডিজাইনে আধুনিক সংস্করণে গলার মালারও দেখা পেলাম। এসবের ডিজাইন উদ্যোক্তা নিজেই করেন বলেও আইপিনিউজের এই প্রতিবেদককে জানালেন।

সর্বশেষ আউটলেটটির মধ্যে পাহাড়ের সেই পুরনো ঐতিহ্যের ভাঁজে ফিরে যাওয়ার আকুতি আছে। যেটির নাম- বক্স অফ অর্নামেন্ট। ঋতিষা চাকমা’র উদ্যোগে করা হয়েছে সেই আউটলেটটি। মূলত চাকমা রমনীদের ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন অলঙ্কারগুলোকে আধুনিকতার নতুন আদলে তৈরী করা হয়েছে। নিজস্ব মেধা-মননের মাধ্যমে তাঁর তৈরী করা এই আউটলেটে চোখে পড়লো নারীদের জন্য পয়সার মালা, হুজিক হারু, আলছরা, আজুলি, ঠেঙত হারু, হান-পাজা, গলার মালা সহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী অলঙ্কারের এক অপূর্ব সংকলন। পয়সার মালা ও আলছরা ব্যবহার করা হয় গলায়। পায়ের গোড়ালির একটু উপরে পরা হয় হারু।সেটাকে বলা হয় ‘ঠেঙত-হারু’। এইসব নানা অলঙ্কারের সম্ভারে স্বকীয় সংস্কৃতি রক্ষার একটা আকুতি আছে।আছে নিজস্ব ইতিহাসকে খুঁড়ে নতুন অবয়ব দিয়ে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার আয়োজন।

উপরোক্ত আদিবাসী নারী উদ্যোক্তারা আইপিনিউজকে জানালেন, কেবল বানিজ্যিক উদ্দেশ্য নয়, স্বকীয় সংস্কৃতির যে বর্ণাঢ্য সাজ রয়েছে সেটাকে জাতীয় এবং বৈশ্বিক পরিমন্ডলে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বানিজ্যিক কাঠামোর সাথে যুক্ত করার একটা প্রচেষ্টাও তাঁদের আছে।

নিজস্ব সংস্কৃতি আঁকড়ে ধরে থাকাটা যদি হয় অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার তবে এই আদিবাসী নারী উদ্যোক্তাদের প্রয়াসগুলোর মাধ্যমে আধুনিক বৃহৎ সংস্কৃতিগুলোর আগ্রাসনে বিলুপ্তির পথযাত্রী আদিবাসী সংস্কৃতির সমৃদ্ধ সাজ সামগ্রীগুলোকে এভাবে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার শুভ প্রয়াসই আদিবাসীদের টিকে থাকার লড়াইয়ের মধ্যে অন্যতম একটি অনুষঙ্গ। তবে আমি তাঁদের অনুরোখ করেছিলাম, নিজস্বতাকে যত বেশি পরিমাণ ধরে রেখে অন্য সংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে মুক্ত করে বিশ্ব বানিজ্যে টিকিয়ে রাখা যায় ততই আমাদের আদিবাসীদের জন্য মঙ্গল এবং শুভকর। তবে পোশাক ও সাজ-সজ্জ্বার বাহারী আয়োজনের মাধ্যমে আধুনিকতার নব-সংস্করণে সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় আদিবাসীদের বর্ণাঢ্য এই সাজ ও অলঙ্কারগুলো পরিচিতি পাক এবং বিশ্ব দরবারে টিকে থাকুক- এই প্রত্যাশা থাকবে।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *