সংবিধানে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর স্বীকৃতি না দেওয়ার ফলে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক: সংবিধানে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর স্বীকৃতি না দেওয়ার ফলে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অ্যাড সুলতানা কামাল আরো বলেন, আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীদের দেশ থেকে বিতাড়িত করার ইচ্ছা থেকেই সরকারী বা বেসরকারীভাবে তা করা হচ্ছে। যদি তাই না হতো তাহলে কেন স্বাধীনতার ৪০ বছরে এসেও এ জনগোষ্ঠীর মানুষেরা বলছে এ জীবন আমাদের না!!! কেন তাদের জনসংখ্যা দিনকে দিন কমে যাচ্ছে!!!আদিবাসীদের অধিকার রক্ষার আন্দোলনে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি, দেশের মূল ধারার বাঙালী জনগোষ্ঠীর আরো এগিয়ে আসা উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস-২০১৯ উপলক্ষে “আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস-২০১৯ উদযাপন জাতীয় কমিটি” কর্তৃক ২৭ আগস্ট ২০১৯ তারিখে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে “বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি ও ভাষার অধিকার সুরক্ষা” শীর্ষক এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।

বিশিষ্ট মানবাধিকার নেত্রী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অ্যাড. সুলতানা কামালের সভাপতিত্বে সেমিনারে সূচনা বক্তব্য রাখেন এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস এবং বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং। এছাড়াও আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগেরসাবেক বিচারপতি মো: নিজামুল হক, মানবাধিকার কর্মীও নিজেরা করি’র সমন্বয়ক খুশী কবির, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. রানাদাশ গুপ্ত, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের অ্যাডভোকেটব্যারিষ্টার জ্যোতির্ময় বড়–য়া প্রমুখ।
বুাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং তার মূল বক্তব্য পাঠ করতে গিয়ে বলেন, খুব বুঝতে পারি, এই রাষ্ট্র, রাষ্ট্রযন্ত্র স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছরের কাছাকাছি সময়ে এসেও আদিবাসী মানুষের, প্রান্তিক দরিদ্র বাঙালির, চা বাগানের অগণিত মানুষের, দলিত ও গ্রামীণ কৃষকের, হাওর ও চরাঞ্চলের মানুষের “আপনভূমিতে” এই রাষ্ট্র পরিণত হয়নি। এখানে আকাশছুঁয়া উন্নয়নের আস্ফালনের পাশাপাশি রয়েছে প্রবল বৈষম্যের করুণ ও নীরব হাহাকার আর আর্তনাদ। যা হবার কথা ছিল সবার জীবনে, তা হয়নি। তিনি প্রশ্ন করেন, কেন আজও পাহাড়ে আদিবাসী মানুষকে হাহাকার করতে হয়? কেন তারা প্রশ্ন করে, এখানে জীবন আমাদের নয়, লাইফ ইজ নট আওয়ার্স।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে এখনো আদিবাসী জাতিসমূহের জাতিসত্তা, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ভূমি অধিকারসহ মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি নেই। আদিবাসী সংগঠনসমূহ বার বার বলার চেষ্টা করেছে, আদিবাসী জনগণের আত্ম-পরিচয়ের অধিকার রয়েছে। এটি আদিবাসীদের মানবাধিকার। আন্তর্জাতিকভাবেও আদিবাসীদের আত্ম-পরিচয়ের অধিকার স্বীকৃত। তাই সংবিধান সংশোধন করে আদিবাসী জাতিসমূহের আশা-আকাঙ্খা ও দাবির ভিত্তিতে আদিবাসীদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ভূমি অধিকারসহ মৌলিক অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস তার প্রবন্ধ উপস্থাপন করতে গিয়ে বলেন, আদিবাসীদের জীবন বন ও পরিবেশ নির্ভর। তারা বনকে জীবনের অংশ হিসেবে দেখে। সেই বনকে সম্প্রসারণের নামে বনবিভাগ কর্তৃক অবৈধভাবে আদিবাসীদের ভূমি দখল করা হচ্ছে। যার ফলে আদিবাসীরা প্রতিনিয়ত দেশান্তরিত হচ্ছেন। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২১ টি বছর পেরিয়ে গেলেও পাহাড়ে প্রত্যাশিত শান্তি এখনো আসেনি। ভাগ কর শাসন কর নীতির মাধ্যমে শাসক গোষ্ঠী কর্তৃক সেখানে চুক্তি বিরোধী অপশক্তিগুলোকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং চুক্তি বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রিতা হেতু সেই অপশক্তিগুলো দিনে দিনে সক্রিয় হয়ে উঠছে। যার ফলে পাহাড়ে খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো সেখানে নিত্যনৈমত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চুক্তি স্বাক্ষরকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের নির্বাচনী ইশতেহারে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ না থাকা চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের মনোভাব কি তা পরিস্কার হয়ে যায়। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ একটি বহু জাতির সম্মানজনক অংশীদারিত্বের রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত হতে গেলে আদিবাসী জাতিগুলোর সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে, তাদের ভাষা-শিল্প-সংস্কৃতি-জীবনধারার স্বাতন্ত্র্যতা সংরক্ষণ করতে হবে, তাদের স্থানীয় শাসন ও ঐতিহ্যগত শাসন কাঠামোর সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়নে সময়সূচী ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

মানবাধিকার কর্মী এবং নিজেরা করি’র সমন্বয়ক খুশী কবির বলেন, ধর্ম-বর্ণ-জাতি-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকলের অংশগ্রহণের মাধ্যমেই মহান মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র নির্মাণের পেছনে আদিবাসী, কৃষক, শ্রমিক, গরীব মেহনতি মানুষের অনেক আত্মত্যাগ রয়েছে। সুতরাং এ রাষ্ট্রে সকল সম্প্রদায়ের সকল বর্ণের সকল জাতিগোষ্ঠীর মাথা উঁচু করে নিজের অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। তিনি আরো বলেন, আদিবাসী সংস্কৃতিতে জীবন এবং প্রকৃতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভূমি, বন, প্রকৃতি তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। সেই ভূমি বেদখল করে উন্নয়নের ফিরিস্তি চলতে পারে না। সকলের মধ্যে সাম্যবোধ, শ্রদ্ধাবোধ হৃদয়ঙ্গম করার মাধ্যমেই মানবিক মর্যাদার বাংলাদেশ তৈরী হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এ্যাডভোকেট রানাদাশ গুপ্ত বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ একুশের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নির্মাণের লক্ষ্যে সংগঠিত হয়েছিল। কিন্তু সংবিধানের সাম্প্রদায়িকীকরণের ফলে মুক্তিযুদ্ধের সে চেতনায় ব্যাঘাত ঘটে। যার ফলে মানবিক মর্যাদার বাংলাদেশ গঠন সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী মানুষের আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচার লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি অগাধ বিশ্বাস রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামের গণমানুষের পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত করে। কিন্তু সে চুক্তির ২১ বছরেও পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। উপরন্তু শাসক গোষ্ঠীর কূটনীতিতে নতুন করে চুক্তিবিরোধী শক্তিগুলোর উদ্ভব ঘটেছে। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের চার আঞ্চলিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি পাহাড়ের পুরাতন ও ঐতিহ্যবাহী একটি রাজনৈতিক দল। এ দলের কাছে অন্যান্য তিনটি দল অস্ত্র ত্যাগ করে সমঝোতার ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলুন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে ধর্ম এবং সাম্প্রদায়িকতা ত্যাগ করে ধর্ম নিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক সংবিধান তৈরী করার দাবী তোলেন।

বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের ব্যারিষ্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বান্দরবানের ডেইলী স্টারের প্রতিনিধির বিরুদ্ধে আদিবাসী শব্দ ব্যবহারের প্রেক্ষিতে করা মামলার সমালোচনা করে বলেন, আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করা যাবেনা বলেবাংলাদেশের কোন আইন লেখা নেই। এমনকি বাংলাদেশ সংবিধানেও কোথাও সেই ধারাটি নেই। সুতরাং কেবলমাত্র হয়রানির উদ্দেশ্য নিয়েই এ ধরণের মামলাগুলো করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সংবিধানে বাংলাদেশের আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর স্বীকৃতি না করা মানে তাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার সামিল। যার ফলে তারা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরণের হয়রানির শিকার হচ্ছে।

বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মো: নিজামুল হক বলেন,জাতিসংঘের আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র ২০০৭ অনুযায়ী আদিবাসীদেরকে তাদের ভূমি থেকে উৎখাত করা যাবেনা। ভূমির সাথে তাদের ঐতিহ্যগত সম্পর্কের হেতু কাগজপত্র না থাকলেও তারা ভূমির মালিক হিসেবে বিবেচিত হবে। তিনি বলেন, ১৯৪৭ সালের দ্বি জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগ হলেও সেখানে মুসলিম ভিন্ন অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা কেমনে থাকবে সেটা লেখা ছিলো। একইভাবে কেবলমাত্র বাঙ্গালীর দেশ হবে এমন উদ্দেশ্য নিয়েও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ সংঘঠিত হয়নি। এ দেশ এ রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যেন সকল ধর্মের সকল জাতির মানুষেরা গর্বের সহিত বসবাস করতে পারে।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *