সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্মের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবীতে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত

৫ই সেপ্টেম্বর সোমবার সকাল ১০ টায় ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে রংপুর (মহিমাগঞ্জ) সুগার মিলের জন্য অধিগ্রহণকৃত সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের ১৮৪২.৩০ একর জমি থেকে উচ্ছেদ হওয়া প্রান্তিক চাষি ও আদিবাসীদের নিকট ভূমি পুনরুদ্ধারের (রেস্টোরেশন) মাধ্যমে ফিরিয়ে দেবার দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে সমতলের আদিবাসীদের ভূমি রক্ষায় নাগরিক সমাজ। এতে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট লেখক ও কলামিস্ট আবুল মকসুদ, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ পঙ্কজ ভট্টাচার্য, মানবাধিকার কর্মী খুশি কবির, নাগরিক উদ্যোগের জাকির হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন, আইইডির নির্বাহী পরিচালক নুমান আহমেদ খান, এলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, গবেষক ও লেখক পাভেল পার্থ প্রমুখ।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন গবেষক ও লেখক পাভেল পার্থ। নিচে সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্য দেওয়া হলঃ
সুপ্রিয় শ্রদ্ধাভাজন সাংবাদিক বন্ধুরা

সমতলের আদিবাসীদের ভূমি রক্ষায় নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে অভিনন্দন গ্রহণ করুন।

নিশ্চয়ই আপনারা অবগত আছেন যে, গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ৫নং সাপমারা ইউনিয়নের রামপুর, সাপমারা, মাদারপুর, নরেঙ্গাবাদ ও চকরহিমাপুর মৌজার ১৮৪২.৩০ একর ভূমি ‘রংপুর (মহিমাগঞ্জ) সুগার মিলের’ জন্য অধিগ্রহণের নামে কেড়ে নেয় তৎকালিন পূর্ব-পাকিস্তান সরকার। এলাকাটি সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম নামে পরিচিত। অধিগ্রহণের ফলে ১৫টি আদিবাসী গ্রাম ও ৫টি বাঙালি গ্রাম উচ্ছেদ হয়। কথা ছিল অধিগ্রহণের নামে গ্রামের মানুষের কাছ থেকে জোর করে কেড়ে নেয়া এই জমিনে আখ চাষ হবে। আখ ভিন্ন অন্য কোনো ফসল চাষ করা হলে বা চিনিকলের উদ্দেশ্যর সাথে সম্পর্কহীন কোনোকিছু করা হলে কেড়ে নেয়া এসব জমি আবারো ভূমিমালিকদের ফিরিয়ে দেয়া হবে।

অধিগ্রহণের পর বেশ কিছু জমিনে আখ চাষ হয় এবং আখ ব্যবহার করে চিনিও উৎপাদিত হয়। কিন্তু চিনিকল কর্তৃপক্ষের দুর্নীতি ও অব্যস্থাপনার দরুণ ৩১ মার্চ ২০০৪ সালে কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে নানা সময় একবার চালু হয়, আবার বন্ধ হয় এভাবেই চলতে থাকে। চিনিকল কর্তৃপক্ষ নানাভাবে অধিগ্রহণকৃত জমি বহিরাগত প্রভাবশালীদের কাছে ইজারা দিতে শুরু করে। অধিগ্রহণের চুক্তি লংঘন করে কেবলমাত্র আখচাষের জন্য বরাদ্দকৃত জমিতে ধান, গম, সরিষা ও আলু, তামাক ও হাইব্রিড ভূট্টা চাষ শুরু হয়। জন্মমাটি থেকে উদ্বাস’ আদিবাসী ও বাঙালিরা পুরো ঘটনাটি প্রশাসনের নজরে আনে। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১৫ সনের ৩০ মার্চ গাইবান্ধা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম এলাকা সরেজমিন তদন্ত করেন। তদন্তকালে তারা উল্লিখিত জমিতে ধান, তামাক ও মিষ্টিকুমড়ার আবাদ দেখতে পান। কিন্তু গাইবান্ধা জেলা প্রশাসন ১০ মে ২০১৬ তারিখে উক্ত ভূমিতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন সরকার বরাবর। বাপ-দাদার জমিনে অধিকার ফিরে পাওয়ার দাবিতে আদিবাসী-বাঙালি ভূমিহীনদের তৈরি হয়েছে দীর্ঘ আন্দোলন। আন্দোলন দমাতে চিনিকল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন ভূমিহীনদের সংগ্রামে হামলা-মামলার বাহাদুরি চালাচ্ছে। আন্দোলনকারীদের উপর নির্বিচার গুলি চালিয়েছে প্রশাসন, গুলিবিদ্ধ ৪জন ও আহত অনেক নারী পুরুষ। কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন আন্দোলনকারী ৫১ জনের নামে ৪টি বানোয়াট মামলা দিয়েছে। গাইবান্ধা জেলে এখনও আটক নিজ ভূমিপ্রত্যাশী ৩ জন। ১৯৬২ থেকে ২০১৬, দীর্ঘ ৫৪ বছর ধরে চিনি উৎপাদনের অজুহাতে রাষ্ট্র সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের ভূমিউদ্বাস’ হাজারো মানুষের সাথে বর্ণবাদী অন্যায় করে চলেছে। ঘটনাটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সংবিধান, মানবিকতা ও আইন সবকিছুই লংঘন করে চলেছে। দ্রুত এর সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার জরুরি।

অধিকার রক্ষায় সক্রিয় সংবাদকর্মী

রংপুর (মহিমাগঞ্জ)চিনিকল গাইবান্ধা জেলার একমাত্র ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান। গোবিন্দগঞ্জের মহিমাগঞ্জ ইউনিয়নের শ্রীপ্রতিপুর মৌজায় এই চিনিকল তৈরি করা হয়। ১৯৫৪ সনে এই চিনিকল নির্মাণ শুরু হয় এবং ১৯৫৭ সনে শেষ হয়। ১৯৫৭-৫৮ সন থেকে এই চিনিকলে উৎপাদন শুরু হয়। ১৯৭২ সনেই বাংলাদেশ সরকার এই রংপুর (মহিমাগঞ্জ) চিনিকলকে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৬ সনের ভেতর ২০টি গ্রাম উচ্ছেদ করে ১৮৪২.৩০ একর জমি সুগার মিলের জন্য অন্যায়ভাবে অধিগ্রহণ করে পাকিস্তান সরকার। অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে সরকার জমির কোনো মূল্য দেয়নি। তখন জমিতে সেকল শস্য ফসল ছিল, বসতবাড়ির গাছপালা, কুয়া এবং ঘরবাড়ির একটা মূল্য ধরে দেয়। এছাড়াও গ্রামগুলিতে কবরস্থান, সমাধি, শশ্মান, মসজিদ, মন্দির, মাঞ্জহিথান ও গির্জা ধংসপ্রাপ্ত হয়। সেখানে ভূমির কোনো মূল্য নির্ধারণ করা হয়নি। ১৮৪২.৩০ একর জমির অধিগ্রহণ বাবদ মোট ৮ লাখ সাত হাজার ৩১৮ আনা ১০.৬ পয়সা রংপুর জেলা প্রশাসকের কাছে ১৯/৫/১৯৫৫, ২৯/২/১৯৫৬ এবং ৫/১০/১৯৫৬ তারিখে অগ্রীম প্রদান করে ‘পাকিস্তান ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন’। ১৯৪৮ সনের ‘রিক্যুইজিশন অব প্রপার্টি অ্যাক্ট’ অনুযায়ী এই জমি অধিগ্রহণ করা হয়।
বিস্ময়করভাবে অধিগ্রহণের নামে জমি কেড়ে নেয়ার প্রায় ৬ বছর পর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ‘পাকিস্তান ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন’ এবং পূর্ব পাকিস্তান’ সরকারের মধ্যে চুক্তিপত্র হয় ১৯৬২ সালের ৭ জুলাই। উক্ত চুক্তিপত্রে উল্লেখ করা হয়, ‘…১৮৪২ক্স৩০ একর সম্পত্তি ইক্ষু ফার্ম করার জন্য লওয়া হইল। উক্ত সম্পত্তিতে ইক্ষু চাষের পরিবর্তে যদি কখনো কি কোন সময় অন্য কোন ফসল উৎপাদিত হয় অর্থাৎ যে উদ্দেশ্যে সম্পত্তি অধিগ্রহণ করা হইয়াছে সেই উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত না করিয়া অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয় এবং তাহা প্রকৃত উদ্দেশ্যে বিপরীত হয় অথবা এই রকম ঘটনা ভবিষ্যতে ঘটিলে এই অবস’ার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন অধিগ্রহণকৃত ১৮৪২ক্স৩০ একর সম্পত্তি সরকার বরাবর ফেরত (সারেন্ডার) প্রদান করিবেন। দেশের সরকার বাহাদুর উক্ত সম্পত্তি গ্রহণ করিয়া পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়া (রেসটোরেশন) যাইতে পারিবেন।’

১৯৭১ সনে মুক্তিযুদ্ধের সময় চিনিকল বন্ধ থাকে এবং ভূমিহারা আদিবাসী ও বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সনে কারখানাটি আবার চালু হয়। অধিগ্রহণ চুক্তিতে বলা হয়েছে আখ চাষের কথা, কিন্তু কী জাতের আখ তা বলা হয়নি। চিনিকল কর্তৃপক্ষের লাগাতার অবহেলার কারণে কারখানা বারবার বন্ধ হয়ে যায় ও কর্মীদের ছাঁটাই করা হয়। চিনিকল কর্তৃপক্ষের দুর্নীতি ও অব্যস্থাপনার দরুণ ৩১ মার্চ ২০০৪ সালে কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। চিনিকল কর্তৃপক্ষ নানাভাবে অধিগ্রহণকৃত জমি প্রভাবশালীদের কাছে ইজারা দিতে শুরু করে। জানা যায় ২০০৫ সনে চিনিকলটি বিক্রির জন্য একটি টেন্ডার নোটিশও হয়েছিল। সাবেক সাংসদ গাইবান্ধা-৪ জনাব মনোয়ার চৌধুরী প্রভাব খাটিয়ে তার ছোট ভাই লিটন চৌধুরীর মাধ্যমে সুগারমিলের অধিগ্রহণকৃত অধিকাংশ জমি নামে-বেনামে ইজারা দেন এবং এ খাতে সুগার মিল তাদের কাছ থেকে প্রায় ২৯ লাখ টাকা প্রাপ্য আছে। অধিগ্রহণশর্ত লংঘন করে সুগার মিলের জমিতে বাণিজ্যিক মাছের খামার শুরু হয় এবং আরো ২৬টি পুকুর খননের প্রক্রিয়াধীন। এমনকি পুকুর খননের মাটি মিল কর্তৃপক্ষ অবৈধভাবে বিক্রি করে। লে-অফের পর মিল কর্তৃপক্ষ অনেক যন্ত্রপাতি অবৈধভাবে বিক্রি করে দেয়। এমনকি এলাকার বর্তমান সাংসদ দুই বছর পূর্বে নরেঙ্গাবাদ মৌজায় ভূমিহীন ৪০টি পরিবারকে অধিগ্রহণকৃত জায়গায় বসতি স্থাপন করিয়েছেন।

জনবান্ধব গণমাধ্যমকর্মী

চিনি উৎপাদনের জন্য মিল কর্তৃপক্ষ কী রাষ্ট্র কখনোই আন্তরিক ছিল না। তাই বারবার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে কারখানা। ২০০৪ সনে বন্ধের পর ২০০৬ সনের ১৬ জুলাই মিলটি পুনরায় চালু করার নির্দেশ দেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। ২০০৭-২০০৮ মওসুমে ৩৩ দিন চালু থাকে এবং ৫,৩২৫ টন চিনি উৎপাদিত হয়। ২০১৩-২০১৪ মওসুমে ৫,২৬৮ এবং ২০১৪-২০১৫ মওসুমে ২,৪৪০ টন চিনি উৎপাদিত হয়। বছরে ১৫ থেকে ৪৫ দিন কারখানা চালু থাকে। রংপুর (মহিমাগঞ্জ) চিনিকলে প্রচুর চিনি অবিক্রিত থেকে যায়। ২০১৩ সনে তিনহাজার ২৪৬ মেট্রিক টন চিনি বস্তাবন্দী হয়ে দুই বছর ধরে গুদামে পড়ে গলে গেছে। রংপুর চিনিকল আখচাষি কল্যাণ গ্রুপের সভাপতি তখন গণমাধ্যমে অভিযোগ করেছিলেন, চিনিশিল্প সংস্থার ভুল নীতির কারণে এত চিনি অবিক্রিত থেকে যায়। কোটি কোটি টাকা লোকসান করে সুগার মিলটি এখন ঋণের ভারে জর্জরিত। অধিগ্রহণের শর্ত ভঙ্গ করে মিল কর্তৃপক্ষ বেআইনিভাবে জমি লিজ দিয়ে জমির শ্রেণি ও মালিকানা পরিবর্তন করতে থাকে। জন্মমাটি থেকে উদ্বাস্তু আদিবাসী ও বাঙালিরা পুরো ঘটনাটি প্রশাসনের নজরে আনে। সরকারিভাবে এ ঘটনায় সরেজমিন তদন্ত ও প্রতিবেদনও তৈরি হয়। কিন্তু এসব তদন্ত প্রতিবেদনও লংঘিত হচ্ছে। গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা ভূমি অফিসের একটি প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ১৮৪২.৩০ একর জমির ভেতর আনুমানিক ১৫০২ একর জমি মিল কর্তৃপক্ষ শুরু থেকে এখনও পর্যন্ত লিজ দিয়ে আসছেন এবং অবশিষ্ট ৩৪০ একর জমির মধ্যে স্টাফ কোয়ার্টার, রাস্তাঘাট, পুকুর আছে। ১৫০২ একর জমি ২০১৩-২০১৪ অর্থ বছরে ২৯ মাসের জন্য লিজ দেয়া জমিতে ধান, তামাক, গম ও পাট ও বিভিন্ন শাকসব্জি চাষ হচ্ছে।

সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি ভূমি ফেরতের দাবি জানিয়ে দরখাস্ত করেন গাইবান্দা জেলা প্রশাসক বরাবর ২০১৫ সনের ১৫ মার্চ। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১৫ সনের ৩০ মার্চ গাইবান্ধা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম এলাকা সরেজমিন তদন্ত করেন। তদন্তকালে তারা উল্লিখিত জমিতে ধান, তামাক ও মিষ্টিকুমড়ার আবাদ দেখতে পান। এ সময় গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং সার্ভেয়ার উপসি’ত ছিলেন। তদন্তের সময় চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জেনারেল ম্যানেজার এবং অভিযোগকারীদের বক্তব্য শোনা হয়। এ বিষয়ে গাইবান্ধার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ২০১৫ সনের ২১ জুন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। প্রতিবেদনটিতে আখ বাদে অন্য ফসল চাষের ক্ষেত্রে চিনিকল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হলো, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের ২৫/৮/২০০৯ তারিখের ১৮৭৪ নং বোর্ডসভার সিদ্ধান্তের আলোকে সাহেবগঞ্জ খামারের ১৫০২ একর জমিতে তারা আখ চাষের পাশাপাশি অন্যান্য ফসল আবাদ করার জন্য তারা জমি লিজ দিয়ে থাকেন। এসব কিছুকে ছাপিয়ে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসন চিনিকলের জন্য অধিগ্রহণের নামে কেড়ে নেয়া জমিনে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে সরকারের কাছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে প্রস্তাবের সময় জেলা প্রশাসক নিজের চোখে দেখা কৃষি কাজকে অস্বীকার করেছেন। বরং গাইবান্ধা জেলা প্রশাসন এক্ষেত্রে প্রবল মিথ্যাচার করেছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রস্তাবপত্রে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসন বিরোধপূর্ণ এ জমিনকে বলছে, ‘অব্যবহৃত’ ও ‘পরিত্যক্ত’।

অধিকার সচেতন সাংবাদিক বন্ধুরা

সুগার মিলের কারণে ভূমিবঞ্চিত মানুষেরা দিনে দিনে সংগঠিত হয়েছেন। ২০১৪ সনের ৫ মার্চ গঠিত হয়েছে ৬১ সদস্য বিশিষ্ট ‘সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি’। ২০১৫ সনের ২৫ ফেব্রুয়ারি সাহেবগঞ্জ হাইস্কুল মাঠে সংগ্রাম কমিটি এক বিশাল জনসভার আয়োজন করে। ২০১৫ সনের ৩০ আগষ্ট এ কমিটি জাতীয় আদিবাসী পরিষদসহ ঢাকায় এসে প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে। প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে জন্মমাটি ফেরতের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে। সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৬১ তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে সংগ্রাম কমিটি গোবিন্দগঞ্জের কাটামোড়ে প্রায় ৬০০০ মানুষের এক বিশাল সমাবেশ আয়োজন করে। ১০ জুলাই সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে কাটামোড় থেকে চারা বটগাছ পর্যন্ত চার কিলোমিটার রাস্তায় মানববন্ধন করে। আশেপাশের নানা এলাকার ৫০ হাজার আদিবাসীদের সঙ্গে প্রায় ১০ হাজার বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এই ভূমি আন্দোলনে। কিন’ রাষ্ট্র জনগণের দাবিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না, বরং হামলা-মামলার মাধ্যমে নানাভাবে আন্দোলন স্তব্ধ করে দিতে চাইছে।

সম্প্রতি অধিগ্রহণের নামে কেড়ে নেয়া জমিনে ভূমিউদ্বাস্তু গরিব কৃষিমজুরেরা প্রায় ২০০০ পরিবার ঘর তুলে বসবাস করছে। শিক্ষা থেকে বঞ্চিত শিশুদের জন্য চালু হয়েছে ‘ফুলমনি মুর্মু শিশু শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’। ২০১৬ সনের ১ জুলাই চিনিকল কর্তৃপক্ষ, গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কমকর্তা পাঁচটি মৌজায় পরিদর্শণ করে সকলকে ঘরবাড়ি তুলে চলে যাওয়ার কথা বলেন। ৩ জুলাই তারা পুনরায় স্থানীয় সাংসদসহ এসে আন্দোলনকারীদের জমি খালি করবার হুমকী দেন। ঐদিনই রংপুর চিনকল কর্তৃপক্ষ আন্দোলনকারী ১৩ জনের বিরুদ্ধে গোবিন্দগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে চিনিকল কর্তৃপক্ষ ও গোবিন্দগঞ্জ থানা নরেঙ্গাবাদের জাফরুল ইসলাম ও জাহিদুল ইসলামের নামে মামলা দায়ের করে। ৯ জুলাই মিল কর্তৃপক্ষ পুলিশসহ সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মে এসে সবাইকে ওঠে যাওয়ার জন্য ধমক দেয় এবং আগুন লাগিয়ে নতুন বসতি পুড়িয়ে দেয়ার হুমকী দেয়। ২০১৬ সনের ১২ জুলাই মিল কর্তৃপক্ষ দুপুর একটার দিকে পুলিশ ও সন্ত্রাসী-লাঠিয়াল বাহিনি নিয়ে নারেঙ্গাবাদ মৌজায় অবস্থান নেয় এবং আন্দোলনকারীদের বাড়িঘর ভাঙচুর করে। নারেঙ্গাবাদ মৌজায় চিনিকলের একটি পরিত্যক্ত ঘর আছে, হামলাকারীরা সেই অফিস ভাঙচুর করে দায় চাপায় আন্দোলনকারীদের উপর। তারপর হঠাৎ কোনোধরণের ঘোষণা ছাড়াই পুলিশ আন্দোলনকারীদের উপর গুলি করে। ভূমিহীন জনগণও তীর-ধুনক নিয়ে দাঁড়ায়। পুলিশের গুলিতে বেলোয়া গ্রামের মাঝি হেমব্রম, বুলাকিপুর গ্রামের মাইকেল মার্ডি, গুচ্ছগ্রামের সোবান মুরমু ও বেলোয়া গ্রামের মুংলী টুডু চারজন গুলিবিদ্ধ হয় এবং অনেকেই আহত হয়। দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে চিকিৎসারত অবস’ায় আহত গুলিবিদ্ধ ভূমিহীনদের গভীররাতে হাসপাতাল থেকে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠানো হয়।

সংগ্রামী সাংবাদিক বন্ধুগণ

সুগার মিলের কারণে অধিগ্রহণের নামে কেড়ে নেয়া বাপ-দাদার জমিতে অধিকার ফেরত পাওয়ার দাবিতে সংগঠিত সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের এই আন্দোলন নিছক ভূমি রক্ষার আন্দোলনই নয়। এই আন্দোলন দেশের সংবিধান ও বিচারব্যবস্থার প্রতি গণমানুষের আস্থা ও বিশ্বাস মজবুতের লড়াই। আমরা বিশ্বাস করি সরকার এই আন্দোলনের দাবি ও বিবেচনাকে গুরুত্ব দিবে এবং ভূমিবঞ্চিত আদিবাসী ও বাঙালিদের ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে। কোনো হামলা, মামলা, নির্যাতন আর চোখ রাঙানি দিয়ে এই ন্যায্য ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন নস্যাৎ করবার যে অপচেষ্টা চলছে সরকার এর বিরুদ্ধে আইনত ব্যবস’া নিবে আমরা এটি প্রত্যাশা করি। অধিগ্রগ্রহণকৃত জমি ভূমিবঞ্চিতদের মাঝে আইনতভাবে ফিরিয়ে দিয়ে সরকার গণতান্ত্রিক চর্চার দৃষ্টান্ত স’াপন করুক। আজকের এই সংবাদ সম্মেলনে উপসি’ত সকলকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমরা সকলকে এই আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানাচ্ছি। আজকের এই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আমরা আবারো দাবি জানাই:
১. রংপুর (মহিমাগঞ্জ) সুগার মিলের জন্য অধিগ্রহণকৃত সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের ১৮৪২.৩০ একর জমি থেকে উচ্ছেদ হওয়া প্রান্তিক চাষি ও আদিবাসীদের নিকট ভূমি পুনরুদ্ধারের (রেস্টোরেশন) মাধ্যমে ফিরিয়ে দিতে হবে।
২. ভূমিহীন আন্দোলনকারীদের নামে সকল প্রকার মিথ্যা মামলা বাতিল, হামলা ও নির্যাতন বন্ধ করে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
সকলকে আবারো ধন্যবাদ ও অভিনন্দন!

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *