ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা

সতেজ চাকমা: দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের মাঠে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ঢাবি,চবি ও জাবি’তে পড়ুয়া আদিবাসী শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিলনমেলা। দেশের প্রথম সারির এই তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় তিন শতাধিক আদিবাসী শিক্ষার্থীর প্রাণবন্ত অংশগ্রহন এবং বিভিন্ন খেলাধুলা, আনন্দ-বেদনা, বিরহ-মিলনের সহভাগীতা ও পারষ্পরিক সৌহার্দের মধ্য দিয়ে এ মিলন মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই মিলন মেলায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধশতাধিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেড়শতাধিক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন। মিলন মেলার শুরুতেই সকাল ৯.০০ ঘটিকার সময় জগন্নাথ হলের খেলার মাঠে ঢাবি বনাম চবি’র আদিবাসী শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। মুহুর্মুহু করতালি আর উচ্ছ্বাসের মাধ্যমে এ প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচটি সমাপ্ত হয় ৩৩ রানের ব্যাবধানে চবির আদিবাসী শিক্ষার্থীদের জয়ের মধ্য দিয়ে। এই প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচে ঢাবির আদিবাসী শিক্ষার্থীরা হারলেও তারা দুপুরের খাবারের আয়োজনে চবি এবং জাবি থেকে আগত আদিবাসী বন্ধুদের নিজেদের ক্যাম্পাসের খাবারের সুন্দর আপ্যায়ন করতে ভুলেননি এই মিলনমেলার অন্যতম আয়োজক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদিবাসী(জুম্ম) শিক্ষার্থী পরিবার। এছাড়া এরই মধ্যে চবি বনাম জাবি’র আদিবাসী শিক্ষার্থীদের মধ্যেকার একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচও অনুষ্ঠিত হয় একই মাঠে। ম্যাচটিতে ১-০ ব্যবধানে জাবি’র আদিবাসী শিক্ষার্থীরা হেরে যায় চবির আদিবাসী শিক্ষার্থীদের কাছে। খাবারের পরেই খানিক বিশ্রামের মধ্যে গল্প-সল্পের ফাঁকে আবারো জমে ওঠে মিলনমেলার আসর।তিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একত্র হওয়া আদিবাসী নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যেকার মিউজিক্যাল বল খেলা বেশ জমে ওঠে গানের তালে তালে। সাথে গানের সুর সচল থাকে পাহাড়ী শিক্ষার্থীদের চিরচেনা সেই সুর-”পাহাড়ী ছাত্র-ছাত্রী দল/ জ্ঞানের মশাল জ্বালিয়ে নিয়ে এগিয়ে চল/ ওরে এগিয়ে চল এগিয়ে চল।”মিউজিক্যাল বলের পরে ঢাবি বনাম চবি নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যেকার রশি টানাটানি প্রতিযোগীতাও অনুষ্ঠিত হয়।

মিউজিক্যাল বলের পরেই শুরু হয় দুই চির প্রতিদন্দ্বী দল চবি এবং ঢাবি জুম্ম সেরা একাদশের মধ্যেকার প্রীতি ফুটবল ম্যাচ। করতালি এবং তুমুল উত্তেজনা এবং জগন্নাথ হলের উপাসনালয়,গ্যালারি এবং মাঠের চারপাশ দর্শক পরিবেষ্টিত এক উত্তেজনাকর ফুটবল ম্যাচ। চবি’র মাঠে বিগত মিলনমেলায় ঢাবির জুম্ম একাদশের কাছে শোষনীয় পরাজয়ের পর নিজেদেরকে শক্তভাবে প্রস্তুত করে মাঠে নামে চবি’র সেরা জুম্ম একাদশ। কিন্তু নিজেদের ঘর বলে কথা। ৫-০ গোলে ঘরের মাঠে আবারো নিজেদের জয় ধরে রাখলো ঢাবি আদিবাসী শিক্ষার্থীরা।

প্রীতি ফুটবল ম্যাচের পর তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই মিলন মেলাকে কেন্দ্র করে সংক্ষিপ্ত আনুষ্ঠানিক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।আলোচনা সভায় অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন আদিবাসীদের অধিকার আন্দোলনের সাথে যুক্ত কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমা এবং তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি আলোচনায় অংশ নেন ডাকসুর একমাত্র আদিবাসী সদস্য যোশীয় সাংমা চিবল।আলোচনায় অংশ নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষার্থী মিন্টু চাকমা বলেন, আমাদের জীবনগুলো এখনো এক অনিশ্চিত অন্ধকারের মধ্যে আবদ্ধ। এর থেকে উত্তোরণের জন্য আমাদের মধ্যেকার ঐক্য,সংহতি ও ভ্রাতৃত্ব আরো দৃঢ় করা জরুরী। সেজন্য আজকের মিলনমেলা আমাদেরকে আরো ঋদ্ধ সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ করবে বলে মত দেন চবির এই শিক্ষার্থী। তিনি আগামীতে আবারো অন্য সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী শিক্ষার্থীদের নিয়ে আরো বড় পরিসরে এই মিলনমেলা আয়োজনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

জাহাঙ্গীনরগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষাথী রেঙ ইয়ং ম্রো বলেন, আমরা তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এতগুলো শিক্ষার্থী কেন একত্র হয়েছি! এর একটাই কারণ, আমরা ভালো নেই। আমাদের এই ভালো না থাকা বেপারগুলোকে সহভাগীতার জন্য একত্র হওয়া। আমরা চাই, আমাদের সমসাময়িক যেসকল আদিবাসী তরুণরা শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়াশুনা করছি তারা যেন পড়ালেখার পাশাপাশি আমাদের শেকরের প্রতি দায় নিয়ে কাজ করতে পারি। সেই লক্ষ্যেই আমাদের এই আয়োজন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ডাকসু সদস্য যোশীয় সাংমা চিবল বলেন, ঢাবির ক্যাম্পাসে প্রথমেই আমার পরিচয় আমি একজন আদিবাসী। বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও আমরা লড়ে যাচ্ছি আমাদের অধিকারের দাবীতে। এই অধিকারের প্রশ্নে আমাদেরকে এভাবেই প্রথমে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তিনি আদিবাসী অধিকারের প্রশ্নে ডাকসুর সদস্য হিসাবে তার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার কথা ব্যক্ত করেন।

আদিবাসী অধিকার কর্মী কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমা স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার সময়কার আমরা প্রত্যন্ত আদিবাসী অঞ্চলে শীতবস্ত্র বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। এ উদ্যোগ আমাদের অনুজরা এখনও চালু রেখেছে। এই ভালো কাজগুলো এখনো আদিবাসী শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পরিসরের বাইরে চলমান রয়েছে কেননা আমরা আমাদের শেকড়ের প্রতি দায়বোধ এখনো রাখি। তিনি এই ধরণের মিলনমেলা আয়োজনের উদ্যোগকে প্রশংসা করেন এবং এই ধরণের সংহতি, ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে আগামীতে আদিবাসীর জীবন আলোর মুখ দেখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষাথী অমর শান্তি চাকমা মিলনমেলায় উপস্থিত সকল শিক্ষার্থীকে ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, এই মিলনমেলায় বিভিন্ন আয়োজনে (ফুটবল, ক্রিকেট, রশি টানাটানি) কেউই হারেনি কেউই জিতেনি কেবল জিতেছে আমাদের আদিবাসী শিক্ষার্থীদের মধ্যেকার ভ্রাতৃত্ব,সংহতি ও ঐক্য। এই ঐক্য বিনির্মাণের জন্য এ ধরণের উদ্যোগের বিকল্প নেই।আগামী আবারো বৃহৎ পরিসরে এই মিলনমেলা আয়োজনের আমাবাদ পুনর্ব্যক্ত করেন ঢাবির সিনিয়র এই শিক্ষার্থী।
ঢাবির মেধাবী মুখ রিবেং দেওয়ানের পরিচালনায় এই ঐতিহাসিক মিলনমেলা উক্ত আলোচনা সভাটির মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়। এবারের মিলনমেলার মূল সুর নির্ধারণ করা হয়েছিল ”এসো মিলি প্রাণে প্রাণে, ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে।”

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *