সোশ্যাল মিডিয়া আইপিনিউজ-

সুরে সুরে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের চিত্র আঁকে পাহাড়ের প্লুং ব্যান্ডঃ

বিশেষ প্রতিবেদনঃ “রাষ্ট্র আমার ঘর পুড়েছ/ ভিটে মাটি কেড়ে নিয়েছ/ আমার বাবার শশ্মান খোলায়/বানিয়েছ তুমি পর্যটন/ উন্নয়নের নামে চলে/ আমার পাহাড়ে আগ্রাসন” এইসব কথা সুরে সুরে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয় প্লুং ব্যান্ড। প্লুং- পাহাড়ের ম্রো আদিবাসীদের একটি বিশেষ বাদ্যযন্ত্র। বাঁশের তৈরী এই বাদ্যযন্ত্রের সুরকে পাহাড়ের প্রতিরোধের প্রতীক হিসাবে ধারণ করে এই নামে ব্যান্ড’এর নামকরণ করেছেন পাহাড়ের কিছু তরুণ। ‘পাহাড় আগ্রাসন’ নামের তাঁদের একটি গানে ফুটে উঠেছে পাহাড়ে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের করুণ চিত্র। তরুণ এই ব্যান্ডটির গানে পাহাড়ী নারী তুমাসিং মারমা ধর্ষণের পশ্চাতে প্রজন্মের ক্ষোভ যেমন উপস্থিত তেমনি উন্নয়নের নামে চলা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী দ্রোহের সুরও রক্তে নাচন ধরিয়ে দেয় তারুণ্যকে। ‘ভাঙুক শৃংখল, মুক্ত করি মানবতা’ স্লোগানে চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত পাহাড়ের জুম্ম তরুণদের এই ব্যান্ডটির যাত্রা শুরু ২০১৮ সালে।

“ভাঙুক শৃঙ্খল, মুক্ত করি মানবতা”- যা প্লুং ব্যান্ডের মূল স্লোগান।।

প্রতিষ্ঠার সূচনা থেকেই আজ পর্যন্ত এই ব্যান্ডটির সদস্য হয়েছেন ৭ জন। তাঁদের মধ্যে ব্যান্ডটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মিলন চাকমা গিটারিস্ট হিসাবে আছেন। এছাড়াও প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে রয়েছেন এনথিল চাকমা (মেইল ভোকাল), জয়ন্তী চাকমা প্রিয়াংকা (ফিমেল ভোকাল), ইমন তালুকদার (বেইজ গিটারিস্ট), অরিত্র দেওয়ান (লিড গিটারিস্ট), মিল্টন পাংখোয়া (কাহনিস্ট)। অতি সম্প্রতি এই ব্যান্ডে গিটারিস্ট হিসাবে যুক্ত হয়েছেন কনিস্ক চাকমা এবং ড্রামার হিসাবে নৈশ দেওয়ানের পথ চলা শুরু হয়।

এই ব্যান্ডটি’র পথচলা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে আইপিনিউজকে ব্যান্ডটি’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মিলন চাকমা বলেন, আমাদের ব্যান্ডের অধিকাংশ সদস্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইউএসটিসি এবং চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশুনা শেষ করা সাবেক শিক্ষার্থী। এর মধ্যে অনেকেই এখনও পড়ছেন। স্বভাবতই ছাত্রজীবনে নানা প্রান্তে বহু তরুণের সাথে আমাদের দেখা হয়। এমনি সময়ে তরুণদের ভাবনাগুলোর সম্মিলন ঘটে নতুন কিছু সৃষ্টির তাড়না নিয়ে। পাহাড়ে যে নিপীড়ন আমরা প্রত্যক্ষ করি তা একজন তরুণ হিসাবে নিশ্চয় আমরা অস্বীকার করতে পারি না। এই নিপীড়ন এবং বঞ্চনা থেকে মুক্তির জন্য আমাদের লড়াই দরকার। সে লড়াইটা কেবল রাজপথের মিছিলে নয়। আমরা মনে করি সংস্কৃতিও অন্যতম মাধ্যম। গান ও সুর এক ধরণের শক্তিশালী অস্ত্র। যার মাধ্যমে আমরা নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারি, মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারি। এই ভাবনা থেকেই এই ব্যান্ডটির প্রতিষ্ঠা।

২০১৮ সাল থেকে প্রতিষ্ঠার পর বিশেষ করে চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক বিভিন্ন আদিবাসী বিষয়ক অনুষ্ঠানগুলোতে গানে গানে দ্রোহের সুর ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ‘প্ল্যং ব্যান্ড’ এর ডাক পড়ে। আর গানে গানে নিপীড়নের চিত্রগুলো উপস্থাপনের কাজটি আজ অবধি করে যাচ্ছে এই ব্যান্ডটি। পাহাড় আগ্রাসন, চেতনায় লারমা, জুম-পাহাড়, আঁধার শেষে, পরাধীনতা, বাঁশির শিঙায় টান দিয়েছে জুমের তরুণ- শিরোনামে প্লুং ব্যান্ডের অনেক গান ইতিমধ্যেই সাড়া জাগিয়েছে পাহাড়ের তরুণদের মধ্যে।

এদিকে আইপিনিউজ এর সাথে একান্ত মুঠোআলাপে ব্যান্ডটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মিলন চাকমা আরো বলেন, আমরা যে ধাচের গান করি বা যে বারতা সমাজে ছড়িয়ে দিতে চাই তার মধ্যেই নানা চ্যালেঞ্জ। পাহাড়ে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন তো আছেই। আর সেই নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলা, সুর রচনা করা কিন্তু খুব একটা সোজা নয়। আর এই ধাচের গান করে শিল্পী হিসাবে টিকে থাকাও কঠিন।

তিনি আরো বলেন, প্রত্যেকটি গান যখন অফিসিয়ালি রিলিজ হয়, তখন আমরা বুঝি এর পেছনে কত সময়, শ্রম, মেধা বিনিয়োগ করতে হয়। আর শিল্পকে সমাজে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য অর্থের দিকটাও অনেক জরুরী। কেননা, আমরা এই গান করে যে আর্নিং করবো তা তো অনেক দূরের বেপার বরং নতুন কিছু সৃষ্টিতে যে অর্থের প্রয়োজন তাও যোগাড় করতে পারি না। কাজেই এটাও আমাদের ক্ষেত্রে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।
তারপরও পাহাড় তথা সমাজে এবং সর্বোপূরী পৃথিবীতে কোথাও যেন নিপীড়ন, বৈষম্য ও বঞ্চনা না থাকে তার জন্য প্লুং ব্যান্ড প্রতিবাদের ভাষা ও সুর হয়ে গর্জে উঠবে বলে আশা প্রকাশ করেন ব্যান্ডটির এই সদস্য। একটি বৈষম্যহীন পাহাড় তথা পাহাড়ের তরুণ হিসাবে নিপীড়নহীন জীবন প্রত্যাশা করেন তিনি। অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র তথা নিপীড়নমুক্ত পৃথিবী গড়তে এই ব্যান্ডটি কাজ চালিয়ে যাবে বলেও প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন ব্যান্ডটি’র এই শিল্পী। তবে এই ব্যান্ড এর পথচলায় প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক ভাবনার চিন্তাশীল ব্যক্তি, বিভিন্ন সংগঠন এবং সর্বোপূরী আপামর স্রোতাকে বরাবরের মতই পাশে থাকার আহ্বানও জানান এই শিল্পী।

শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত

Leave a Comment

Your email address will not be published.

আইপিনিউজের সকল তথ্য পেতে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন