সোশ্যাল মিডিয়া আইপিনিউজ-

সবিন চন্দ্র মুন্ডার মৃত্যু নেই: পাভেল পার্থ

২০০৯ সনের বর্ষণমুখর জুলাই। চাপাইনবাবগঞ্জ গোমস্তাপুরের জিনারপুর গ্রামের ধারে লালপতাকা হাতে অপেক্ষারত কিছু আদিবাসী নারী-পুরুষ। সাঁওতালি মাদল বাজিয়ে শুরু হলো ছোট্ট মিছিল। ভূমি অধিকারের দাবিতে এমনতর বহু মিছিল যুক্ত হলো ৩২ কিলোমিটারের দীর্ঘ গণপদযাত্রায়। এক বছরের ছোট্ট শিশু কোলে সেই মিছিলে বিচিত্রা তির্কীও হেঁটেছিলেন নির্ভীক। আলোচিত এই গণপদযাত্রার সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন নওগার মহাদেবপুরের সবিন চন্দ্র মুন্ডা। সবিন চন্দ্র মুন্ডাদের মতো মাঠেময়দানের এমন অদম্য নেতৃত্বই গত ২৯ বছর ধরে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের বহু সৃজনশীল আন্দোলন কর্মসূচি সফল করে তুলেছেন। কেবল বরেন্দ্রভূমি নয়, সবিন চন্দ্র মুন্ডা প্রাণের টানে ছুটে গেছেন শ্রীমঙ্গলের নাহার খাসিপুঞ্জিতে কিংবা সুন্দরবনের মুন্ডা গ্রামে। মিছিলে মিটিংয়ে দীপ্ত করেছেন ঢাকার রাজপথ। ছুটে গেছেন পাহাড় কী সমুদ্র উপকূলের নিপীড়িত জনপদে। সংহতি জানিয়েছেন দেশের গণআন্দোলনে, হয়ে ওঠেছেন গণমানুষের এক বিশ্রামহীন নেতা। করোনা মহামারিতে গ্রামের পর গ্রাম সংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু নিদারুণভাবে ২০২২ সনের ৫ ফেব্রুয়ারি দুম করেই চলে গেলেন সবিন চন্দ্র মুন্ডা। এমনিতে কোনো ফুসরত ছিল না, সবেমাত্র শেষ করেছেন বাৎসরিক বিশাল আলোজনের ‘জাতীয় মুন্ডা সম্মেলন’। মৃত্যুর দিন বিকেলেও বাজার সেরে মহাদেবপুরের একটা চা দোকানে বসে শুনছিলেন গ্রামের মানুষের নানা সমস্যা সংকট। হঠাৎ মূর্চ্ছা যান, মহাদেবপুর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। জাতীয় আদিবাসী পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারন সম্পাদক সবিন চন্দ্র মুন্ডা যুক্ত ছিলেন বহু সামাজিক, সাংষ্কৃতিক সংগঠন ও জনআন্দোলনের সাথে। তার কোনো তির-ধনুক ছিল না, ছিল না উচ্চশিক্ষা বা অর্থকড়ির লেবাস। ঘন্টার পর ঘন্টা পায়ে হেঁটে তিনি গ্রামের পর গ্রাম জনসংযোগ করতে পারতেন, একটা কানাকড়ি হাতে না থাকলেও সহস্র জনের আয়োজন করার সহাস করতেন, তার ডাকে মুহুর্তেই কোনো জমায়েত রূপ নিত মুগ্ধ মিছিলে। প্রান্তজনের মাঝে পরিচিত হলেও সবিন মুন্ডা ছিলেন মিডিয়াবিমুখ এক অর্ন্তমুখী মানুষ। ২০০৫ সনে রাজশাহীর ভুবনমোহন পার্কে আদিবাসী পরিষদের একটি অনুষ্ঠানে তার সাথে আমার প্রথম পরিচয়। এমন বিস্ময়কর নেতাকে জানাবোঝার জন্য সতের বছর খুব কম সময়। গ্রাম থেকে জংগল, সেমিনার থেকে মিছিল, পাহাড় থেকে রাজপথ সবিন চন্দ্র মুন্ডার সাথে থাকার বিরল অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। দিনে দিনে হয়ে ওঠেছিলেন আমাদের পরিবারের একজন ঘনিষ্ঠজন। সবিনদার অকালপ্রয়াণে চলতি লেখাটি এক ব্যক্তিগত স্মৃতিকথন, সবিনের চিন্তাদর্শন-রাজনীতি এবং জীবনবোধ মূল্যায়ণে এই কথন হয়তো খুব জরুরি নয়। মাঠেময়দানে জেগে থাকা গণমানুষের স্মৃতির ভেতর দিয়েই কেবল সবিনের সমগ্রতাকে আন্দাজ করা যেতে পারে। আশা করি নতুন প্রজন্ম সবিন চন্দ্র মুন্ডার দর্শন ও কাজ পাঠ করবে, বিকশিত করবে তার জীবনবোধের কীর্তি।

কাঁদছে বৃন্দাবনপুর-কালনা গ্রাম

বাংলাদেশে যেসব অঞ্চলে প্রাচীন বসতি গুলো গড়ে ওঠেছিল বরেন্দ্রভূমির নওগাঁ তার অন্যতম। নওগাঁর মহাদেবপুর একসময় মুন্ডা, সাঁওতাল, ওঁরাও, পাহাড়িয়া, রবিদাস অধ্যুষিত অঞ্চল ছিল। এখানেই ভীমপুর গ্রামে ভূমিআন্দোলনে শহীদ হন আলফ্রেড সরেন। ভীমপুরের মতোই আরেক আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রাম এনায়েতপুর ইউনিয়নের বৃন্দাবনপুর-কালনা। এ গ্রামেই ১৯৫৮ সনের পয়লা মে এক মুন্ডা কৃষক পরিবারে জন্ম নেন সবিন চন্দ্র মুন্ডা। মায়ের নাম লগ্নী মুন্ডা ও বাবার নাম কৃষ্ণপদ মুন্ডা। এক বোন ও ৪ ভাইয়ের ভেতর সবিন দ্বিতীয়। শিশু বয়স থেকেই মুন্ডা লোককৃত্য আয়োজনের চেয়ে সবিনকে বেশি টানতো কোনো অনাচারকে প্রশ্ন করা। কৈশোরে এক মহাজন একবার কয়েক কৃষকের পাকাধানের বোঝা রাস্তা থেকে নিচে ফেলে দিয়েছিল, সবিন তার প্রতিবাদ জানান। কালনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পাশের পর উচ্চ মাধ্যমিক পড়েছেন মহিষবাথান উচ্চ বিদ্যালয়ে। নিরক্ষর মুন্ডা শিশুদের ঘরে ঘরে গিয়ে স্বেচ্ছায় পড়িয়েছেন। পরিবারের কৃষিকাজে যুক্ত থেকেছেন সমানতালে। মালতী মুন্ডার সাথে বিয়ে হয়। নি:সন্তান এ দম্পতির কাছে সকল বঞ্চিত শিশুই ছিল নিজের সন্তান। গ্রামে ফেরার সময় কোনো না কোনো শিশুর জন্য কিছু একটা নিয়ে যেতেন। জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সাথে যুক্ত হওয়ার ভেতর দিয়ে নিজের নেতৃত্ব বিকাশ ও সর্বজনের জন্য অধিকার আন্দোলন সমন্বয়ের একটা ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন। গ্রামের মানুষের বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, ভিজিডি প্রাপ্তিতে সহায়তা কিংবা কোনো দুর্যোগে খাদ্য বা শীতার্ত মানুষকে কম্বল সহযোগিতা সবকাজেই যুক্ত থেকেছেন জীবনভর। সবিন চন্দ্র মুন্ডার অকালপ্রয়াণে আজ কাঁদছে গ্রাম, বিষন্ন হয়ে আছে চারপাশ।

জাগকে উঠক মুন্ডা

দক্ষিণ এশিয়ার এক বৃহৎ আদিবাসী জাতি মুন্ডা। বাংলাদেশে উত্তরাঞ্চল, সুন্দরবন, সিলেটের চাবাগান, গাজীপুর, ঢাকা, সিরাজগঞ্জ, পাবনা প্রায় অনেক অঞ্চলেই মুন্ডারা আছেন। কোথাও ‘বনুয়া’, কোথাও ‘বুনো’, কোথাও ‘মুন্ডারি’, ‘কোথাও মুরারি’ কোথাওবা মুন্ডা নামেই। বৃহত্তর উত্তরাঞ্চলে মুন্ডারা নামের পর সাধারনত পাহান, মুরারী পদবী ব্যবহার করলেও সবিন চন্দ্র ‘মুন্ডা’ ব্যবহার করেছেন। সবিন দা বলেছিলেন, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন এ বিষয়ে তাকে অনুপ্রাণিত করেন এবং আত্মপরিচয় রাজনীতির দীক্ষা দেন। মুন্ডারী ভাষা অস্ট্রো-এশিয়াটিক পরিবারের এক প্রাচীন ভাষা হলেও দেশে মুন্ডাদের ভেতর আদি মুন্ডারী ভাষী খুব কম আছেন এবং মুন্ডারা সাদ্রী ভাষাই ব্যবহার করছেন। সবিন চন্দ্র মুন্ডা মুন্ডারী ভাষা সুরক্ষা ও প্রচলনের জন্য কাজ শুরু করেছিলেন। চাবাগান, উত্তরাঞ্চল, সুন্দরবন নানা এলাকায় গিয়েছেন। দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা মুন্ডাদের একত্র করতে ২০১১ সনে শুরু করেছিলেন ‘জাতীয় মুন্ডা সম্মেলন’। আরেক সহযোদ্ধা নরেন পাহানকে নিয়ে সফলভাবে আয়োজন করেছেন ১১টি সম্মেলন। দেশের নানাপ্রান্ত থেকে শত সহস্র মুন্ডা ছেলে-মেয়েরা অংশ নিয়েছে এই সম্মেলনে। তিনদিনব্যাপি এই আবাসিক সম্মেলনের স্থান সবসময়ই হয়েছে কোনো পাবলিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সরকারিকেন্দ্র। এত মানুষের খাবারদাবার, থাকার জায়গাসহ বিশাল এই সম্মেলনগুলো আয়োজনে ছিল না কোনো করপোরেট স্পনশরশিপ, বেসরকারি সংস্থার অনুদান বা বাণিজ্যিক চাঁদা। মূলত নিজ জনগোষ্ঠীর ভেতর মুষ্টিচাল সংগ্রহ করে এবং গণচাঁদার মাধ্যমেই এই বিস্ময়কর আয়োজন গুলি সফল হয়েছে। কীভাবে জনগোষ্ঠীকে সফলভাবে সম্পৃক্ত করে স্বল্পব্যয়ে গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন সম্ভব সমকালে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ জাতীয় মুন্ডা সম্মেলন। এই সম্মেলন মুন্ডা তরুণ ছেলে-মেয়েদের আত্মপরিচয় বিকাশ এবং আত্মবিশ্বাস বাড়াতে প্রবল রসদ জুগিয়েছে। এই সম্মেলনে অংশ নেয়া দেশের নানাপ্রান্তের মুন্ডা ছেলে-মেয়েরা আজ তাদের শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করেছে, বিভিন্ন চাকরি ও উদ্যোক্তা হয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছে। সবিন চন্দ্র মুন্ডা এই সম্মেলনের মাধ্যমে মুন্ডা সমাজের নতুনভাবে জেগে ওঠার স্বপ্নই দেখেছিলেন। তাই বৃহত্তরভাবে এই সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার নাম হয়েছিল, জাগকে উঠক মুন্ডা (জেগে ওঠুক মুন্ডা জনগণ)।

বিরসা মুন্ডার উত্তরাধিকার

ব্রিটিশ উপনিবেশর বিরুদ্ধে অরণ্যের অধিকারের দাবিতে সংগঠিত হয়েছিল ঐতিহাসিক ‘উলগুলান বা মুন্ডা বিদ্রোহ’। ১৯০০ সনে এই আন্দোলনে শহীদ হন বিরসা মুন্ডা। সবিন চন্দ্র মুন্ডা বিরসা মুন্ডাকে নিয়ে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের মাধ্যমে প্রথম পাবলিক অনুষ্ঠান আয়োজন করেন বাংলাদেশে। বিরসা মুন্ডার কাহিনি সবিনের চোখ সবসময় উজ্জ্বল করে দিত। শিরায় শিরায় বয়ে যেত ধনুকের ছিলার টান। একবার আমরা আলতাদীঘি শালবনে গিয়েছিলাম। শালবনের আদিবাসিন্দা আদিবাসীরা কিভাবে অরণ্যহারা হয়েছেন সেসব শুনে প্রতিবাদী হয়েছিলেন সবিন মুন্ডা। যুক্ত হয়েছিলেন মধুপুর শালবনের ইকোপার্ক বিরোধী আন্দোলনে, সামিল ছিলেন সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি আন্দোলনের সাথে। নওগার নাটশাল মাঠে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ প্রতি বছর জাতীয় পরিসরে সূচনা করেছিল কারাম উৎসবের। সবিন মুন্ডা সেই কারাম উৎসব আয়োজনের একজন নিরলস কারিগর। তখন হবিগঞ্জের চান্দপুর-বেগমখান চাবাগানে আন্দোলন চলছে। প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিকল্পনা থেকে জমি বাঁচাতে মরিয়া চাশ্রমিকেরা। সবিন মুন্ডা খুব জোরে চিৎকার দিতে পারতেন না, কিন্তু তাও গলার রগ কাঁপিয়ে বলেছিলেন ‘আমার মাটি আমার মা কাইড়া নিতে দিব না’। পাহাড়ের রাজনীতিক শক্তিপদ ত্রিপুরা ও আদিবাসী ফোরামের নেতা এন্ড্রু সলোমারসহ একবার আমরা শ্রীমঙ্গলের নাহার কানিপুঞ্জিতে দুইদিন ছিলাম। চাবাগান কর্তৃপক্ষ নাহার খাসিপুঞ্জির প্রবীণ সব গাছ কেটে ফেলেছিল। পুঞ্জিবাসীকে উচ্ছেদ করতে চেয়েছিল। সরেজমিন পরিদর্শনের পর আমরা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সাথে অভিজ্ঞতা বিনিময় করেছিলাম। সবিন মুন্ডা সেখানে বলেছিলেন, ’…আমরা আদিবাসী মানুষেরা গাছপালা বনভূমি ধ্বংস করিনা, আমরা এসব রক্ষা করি, কারণ বন ছাড়া আদিবাসীরা বাঁচতে পারে না, আমাদের রক্তে বনের গন্ধ আছে।’

গড়লাগি সবিন মুন্ডা

সবিনদার খাদ্যভ্যাস নিয়ে আমরা মজা করতাম। তিনি মাংশ খেতেন না। ছিলেন স্বল্পাহারী। সবিনদার কোনো দুরারোগ্য রোগব্যাধি ছিল কীনা আমরা জানতে পারিনি। কারণ তিনি নিজের কোনো সমস্যা কাউকে বলতে চাইতেন না। মৃত্যুর পর শোনা যায় তার মাঝেমধ্যেই বুকে ব্যথা হতো। নিজের বুকে ব্যথা নিয়ে অন্যের ব্যথা লাঘবে সোচ্চার মানুষটি আজ চলে গেলেন। কোনো অর্থকড়ি সঞ্চয় করেননি জীবনে। রাষ্ট্রীয়ভাবে যখন ছয়টি আদিবাসী মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের কাজ শুরু হয় তখন তার সাদ্রী ভাষাও ছিল। কিন্তু সবিনদার মন ছিল খারাপ। কারণ অলচিকি, বাংলা না পরিবর্তিত রোমান এই তর্কে সাঁওতালি ভাষার বই প্রকাশ হচ্ছে না। সকল মাতৃভাষার মর্যাদা ও স্বীকৃতির দাবিতে সোচ্চার ছিলেন তিনি। সবিনদার কাছ থেকেই শিখেছি, মুন্ডারা শুভেচ্ছা অভিবাদন জানাতে ‘গড়লাগি’ শব্দটি ব্যবহার করে। সবিন চন্দ্র মুন্ডা আজকের নতুন প্রজন্মের জন্য অবশ্য পাঠ্য হওয়া জরুরি। তার নামে কোনো একটি পাঠাগার বা সড়ক নির্মিত হোক। সবিন মুন্ডা জেগে থাকবেন তার নিজ দর্শন ও কর্মের অবারিত বলয়ের স্পর্ধায়।

লেখক ও গবেষক। ই-মেইল: [email protected]

শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত

Leave a Comment

Your email address will not be published.

আইপিনিউজের সকল তথ্য পেতে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন