সোশ্যাল মিডিয়া আইপিনিউজ-

পাহাড়ে আদিবাসীরা ক্রমশ সংখ্যালঘুতে পরিণত হচ্ছে: রাঙ্গামাটিতে মহিলা সমিতি ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের আলোচনা সভায় শিশির চাকমা

আইপিনিউজ ডেক্স(ঢাকা): পাহাড়ে আদিবাসীরা ক্রমশ সংখ্যালঘুতে পরিণত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন পাহাড়ের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ শিশির চাকমা। আজ ৩ আগস্ট ২০২২ ইং তারিখে আসন্ন ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষ্যে ” ঐতিহ্যগত বিদ্যা সংরক্ষণ ও বিকাশে নারী সমাজের ভূমিকা” স্লোগানে পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের যৌথ উদ্যোগে রাঙ্গামাটির জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এই মন্তব্য করেন।

আলোচনা সভায় হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শান্তিদেবী তঞ্চঙ্গ্যার সঞ্চালনায় এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি রাঙ্গামাটি জেলার সভাপতি রিতা চাকমার সভাপতিত্বে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষক ও সাহিত্যিক শিশির চাকমা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য সাধুরাম ত্রিপুরা, হেডম্যান নেটওয়ার্কের সহ—সভাপতি অ্যাডভোকেট ভবতোষ দেওয়ান, উইমেন্স রিসোর্স নেটওয়ার্কে সদস্য নুকু চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম যুব সমিতি, রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সহ—সাংগঠনিক সম্পাদক সাগর ত্রিপুরা নান্টু এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক জগদীশ চাকমা প্রমুখ। উক্ত আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক ম্রানুচিং মারমা এবং বিবৃতি পাঠ করেন হীরা চাকমা।

অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক শিশির চাকমা বলেন, আমরা জানি পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীদের জীবন—জীবিকা হচ্ছে জুম নির্ভর। জুম নির্ভর পাহাড় ও বনকে ঘিরেই আমাদের জীবন—জীবিকা। এই জীবন—জীবিকা আমরা বিভিন্নভাবে উদযাপন করে থাকি। আবহমান কাল থেকে আমাদের পুরুষ এবং নারী বিশেষ করে জুমিয়া পরিবারে বৈষম্য ও নিপীড়নের চিত্র আমরা তেমন দেখতে পাই না। জুম্ম সমাজের মধ্যে নারীরাই সবচেয়ে বেশি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। তারাই আমাদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। একটা জাতির অহংকার, একটা জাতির গর্বের বিষয় তার সংস্কৃতি, তার পোশাক। এ দিকটি নারীরা গর্বের সাথে টিকিয়ে রেখেছে, অথচ পুরুষরা সেটা করতে পারিনি। তাই তাদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও সম্মান বোধ থাকা বাঞ্চনীয়।

রাঙ্গামাটিতে আয়োজিত আলোচনা সভায় অতিথিবৃন্দ। ছবি- বিনয় ত্রিপুরা। শিল্পকলা একাডেমী মিলনায়তন, রাঙ্গামাটি।

তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে শুধু নয়, সমতলে যে আদিবাসীরা রয়েছেন তাদের মধ্যেও যে ঐতিহ্যগতভাবে আদিবাসীদের ধ্যান জ্ঞানগুলো আমরা ধারণ করি, যে মূল্যবোধগুলো ধারণ করি সে মূল্যবোধগুলো অত্যন্ত সমৃদ্ধ, শক্তিশালী। এখান থেকে আমরা বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা পাই। কিন্তু আজকে এই জ্ঞানগুলো কর্পোরেট সংস্থা দ্বারা ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে। আমরা যে রাষ্ট্রের অধীনে থাকি। এ রাষ্ট্রই আমাদের পাশে দাঁড়ায় না। আজকে আমরা দেশের নেতৃবৃন্দদের কাছে বলতে শুনি আদিবাসীদের আমরা রক্ষা করছি। তাদের সংস্কৃতি রক্ষা করছি। তাদের উন্নয়ন করছি। প্রতিনিয়ত একথাগুলো বলা হচ্ছে। কিন্তু সে উন্নয়নের ফল আমরা কি পাচ্ছি?

বিশিষ্ট লেখক ও সাহিত্যিক শিশির চাকমা আরো বলেন, আজকে আমাদের আত্মপরিচয়ের সংকটের কথা বলি। আমাদের প্রথমে বলা হল উপজাতি, এরপর বলা হয় ক্ষুদ্র নৃ—গোষ্ঠী। কত অভিধায় যে আমাদের বিশেষণে বিশেষিত করছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। কদিন আগে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছে আদিবাসী শব্দটি যাতে ব্যবহার না করে। কি লজ্জাকর ব্যাপার। এবার যে জনশুমারি হলো এ জনশুমারিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলের আদিবাসীদের যে জনসংখ্যা দেখানো হয়েছে। যে জনসংখ্যার চিত্র আমরা দেখলাম এটাও প্রশ্নবিদ্ধ। জনশুমারিতে আদিবাসীদের সংখ্যাটা কম করে দেখানো হয়েছে। এর আগে যে জনশুমারি হয়েছে সেখানেও কম করে দেখানো হয়েছে। আজকে তিন পার্বত্য জেলা জনসংখ্যা প্রায় সমান—সমান। আমরা ক্রমান্বয়ে সংখ্যালঘুতে পরিণত হচ্ছি। আমাদেরকে সংখ্যালঘুতে পরিণত করা হচ্ছে। এটা কিন্তু ষড়যন্ত্রের অংশ। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দুদশক হয়েছে, বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সরকার প্রচার করছে উন্নয়ন হচ্ছে। পার্বত্য চুক্তিতে স্পষ্টই আছে আঞ্চলিক পরিষদকে অবহিত না করে, সম্মতি না নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়ন হতে পারে না। আঞ্চলিক পরিষদকে আজকে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। কোন প্রবিধান হয় নাই।

তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি কেবল জনসংহতি সমিতি করে নাই। এটা জনগণের দলিল। জনগণের সমর্থনে জনসংহতি সমিতি। পার্বত্য চট্টগ্রামে জনসংহতি সমিতির যে আন্দোলন তাকে অস্বীকার করা যাবে না। বাংলাদেশ হচ্ছে বহুত্ববাদের দেশ। এটা তারা বলে থাকে। একটা কথা তারা খুব বড় করে, চিৎকার করে বলে, প্রচার করে ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। রাষ্ট্র তো সবার না। এই সংবিধান বঙ্গবন্ধুর সংবিধান নয়, এটা প্রথম পঁচাত্তর আগ পর্যন্ত সংবিধান, এই রাষ্ট্রের সংবিধান নয়। সংবিধান বহুবার কাটা ছেঁড়া করা হয়েছে কিন্তু আদিবাসীদের সুরক্ষার জন্য একটি লাইন লেখা স্বদিচ্ছা নাই। এবার দেখুন আমাদের কি করতে হবে।

আলোচনায় সভায় অংশগ্রহনকারী বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। স্থান- শিল্পকলা একাডেমী মিলনায়তন, রাঙ্গামাটি।

শিশির চাকমা আরো বলেন, আমরা সংখ্যায় কম হতে পারি, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী হতে পারি। কিন্তু অধিকারের প্রশ্নে, জীবন—জীবিকার প্রশ্নে, বেঁচে থাকার প্রশ্নে তারা সংগ্রাম করছে, করবে। এমন একটা সময় আসবে এই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হবে। সরকার কোন অবস্থাতে এড়িয়ে যেতে পারবে না। নানা বিভাজন করে, বিভিন্ন সশস্ত্র দল গঠন করা হচ্ছে এগুলো দৃশ্যমান। যারা এসব গঠন করে দিচ্ছে কয়েকদিন পর পর দৃশ্যমান হচ্ছে। এসব নীলনক্সাগুলো কেন করা হচ্ছে। এগুলো বেড়িয়ে আসছে, এগুলো কি করে ঢেকে রাখবেন? সুতরা বিভাজন করে, কর্তৃত্ববাদ দিয়ে, নিষ্পেষণ করে, অত্যাচার করে আদিবাসী জুম্ম মানুষের অধিকার খর্ব করতে পারবেন না।

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য সাধুরাম ত্রিপুরা বলেন, রাষ্ট্র পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন নীতি অনুসরণ করছে সেটা আমাদের সবার কাছে স্পষ্ট। বাংলাদেশে কোন স্থানে, কি অবস্থায় আদিবাসীরা বসবাস করছে সেটা আন্তর্জাতিক মহল জানে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে সবাইকে অগ্রণী ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে বিশিষ্ট আইনজীবি ও সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্কের সহ—সভাপতি ভবতোষ দেওয়ান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন না হলে কোন অধিকারই অর্জন হবে না।
উইমেন্স রির্সোস নেটওয়ার্কের সদস্য নুকু চাকমা বলেন, খাদ্য সংরক্ষণসহ ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি বিকাশে আদিবাসী নারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অপরিসীম।
পার্বত্য চট্টগ্রাম যুব সমিতি রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সহ—সাংগঠনিক সম্পাদক সাগর ত্রিপুরা বলেন, সন্ত্রাসী তকমা দিয়ে জুম্মদের উপর নির্যাতন, নিপীড়ন চলছে। জেল—জুলুমের ভয় দেখিয়ে জুম্মদের দমিয়ে রাখা যাবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য চুক্তি বাস্তবায়নের কোন বিকল্প নাই। উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের আগ্রাসনে আদিবাসীদের জীবন—জীবিকা আজ নিষ্পেষিত। পার্বত্য চট্টগ্রামে যে কোন অনাকাঙ্খিত পরিণতির জন্য সরকারই দায়ী থাকবে।
অনুষ্ঠানে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক জগদীশ চাকমা বলেন, যারা আদিবাসী বিরোধী পরিপত্র জারি করেছে, তারাই সংবিধান পরিপন্থী কাজ করেছে। সংবিধান লঙ্ঘন করেছে। এটা সংবিধান প্রদত্ত বাক্ স্বাধীনতাও হরণ বলেও মনে করেন এই ছাত্রনেতা।

শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত

Leave a Comment

Your email address will not be published.

আইপিনিউজের সকল তথ্য পেতে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন