জাতীয়

পাহাড়ের আদিবাসীদের উৎসবগুলোতে এক ধরণের অভিন্ন সুর ও মানবিক আবেদন রয়েছে: ঢাবি উপাচার্য ড. মো: আখতারুজ্জমান।

আইপিনিউজ ডেক্স(ঢাকা): ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বারের মত ফুল ভাসানো অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্য দিয়ে আজ মঙ্গলবার আয়োজিত হল বিজু-বৈসু-সাংগ্রাই-বিষু- চাংক্রান উৎসব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুম সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদ এর উদ্যোগে আয়োজিত এই ফুল ভাসানো অনুষ্ঠান, বর্ণাঢ্য র‌্যালী ও সমাবেশের উদ্ধোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো: আখতারুজ্জামান। এছাড়াও অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মিহির লাল সাহা, ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল, নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরিণ, বাংলদেশ আদিবাসী ফোরামের সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিরণ মিত্র চাকমা ও বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী জান্নাত-এ-ফেরদৌসী প্রমুখ।

ফুল ভাসানো অনুষ্ঠান , বর্ণাঢ্য র‌্যালী ও সমাবেশের উদ্ধোধন করছেন ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান।
উক্ত আয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শতাধিক পাহাড়ী শিক্ষার্থীরাসহ ঢাকা শহরে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যরত জুম্ম শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অনেকেই অংশগ্রহন করেন।
আয়োজনটি উদ্ধোধন করে ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো: আখতারুজ্জামান বলেন, বিজু-বৈসু-সাংগ্রাই-বিষু-চাংক্রান এর উৎসব সমূহের একটি গভীর তাৎপর্য রয়েছে। এই উৎসবের তাৎপর্য এটিই যে চৈত্র্য মাসের শেষ দুই দিন এবং নববর্ষের প্রথমদিন পাহাড়ের আদিবাসীরা একটি বিশেষ মুহূর্ত উৎযাপন করবে। এই উৎযাপনের মধ্য দিয়ে তারা ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ গড়ে তুলে নিজেদের মধ্যে। তার মধ্যে অনেকগুলো জনগোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত আছে। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা, অহমিয়া এ ধরণের অনেকগুলো আদিবাসী জনগোষ্ঠী এই উৎসব উৎযাপন করে। এর মধ্য দিয়ে তারা মানুষের মধ্যে আন্ত:সম্পর্ক স্থাপন করে।
ঢাবি উপাচার্য আরো বলেন, আদিবাসীদের এই উৎসবের সাথে ইসলাম ধর্ম এবং হিন্দু ধর্মের পূজা-পার্বনের এক ধরণের মিল পাওয়া যায়। মিল রয়েছে এই অর্থে যে, বিজুর যে তিনটি দিন তার মধ্যে প্রথম দিন হল ফুল বিজু। এই দিনে তারা ফুল দিয়ে আরাধনা করে, ঘর সাজাই এবং নিজেদেরকে সাজাই। ফুলের পবিত্রতায় নিজেদেরকে গড়ে তোলার জন্য এক ধরণের প্রত্যয় ব্যক্ত করে। এটি একটি অসাধারণ পরিবেশনা। সুস্থ ও সুন্দরভাবে জীবন যাপনের জন্য একটি প্রত্যয় ব্যক্ত করে। আরেকটি হল মূল বিজু। যেখানে তারা নিজেদের মধ্যেকার মানবিক সম্পর্ক স্থাপন করে। সামাজিকীকরণ করে নিজেদের মধ্যে। এটি সব ধর্মের সকলের কাছেই গ্রহনযোগ্য হতে পারে বলেও অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি। নিজেদের মধ্যেকার পারষ্পরিক ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে আন্ত:সম্পর্ক স্থাপন করাটায় একটি অসাধারণ চেতনা বলেও মনে করেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, পাহাড়ের আদি-জনপদে আদিবাসীরা যে ধরণের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি লালন করে, সেগুলো আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। তারা যে সংস্কৃতিগুলো চর্চা করে সেগুলো আমরা কোনো ক্রমেই হারাতে পারি না। একটি আধুনিক, উন্নত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণের জন্য আমাদের এই সংস্কৃতিগুলো রক্ষা করা উচিত বলেও মনে করেন ঢাবি ভিসি।
জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মিহির লাল সাহা বলেন, জগন্নাথ হল এমন একটি ঐহ্যিবাহী হল যেখানে আমরা সকল শিক্ষার্থীকে নিজ নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতি সমানভাবে চর্চার সুযোগ দিই। আমি ব্যক্তিগতভাবে পাহাড়ী শিক্ষার্থীদেরকে নিজেদের উৎসব এবং অনুষ্ঠানগুলো আয়োজনের উদ্যোগ নিতে উৎসাহিত করি। আমাদের উচিত বহুত্বের এই সংস্কৃতি চর্চায় মনোনিবেশ করে বাংলাদেশকে একটি সুন্দর রাষ্ট্রে পরিণত করা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল বলেন, আমি এই আয়োজনে উত্থাপিত প্রথম দাবী- আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়টির সাথে সম্পূর্ণ একমত। অন্তত এ স্বীকৃতি আদায় হলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যে বহুত্ববাদী চরিত্র তার অনেক খানিই অর্জিত হবে। তবে সব দিক দিয়ে ছাত্রদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। অন্যদিকে, উৎসবের দিনে পরীক্ষা দেয়াটা দু:খজনক। অন্তত এই ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের দাবীকে মেনে এই উৎসবের সময় তিন দিন ছুটি দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সারা দেশকে পথ দেখাতে পারে বলেও মনে করেন তিনি। এজন্য নানা ফোরামে তিনি কথা বলবেন বলেও আশ্বাস দেন।

বিজ্ঞাপণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরিণ বলেন, পাহাড়ে যখন বিজু, বৈসু, সাংগ্রাই, বিষু, বিহু, চাংক্রান আসে তখন সেখানকার বাঙালী জনগোষ্ঠী কর্তৃক এক ধরণের সংকট তৈরী করা হয় যেন আদিবাসীরা উৎসব করতে না পারে। লোগাং গণহত্যা তার একটি উদাহরণ। যার জন্য পাহাড়ীরা প্রতিবাদ করেছিল। অন্যদিকে এই উৎসব আনেকটা ঈদের মত। কাজেই এই উৎসবের সময়ে আদিবাসী শিক্ষার্থীদেরকে ছুটি দিয়ে উৎসবে অংশ নিতে সুযোগ দেয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

আয়োজকরা একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালী নিয়ে টিএসসিতে একটি সমাবেশে মিলিত হয়।
জগন্নাথ হলের পুকুর ঘাটে ফুল ভাসানোর পরে একটি র‌্যালি শামসুন্নাহার হল, রোকেয়া হল ঘুরে টিএসসি’র রাজু ভাষ্কর্যে গিয়ে সম্পন্ন হয়। উক্ত সংগঠনটির সভাপতি রাতুল তঞ্চঙ্গ্যার সভাপতিত্বে এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ঐতিহ্য চাকমা’র সঞ্চালনায় সমাবেশে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুম সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদ এর সহ-সভাপতি সতেজ চাকমা।
তিনি বলেন, ঈদের দিনে বা পূজার দিনে মূলধারার (বাঙালি) কোনো শিক্ষার্থী যেমন পরীক্ষার হলে বসতে চাইবে না। তেমনি বিজু, বৈসু বা সাংগ্রাইয়ের উৎসব ভুলে এই আদিবাসী শিক্ষার্থীরা নিশ্চিন্তে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছে না। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয় তথা রাষ্ট্র ব্যবস্থা আরো বেশী সংবেদনশীল হয়ে অন্তুর্ভুক্তিমূলক নীতিমালা গ্রহন করুক এটা আমরা সবাই প্রত্যাশা করি। আমরা আদিবাসীদের এই উৎসবের দিনে অন্তত তিনদিন সরকারী ছুটি দাবী করছি।
উক্ত সমাবেশে আরো শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিরণ মিত্র চাকমা, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি সংসদের সাধারণ সম্পাদক আদনান আজিজ চৌধুরী এবং মূল বক্তব্য পাঠ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হেমা চাকমা। লিখিত বক্তব্যে তিনি ছয় দফা দাবী তুলে ধরেন। দাবীগুলো হলো-
১. আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে।
২. সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিভিন্ন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৩. পহেলা বৈশাখের মতো বিজু-সাংগ্রাই-বৈসু-বিষু-চাংক্রানের উৎসবের সময়ও সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অন্তত ৩ দিন সরকারীভাবে ছুটি ঘোষণা করতে হবে।
৪. সকল আদিবাসীর মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
৫. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি মোতাবেক আদিবাসীদের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুম সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদ’ এর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।
৬. আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে আদিবাসীদের ভাষা নিয়ে গবেষণা এবং ভাষা শিক্ষা কোর্স চালু করতে হবে।

বিজ্ঞাপণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please Disable Your Ad Blocker.