সোশ্যাল মিডিয়া আইপিনিউজ-

‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার নিয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সার্কুলার আমলাতান্ত্রিক ঔদ্বত্যপূর্ণঃ দেশের ৫০ বিশিষ্টজন

আইপিনিউজ ডেক্স(ঢাকা): ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহারে সাম্প্রতিক সময়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সার্কুলারকে আমলাতান্ত্রিক ঔদ্বত্যপূর্ণ, গোয়েন্দা সংস্থার প্ররোচনা বলে মনে করছেন দেশের ৫০ বিশিষ্টজন। এছাড়া তথ্য মন্ত্রণালয়ের এই সার্কুলার সংবিধান-পরিপন্থী ও উচ্চ আদালত অবমাননার সামিল বলেও মনে করছেন উক্ত নাগরিকরা। এটি অবিলম্বে প্রত্যাহারের জন্যও নাগরিকরা আহবান জানিয়েছেন।

আজ এক বিবৃতির মাধ্যমে উক্ত নাগরিকরা এই আহ্বান জানান। বিবৃতিদাতাদের অন্যতম এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে নাগরিকরা বলেন, “আমরা গভীর ক্ষোভ ও বিস্ময়ের সঙ্গে জেনেছি যে, তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে দেশের সকল টেলিভিশন চ্যানেলের প্রধানদের কাছে একটি সার্কুলার পাঠিয়ে বলা হয়েছে ‘৯ আগস্ট ২০২২ তারিখ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত টকশো-তে অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ এবং সংবাদপত্রের সম্পাদকসহ সুশীল সমাজের অন্যান্য ব্যক্তিবর্গকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার না করার বিষয়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধ্যকতা সম্পর্কে প্রচারের জন্য’ বলতে হবে। যে সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় এই সার্কুলার প্রচার করেছে, সেই সরকারের ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারের ২৮(ক) ধারায় একাধিকবার আদিবাসী শব্দটি স্পষ্ট করে ব্যবহার করা হয়েছে।

বিবৃতিতে আরো বলা হয় যে, এই সার্কুলারটি আসলে একটি গোয়েন্দা সংস্থার পরিপত্রকে ভিত্তি করেই রচিত এবং তার অনুলিপি হিসেবেই প্রচার করা হয়েছে। কোন শব্দটি সংবিধান সম্মত কিংবা অসাংবিধানিক তা নির্ধারণ করার এখতিয়ার একটি গোয়েন্দা অধিদপ্তর কিংবা তথ্য মন্ত্রণালয়ের সার্কুলার প্রণয়নকারীদের কাছে কখন কিভাবে গেল তা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়।
নাগরিকরা গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগের সঙ্গে বলেন যে, এটি চরম অনধিকার চর্চার পর্যায়ে পড়ে, যা মোটেই কাম্য নয়, আইনসম্মতও নয়।
‘সংবিধানের কোন ধারা বা বিষয় নিয়ে কোন বিতর্ক বা মতান্তর দেখা দিলে তার ব্যাখ্যা একমাত্র দেশের সর্বোচ্চ আদালত বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টই দিতে পারব ‘ উল্লেখ করে বিবৃতিদাতারা আরো বলেন, অন্য কোন প্রতিষ্ঠান, গোষ্ঠী বা ব্যক্তি নয়। আর বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টেরই এক রায়ে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে যে, আদিবাসী শব্দটি ব্যবহারে কোন আইনগত প্রতিবন্ধকতা নেই।

বিবৃতিদাতারা আরো বলেন, ‘এ কথাও আজ দিবালোকের মতো সত্য যে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারই ১৯৭২ সালে যে আই এলও কনভেনশন ১০৭ অনুস্বাক্ষর করে গেছেন সেখানেও আদিবাসী বা ওহফরমবহড়ঁং শব্দটি শুধু ব্যবহারই নয়, তাদের সকল অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। এ ছাড়া কয়েক মেয়াদে ক্ষমতাসীন বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে আদিবাসী দিবস উপলক্ষে তার দেয়া বানীতে আদিবাসীদের নিজস্ব পরিচয়ে সকল অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার উপর বলিষ্ঠ ভাষায় গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।

বিবৃতিতে আরো বলা হয় যে, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের ২(ক) ও ২(খ) ধারায় যে বাক স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দেয়া রয়েছে তাতেও এই সার্কুলারে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছে। একজন কি কি শব্দ চয়ন করলেন তাতে রাষ্ট্রের কারও কিছু বলার নাই, যদি এই শব্দ ব্যবহারে অন্য কারও প্রতি বিদ্বেষ বা ঘৃনা না ছাড়ানো হয়।
তাই নাগরিকরা এই সার্কুলার তথা নির্দেশনার প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানান। একই সাথে এ ধরনের ‘আমলাতান্ত্রিক ঔদ্বত্যপূর্ণ’ সার্কুলার জারি করে আদিবাসী ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বিভ্রান্ত করা কিংবা স্বাধীন মতামত প্রদানকারী নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীদের হেয় করার প্রচেষ্টা থেকে সংশ্লিষ্ট সকল মহলকে বিরত থাকার আহ্বানও জানান নাগরিকরা এবং অবিলম্বে তথ্য মন্ত্রণালয়ের আলোচ্য এখতিয়ার বহির্ভূত সার্কুলার প্রত্যাহারের জোর দাবিও জানান নাগরিকরা।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী নাগরিকরা হলেন
, বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল, নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, মানবাধিকার কর্মী ড. হামিদা হোসেন, টিআইব ‘র নির্বাহী পরিচালকড. ইফতেখারুজ্জামান, নারীপক্ষের সদস্য শিরিন হক, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষক প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান, রিসার্স ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ (রিব) এর নির্বাহী পরিচালক, ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা,বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাণা দাশগুপ্ত, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবি সুব্রত চৌধুরী, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটির ভিসি পারভীন হাসান, চাকমা রানী ও চাকমা সার্কেল চীফ উপদেষ্টা রানী ইয়েন ইয়েন, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজল দেবনাথ, মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী অ্যাড. জেড আই খান পান্না,বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবি অ্যাডভোকেট তবারক হোসাইন, ঢাবি অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাত, কবি ও লেখক রেহনুমা আহমেদ, এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা,ব্লাস্টের অনারারি নির্বাহী পরিচারক ব্যারিস্টার সারা হোসেন, সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, ব্লাক হিল স্টেট ইউনিভার্সিটির এমিরেটাস অধ্যাপক আহরার আহমেদ, ব্রতি’র নির্বাহী পরিচালক শারমিন মুর্শিদ,বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, আলোকচিত্রী ড. শহিদুল আলম, নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, বেলা’র নির্বাহী পরিচালক, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ঢাবি অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, অস্ট্রেলিয়া ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বীনা ডি’ কস্টা, ঢাবি’র আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, ঢাবি’র ইংরেজী বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুব, ঢাবির সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা, ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফেরদৌস আজীম, ঢাবি অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন, ঢাবি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজিম উদ্দিন খান, ঢাবি’র আরেক অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীন কণা, সহযোগী নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক নোভা আহমেদ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস কাউন্সিলের ম্যানিজিং ডিরেক্টর মাহরুখ মহিউদ্দিন, কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচাল পল্লব চাকমা,গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী রেজাউল করিম লেনিন, সাংবাদিক ও গবেষক সায়দিয়া গুলরুখ, মানবাধিকার কর্মী মো. নুর খান লিটন, ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাহনাজ হুদা, মানবাধিকার ও আদিবাসী অধিকার কর্মী হানা শামস আহমেদ- কোস্ট ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী, সঙ্গীতশিল্পী ও লেখক অরূপ রাহী, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক দীপায়ন খীসা, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সিনিয়র উপ-পরিচালক নীনা গোস্বামী, মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী ব্যরিষ্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া প্রমুখ।

শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত

Leave a Comment

Your email address will not be published.

আইপিনিউজের সকল তথ্য পেতে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন