সোশ্যাল মিডিয়া আইপিনিউজ-

হাজংমাতা মহিয়সী নারী রাশিমণি হাজংকে স্মরণ: সোহেল হাজং

আজ ৩১ জানুয়ারি। আদিবাসীদের ইতিহাসে এক অন্যতম দিন । কারণ ১৯৪৬ সালের এ দিনে মহীয়সী নারী ও টংক আন্দোলনের নেত্রী রাশিমণি হাজং তাঁর দলবল নিয়ে ব্রিটিশ পুলিশ বাহিনীর সাথে সম্মুখ লড়াইয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। ঘটনাটি ঘটেছিল তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার (বর্তমানে নেত্রকোনা জেলায় অন্তর্ভূক্ত) দুর্গাপুর উপজেলার বহেরাতলি গ্রামে। একজন নারী হয়ে অন্য একজন নারীর সম্ভ্রম রক্ষা করতে এবং গরীব কৃষকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে বীরের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে সেদিন রাশিমণি হাজং তার জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। আজ তার ৭৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। রাশিমণি হাজং টংক আন্দোলনের প্রথম নারী শহীদও বটে। এদিনে রাশিমণি হাজং ও তার সাথে জীবন দিয়েছিলেন সুরেন্দ্র হাজংসহ আরো যারা অধিকার আদায়ের যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন সবাইকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।

রাশিমণি হাজংয়ের জন্ম ও ঠিকানা নিয়ে হাজং সমাজে দু’ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। কেউ বলেন, রাশিমণি হাজংয়ের জন্ম তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার দুর্গাপুর উপজেলাধীন বগাঝরা নামক গ্রামে ১৯০৮ সালে। আবার অনেকে বলেন, তার জন্ম নালিতাবাড়ি উপজেলার ঘাইলারা ভেদিকুড়া গ্রামের একটি মধ্যবিত্ত হাজং পরিবারে। বর্তমানে দুর্গাপুর উপজেলাটি নেত্রকোনা জেলা ও নালিতাবাড়ি উপজেলাটি শেরপুর জেলার অধীনে। আদিবাসী নেতা মতিলাল হাজংয়ের মতে, নালিতাবাড়ি উপজেলার ঘাইলারা ভেদিকুড়া গ্রামে রাশিমণি জন্মগ্রহণ করে মাত্র ১৬ বছর বয়সে পার্শ্ববর্তী গ্রামের একজন হাজং যুবকের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বিয়ের ৫ বছর পর তার স্বামী মারা যায়। প্রথম স্বামী মারা যাওয়ার পর রাশিমণি সাংগঠনিক কাজে যুক্ত হওয়া শুরু করেন এবং পরবর্তীতে দুর্গাপুর উপজেলাধীন বগাঝরা গ্রামের পাঞ্জিরাম হাজংয়ের সঙ্গে তার দ্বিতীয় বিয়ে হয়।

আমরা জেনেছি, শৈশবকালীন শিক্ষা ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের সুযোগ রাশিমণির তেমন একটা হয়ে ওঠেনি। তবে ছোটকাল থেকেই তিনি খুব সাহসী, কৌতূহলি ও স্বাধীনচেতা ছিলেন। দ্বিতীয় স্বামী পাঞ্জিরাম হাজং পেশায় একজন কবিরাজ ছিলেন এবং পাঞ্জি সাধু নামেই তিনি বেশি পরিচিত ছিলেন। সেই সুবাদে রাশিমণি তার স্বামীর কাছ থেকে কবিরাজি বিদ্যা কিছুটা গ্রহণ করেন। তাছাড়া নিজেও কিছু তন্ত্রমন্ত্র ও ধাত্রী (দাইমা) জ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন। তাই প্রতিবেশীদের ছোটখাটো কোন রোগ সারাতে ও সন্তান প্রসব করানোর কাজ করে এলাকাতে বেশ জনদরদী হয়ে ওঠেন তিনি। তবে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় একজন প্রতিবাদী মানুষ হিসেবে। কেননা, সেসময় তার গ্রামটি ছিল ব্রিটিশ বিরোধী গ্রামগুলোর মধ্যে একটি। রাশিমণি হাজংয়ের মনেও শুরু থেকেই ব্রিটিশ বিরোধী চেতনা গড়ে ওঠে। মহাজন ও জোতদারদের অন্যায় নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে শেখেন। এভাবেই এক সময় তিনি হয়ে ওঠেন টংক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেত্রী।

টংক আন্দোলন প্রকৃতপক্ষে কৃষক আন্দোলন। টংক মানে ধান কড়ারি খাজনা। টংক প্রথার শর্তানুসারে জমিতে ফসল হোক বা না হোক চুক্তি অনুযায়ী টংকের ধান জমির মালিককে দিতেই হতো। ফলে দেখা যায়, কোন বছর যদি জমিতে ফসল না হয় বা খরা, প্রাকৃতিক দূর্যোগে শস্য নষ্ট হয়ে যায় তবুও কৃষককে তার নির্ধারিত খাজনা পরিশোধ করতে হতো। এতে হাজংসহ অন্যান্য সম্প্রদায় এবং অঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকসমাজ অর্থনৈতিকভাবে দুরবস্থায় পড়ে। আর কোনও কারণে টংকের ধান পরিশোধ করতে না পারলেই কৃষকদের ওপর নেমে আসত অত্যাচার-নিপীড়ন। তাই টংক প্রথা কৃষকদের জন্য অভিশাপ হয়ে আসে। সেজন্য তারা টংকের হাত থেকে মুক্তির জন্য সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ বা আন্দোলন গড়ে তোলেন। রাশিমণির নেতৃত্বে হাজংরা প্রথমে টংকের কুফল বিষয়ে সচেতনায়নে গ্রামে গ্রামে বৈঠক করেন। বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে গিয়ে তিনি হাজং নারীদের নিয়ে নারী বাহিনী গড়ে তোলেন। জানা যায়, তিনি একবার সরাসরি সেই নারী বাহিনীদের নিয়ে লেঙ্গুরা ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার ক্যাম্প ও দুর্গাপুর থানা আক্রমণ করেন। একপর্যায়ে কৃষকরা ঐকমত সৃষ্টি করে জমিদারদের টংক ধান দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এতে টংক চাষিদের ভাগ্যে নেমে আসে আরো দুর্ভোগ। কেননা, জমিদারগোষ্ঠী টংক ধান আদায়ের জন্য যথাসাধ্য শক্তি প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছিল। সেজন্য হাজং কৃষকরা টংক প্রথা উচ্ছেদের জন্য আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। প্রথমে তারা জমিদার গোষ্ঠী, অতঃপর ব্রিটিশ সরকার এবং শেষে পাক-সরকারের প্রতি সংঘর্ষে লিপ্ত হন। হাজংদের এ টংক ও জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের আন্দোলনে অন্যতম প্রধান নেতৃেত্ব এগিয়ে আসেন কমরেড মণি সিংহ।

যদিও বলা হয়, ১৯৪৬-১৯৫০ সাল পর্যন্ত টংক আন্দোলন সংঘটিত হয় কিন্তু এ অঞ্চলে তারও পূর্ব থেকেই এ আন্দোলনের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছিল এবং হাজংদেও মধ্যে সেটা তীব্রভাবে কাজ করছিল। রাশিমণি হাজংয়ের নেতৃত্বে নেত্রকোনার প্রতিটি অঞ্চলে যখন আন্দোলন তুঙ্গে। সে সময় ১৯৪৬ সালের ১ জানুয়ারি দুর্গাপুরের বিরিশিরিতে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেল্স বাহিনীর সশস্ত্র ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। এ সশস্ত্র বাহিনী বিভিন্ন গ্রামে হানা দিয়ে বিদ্রোহী হাজং কৃষকসহ অন্যান্য কৃষকদের খুঁজতে শুরু করে। সে লক্ষ্যেই ৩১ জানুয়ারি সকাল ১০ টার দিকে ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেল্স বাহিনী বিরিশিরি থেকে প্রায় চার মাইল উত্তরে বহেরাতলী নামক গ্রামে তল্লাশি চালায়। কিন্তু এদিনে এ গ্রামের বিদ্রোহী কৃষক নর-নারীরা প্রতিবেশিদের টংক বিরোধী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করার কাজে পাশের গ্রামে অবস্থান করছিল। অবশেষে বহেরাতলী গ্রামে কাউকে না পেয়ে ক্ষিপ্ত পুলিশ বাহিনী লংকেশ্বর হাজংয়ের সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী কুমুদিনী হাজংকে ধরে বিরিশিরি ক্যাম্পের দিকে রওনা হয়। রাশিমণি হাজং ও হাজং কৃষকদের মাঝে এ সংবাদটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে শতাধিক হাজং নারী-পুরুষ সশস্ত্র বাহিনীর পথরোধ করে। এ সময় বিপ্লবী রাশিমণি হাজং তার দলবলসহ কুমুদিনী হাজংকে বাঁচাতে পুলিশ বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন।

সে সময় তিনি বজ্রকণ্ঠে বলেন- ‘ময় তিমাদ, এগরা তিমাদ হুয়ে ময়, তিমাদলা মান রুক্ষা কুরিব, না-তে মুরিব, তুরা তুমলা নীতি নিয়া বুইয়া থাক।’ হাজং ভাষায় বলা এ কথার অর্থ হচ্ছে-‘আমি নারী, নারী হয়ে আমি আরেক নারীর সম্ভ্রম রক্ষা করবো, মরতে হয় মরব। তোমরা তোমাদের নীতি নিয়ে বসে থাক।’ এটা বলার সাথে সাথে দলের অন্য সদস্যরাও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। পুলিশ বাহিনী এসময় নৃশংসভাবে তাদের ওপর গুলি চালায়। যুদ্ধের একপর্যায়েপছন থেকে আসা গুলির আঘাতে রাশিমণি হাজং মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পেছনে পুরুষ দলের নেতা সুরেন্দ্র হাজং রাশিমণিকে ধরতে গেলে তাকেও নির্দয়ভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। বাকি আদিবাসী সদস্যরা তখন পুলিশদের মেরে ঘায়েল করা শুরু করলে অবশেষে তারা কুমুদিনীকে রেখে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এ যুদ্ধে হাজং কৃষক শহীদদের পাশাপাশি আরো দু’জন ব্রিটিশ পুলিশের নিহতের খবর পাওয়া যায়। এভাবেই সেদিন রক্ষা পায় কুমুদিনী হাজং কিন্তু বহেরাতলির মাটিতে সেদিন রক্ত গঙ্গায় মিশে যায় আদিবাসী নেত্রী রাশিমণি হাজংয়ের তাজা প্রাণ।

নারী হয়ে নারীর সম্ভ্রম রক্ষার্থে জীবন উৎসর্গ করা ইতিহাসে বিরল। তার ওপর নিজস্ব সমাজের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন এবং অত্যাচারীর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজের জীবন দানে রাশিমণি পিছপা হননি। এজন্যই আজ তিনি দেশের হাজং জনগোষ্ঠীর কাছে ‘হাজংমাতা’ হিসেবে পরিচিতি স্বীকৃত হয়েছেন। প্রখ্যাত কবি রফিক আজাদ রাশিমণিকে নিয়ে তার ‘মাতা রাশিমণি’ কবিতায় লিখেছেন-

রাশিমণি একটি নাম, জীবন-সমান দীর্ঘ নাম;
দেশবাসী, জানাও তোমরা তাঁকে সহস্র প্রণাম।
রাশিমণি এই বিশাল বাংলায় একবারই জন্মানঃ
অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে গর্বিত শহীদ।
…………………………………………
আজ রাশিমণি ও সুরেন্দ্র হাজংয়ের মতো সাহসী ব্যক্তি শুধু আদিবাসী সমাজেই নয় আমি বলব গোটা সমাজেই বড়ই প্রয়োজন। যেভাবে মানুষ নির্ভয়ে সত্য কথা বলা ও সৎসাহস দেখানোর চর্চা হারিয়ে ফেলছে, আমি বলব ঠিক এই সময়ে, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রাশিমণি হাজংদের মতোই মহীয়সী নেত্রী জেগে ওঠুক বারবার!

সোহেল হাজং, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্য ও জাতীয় হাজং সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক।

শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত

Leave a Comment

Your email address will not be published.

আইপিনিউজের সকল তথ্য পেতে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন