সোশ্যাল মিডিয়া আইপিনিউজ-

শালবনের চিৎকার: গানে গানে মধুপুরে লেক খনন ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদ

বিশেষ প্রতিনিধি, আইপিনিউজ: “উঠে দাঁড়া ভাই-বোনেরা, শাল গজারি বন/ আমার ঘরে দিচ্ছে হানা, মিথ্যে উন্নয়ন” এই স্লোগানকে সামনে রেখে মধুপুরে আদিবাসীদের কৃষি জমিতে বনবিভাগ কর্তৃক লেক খনন পরিকল্পনার প্রতিবাদে “শালবনের চিৎকার” শিরোনামে আমলীতলা খেলার মাঠে এক প্রতিবাদী গানের অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে সন্মিলিত আদিবাসী জনতা। মেহনতি মানুষের লড়াই-সংগ্রামের উজ্জীবনী শক্তি হয়ে ব্যতিক্রমী হাতিয়ার হিসেবে ঐতিহাসিকভাবেই গণমানুষের সঙ্গী হয়েছে “গান”। মধুপুরে গড়ে আদিবাসীদের প্রথাগত অধিকার কেড়ে নেবার বিরুদ্ধে, নিজেদের অস্তিত্বের প্রশ্নে আদিবাসীরা শতাব্দী ধরে নিরবিচ্ছিন্ন লড়াই-সংগ্রাম করছে। সেই যৌক্তিক লড়াইয়ের পক্ষে বিভিন্ন সময়ে গড়ে উঠেছে গণমানুষের জোরালো  আন্দোলন কিংবা আদিবাসী মানুষের লড়াইয়ের পক্ষে শৈল্পিক মূল্যবোধের প্রতিবাদী গান রচিত হয়েছে অনেকের সুরে।
২০০৪ সালের ৩রা জানুয়ারীতে বন প্রকৃতি, জন-জীবন ও নিজস্ব ভূমির উপর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মধুপুরবাসীর জনজীবনের উপর চাপিয়ে দেওয়া ইকোপার্কের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ ও বনবিভাগের গুলিতে নিহত হন পীরেন স্নাল ও আহত হন উৎপল নকরেক সহ অর্ধশতাধিক আদিবাসী।  লোকরঞ্জনবাদী তথাকথিত মিথ্যে উন্নয়নের নামে আদিবাসীদের উপর রাষ্ট্র যখন আগ্রাসন চালিয়েছে। ঠিক তখনই মধুপুরের ভূমিজ জনগোষ্ঠী গারো-কোচ-বর্মন আদিবাসীরূ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, চেয়েছে জীবনের অধিকার।  লড়াই করেছে, জীবন দিয়েছে। আজকের মুনাফাভোগী পৃথিবী শোষণের হাতিয়ার হিসেবে আধুনিকতার নামে, সভ্যতার নামে এবং কথিত উন্নয়নের নামে প্রাণ প্রকৃতি ধ্বংসের মধ্য দিয়ে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার’কে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অথবা উপজাতি’ নাম দিয়ে রাষ্ট্র ফ্যাসীবাদী কায়দায় লাগাতার আগ্রাসন, নিপীড়ন অব্যাহত রেখেছে।
ইকোপার্ক, ইকোট্যুরিজম, ফায়ারিং রেঞ্জ, সংরক্ষিত বনাঞ্চল কিংবা চিত্তোবিনোদনের উদ্দেশ্যে লেক খনন সহ তথাকথিত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে আদিবাসীদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে রাষ্ট্র। বর্তমান সরকার ও রাষ্ট্রের এইসব উচ্ছেদ ষড়যন্ত্রের সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হচ্ছে- টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর উপজেলার আদিবাসী অধ্যুষিত চুনিয়া, সাইনামারী, থানারবাইদ, পীরগাছা, ভুটিয়া ও পেগামারী গ্রামের পার্শ্বে ১১ নং শোলাকুড়ী ইউনিয়নের পীরগাছা মৌজার আমলীতলা নামক বাইদে/নিচু জমিতে কৃত্রিম লেক খনন ও দেশী-বিদেশী পর্যটকদের শুধুমাত্র মনরঞ্জন বা চিত্তবিনোদনের জন্য আদিবাসীদের ৩ ফসলির মোট ৪৫ বিঘা কৃষি জমি কেড়ে নিয়ে বন বিভাগের আধুনিক পর্যটন প্রকল্প। যা নিরীহ আদিবাসীদের জীবন জীবিকার উপর মারাত্মক হুমকি।
ইকোপার্ক, ইকো-ট্যুরিজম উন্নয়নের নামে বনের ভেতরে বিভিন্ন স্থাপনা, জাতীয় উদ্যান, পিকনিক স্পট, কিংবা ফায়ারিং ও বোম্বিং রেঞ্জ, রাবার বাগান, সামাজিক বনায়নের নামে শালগজারির এই প্রাকৃতিক বনকে ধ্বংস করেছে। প্রাকৃতিক বন উজাড় করে বন বিভাগ বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় “সাসটেইনেবল ফরেস্ট এন্ড লাইভলিহুড বা সুফল” প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এছাড়া মধুপুর জাতীয় উদ্যানের ইকো ট্যুরিজম উন্নয়ন ও টেকসই ব্যবস্থাপনার আওতায় বন বিভাগ স্থানীয় মানুষের ভূমিতে সীমানা প্রাচীরসহ আরবোরেটাম বাগান, দ্বিতল গেস্ট হাউস, ভূগর্ভস্থ জলাধার নির্মানসহ নানা স্থাপনা নির্মাণ করেছে। এই সবই আদিবাসীদের কৃষ্টি- সংস্কৃতির উপর আঘাত করার পায়তারা বলে মনে করছেন স্থানীয় আদিবাসীরা। আদিবাসীদের স্বার্থবিরোধী বনবিভাগের লেক খনন পরিকল্পনা প্রতিরোধের লক্ষ্যে ” সন্মিলিত আদিবাসী ছাত্র-জনতা”র ব্যানারে শুরু থেকেই প্রতিবাদ করছে আদিবাসীরা। এই প্রতিবাদের ধারাবাহিকতায় সম্মিলিত আদিবাসী জনতার উদ্যোগে গতকাল ৯ই সেপ্টেম্বর, ২০২২ তারিখে আমলীতলা প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিকাল ৪ঃ৩০ ঘটিকায় শুরু হয়ে রাত ১০ঃ৪৫ ঘটিকায় প্রতিবাদী গান “শালবনের চিৎকার” আয়োজন হয়েছে। হাজারো মানুষের সমাগমে মধুপুরে আদিবাসীদের কৃষি জমিতে লেক খননের বিরুদ্ধে শালবনের চিৎকার আয়োজনের সাথে প্রতিবাদী গানে গানে সংহতি জানিয়েছেন- শিল্পী কফিল আহমেদ, গানের দল মাদল, সমগীত, আচিক ব্লুজ, রংখেক রংসা, সবুজ মাঝি।
আয়োজনে গানে গানে সংহতি জানিয়েছে আদিবাসীদের গানের দল -মাদল
বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক ও আয়োজক কমিটির অন্যতম সদস্য টনি চিরান বলেন, “শালবনের চিৎকার” শুধু গান আয়োজনই নয় বরং আদিবাসীদের জীবন ও প্রান-প্রকৃতির পক্ষে চিরকাল লড়াইয়ের সঙ্গী হয়ে উঠার প্রত্যয়। এই দৃঢ় প্রত্যয় নিয়েই আমরা শালবনের চিৎকার আয়োজন করেছি। এই চিৎকার মধুপুরের শালবনে আদিবাসীদের চিৎকার, এই চিৎকার প্রাণ-প্রকৃতির চিৎকার। শরীরে এক বিন্দু রক্ত থাকতে নিজ ভূমিতে বিনোদনের উদ্দেশ্যে লেক খনন করতে দিবোনা।
বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও আয়োজক কমিটির অন্যতম সদস্য অলিক মৃ বলেন, “শালবনের চিৎকার মধুপুরের আদিবাসীদের জমে থাকা অগ্নিশিখার বহিঃপ্রকাশ। বনবিভাগ কর্তৃক আদিবাসীদের কৃষি জমিতে চিত্তবিনোদনের উদ্দেশ্যে লেক খনন প্রকল্প আদিবাসীরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। মিথ্যে উন্নয়নের নামে আদিবাসীদের উচ্ছেদ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আদিবাসীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই-সংগ্রাম জারি রাখবে। এ সংগ্রামেরই অংশ শালবনের চিৎকার।
‘শালবনের চিৎকার’ আয়োজনে সমগীত এর সংহতি
প্রতিবাদী এ “শালবনের চিৎকার” আয়োজনের আহ্বায়ক ছাত্রনেতা জন জেত্রা’র সভাপতিত্বে এবং সদস্য সচিব লিয়াং রিছিলের সঞ্চালনায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সহ-সভাপতি অজয় এ মৃ, জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিন নকরেক, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রচার সম্পাদক দীপায়ন খীসা, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সভাপতি অনন্ত বিকাশ ধামাই, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ এর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নিপন ত্রিপুরা প্রমুখ। ঝড়ো বৃষ্টি উপেক্ষা করেও গানের দল মাদলের গানের তালে হাজারো মানুষের সুরে ধ্বনিত হয়েছে- শালবৃক্ষের মত সিনা টান করে সে, মানুষ হয়ে বাঁচতে পীরেন জান দিয়েছে। মাদলের এই প্রতিবাদী গানের মধ্য দিয়েই শেষ হয়েছে প্রতিবাদী শালবনের চিৎকার গানের আয়োজন।

শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত

Leave a Comment

Your email address will not be published.

আইপিনিউজের সকল তথ্য পেতে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন