আঞ্চলিক সংবাদ

মামলা করিয়ে, কোনো খবর নাই: লামার রেংয়েন পাড়া’র কার্বারী রেংয়েন ম্রো

নিরাপত্তাহীনভাবে কাটছে তাঁদের দিন।

আইপিনিউজ ডেক্স রিপোর্ট: মামলা করার দশ দিন পরও এখনো কোনো আসামীকে গ্রেফতার করা হয় নি বলে অভিযোগ করেছেন গত ২ জানুয়ারি বান্দরবানের লামায় আটটি পরিবারের ঘর পুড়িয়ে দেওয়া ভুক্তভোগী পাড়ার কার্বারী রেংয়েন ম্রো। এক মুঠোআলাপে আইপিনিউজকে তিনি বলেন, “এখন আপাতত ঘরবাড়ি তুলিত ন্ পারির। আট বাড়ির মানু ভাগ ভাগ করি আছে। গাছ-বাঁশ কাটিয়ারে ঘর তুলিত লাগিব। বর্ষা কালে কোথায় থাকিব মানু?” (এখন আপাতত ঘরবাড়ি তুলতে পারছি না। আট বাড়ীর মানুষ ভাগ ভাগ করে প্রতিবেশীদের বাড়ীতে আছে। গাছ-বাঁশ কেটে ঘর-বাড়ি নির্মাণ করতে হবে। নাহলে বর্ষাকালে এই মানুষ কোথায় থাকবে?)

এখন কেমন আছে পাড়ার মানুষ। এমন প্রশ্ন করা হলে রেংয়েন কার্বারী আইপিনিউজকে আরো বলেন, “কোনো নিরাপত্তা নাই। মামলা করিয়ে, কোনো খবর নাই। লামা রাবার কোম্পানির লোকজন প্রায় সময় পাড়ায় আসে। বাজার করিত গেলে ডর ভয় লাগে। কখন কী করে।”

বিজ্ঞাপণ
গত ২ জানুয়ারি, রেংয়েন পাড়ায় অগ্নিসংযোগের পর একটি ভষ্মিভূত বাড়ি।

তিনি আরো বলেন, “বান্দরবান থেকে পুলিশ আইসে। উপজেলা থেকে মানু আইসে। কইসে ঝামেলা মিট-মাট না হইলে ঘর-বাড়ি তুলিত ন্ পারিব, রাবার কোম্পানিও জাগা দখল করিত ন্ পারিব। বাগান-তাগান করিত ন্ পারিব। কলা-আম গাছ লাগাতে ন্ পারিব। শুধু জুম করিত পারিব।” (বান্দরবান থেকে পুলিশ এসেছে। লামা উপজেলা থেকেও প্রশাসনের লোকজন এসেছে। তারা বলছে ঝামেলা মিটমাট না হওয়া পর্যন্ত ঘর-বাড়ী তৈরী করতে পারবো না, লামা রাবার কোম্পানিও জায়গা দখল করতে পারবে না। আম-কলা গাছ রোপন করতে পারবো না। শুধু জুম চাষ করতে পারবো।)

তবে তিনি বলেন, এই জাগা আমার। যুগ যুগ ধরি এই জাগায় আমি আছি। মরিলেও এখানে, বাঁচিলেও এখানে থাকিব।

কোনো ধরণের ত্রাণ সহায়তা পেয়েছে কী না প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ইতিমধ্যে বিভিন্ন সংস্থা থেকে তারা সহায়তা পেয়েছেন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন থেকে পরিবার প্রতি এক ব্যাগ চাউল ও দশ হাজার করে টাকা পেয়েছেন তারা। এছাড়া নাগরিক উদ্যোগ থেকে পরিবার প্রতি পাঁচ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কম্বলও বিতরণ করা হয়েছে বলে আইপিনিউকে জানিয়েছেন তিনি।

বিজ্ঞাপণ
বান্দরবান বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি জুমলিয়ান আমলাই।

 

এ বেপারে যোগাযোগ করা হলে বান্দরবান বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি জুমলিয়ান আমলাই বলেন, “এই ঘটনা পাহাড়ীদের উচ্ছেদ করা ও হয়রানি করার একটা উপলক্ষ মাত্র। প্রশাসন চাইলে পারে না এমন কিছু নেই। আইন তো তার হাতেই। তো প্রশাসন আইন প্রয়োগ করছে না কেন? আজকে যদি এটা বাঙালিদের উপর এই ঘটনা ঘটতো তাহলে ১২ ঘন্টার ভেতর সবকিছু সাইজ হয়ে যেতো”। প্রশাসন পক্ষপাত দুষ্ট আচরণ করছে এবং “প্রশাসনের মদদেই এই ঘটনা” বলে তাঁর ধারণা।

 

 

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ও সংখ্যালঘু ও আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাসের সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল আইপিনিউজকে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের যে ঐতিহ্যিক ভূমি অধিকার তার প্রতি রাষ্ট্রের অস্বীকৃতির প্রমাণ এই ঘটনা। রাষ্ট্র এবং তাদের মদদপুষ্ট ধনিক শ্রেণি রাবার বাগানের মালিক’রা কত নৃশংস হতে পারে তার প্রমাণ এই ঘটনা। আসলে আদিবাসীরা যে ভূমিতে চাষ করেন, বাস করেন সেই ভূমির উপর অধিকার তাঁর। এটা ব্রিটিশ আমলের আইনে স্বীকৃত ছিল এবং আন্তর্জাতিক আইনেও স্বীকৃত। বাংলাদেশ যেহেতু ব্রিটিশ আমলের আইনের উত্তরাধিকার বহন করে,সুতরাং সেই আইন এখনো স্বীকৃত।

অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল ।

ড. মেসবাহ কামাল আরো বলেন, রাবার বাগান কর্তৃপক্ষ যা করছে সেটা সম্পূর্ণ বে-আইনী এবং লামা রাবার বাগানসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘ব্যবসায়িক কৃষির’ উদ্দেশ্যে যত জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তা পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যাকে আরো ঘনীভূত করেছে। এই সবগুলো লীজ অনতিবিলম্বে বাতিল করা দরকার এবং এই অপরাধ যারা সংঘটিত করেছে, সেটা রাবার কোম্পানির হোক বা প্রশাসনের হোক কিংবা অন্য যে কেউ হোক তাদেরকে দ্রুত গ্রেফতার করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার এবং ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া প্রয়োজন।

তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে স্থানীয়ভাবে দু’একটা সমস্যার সমাধান হলেও মৌলিকভাবে পাহাড়ের ভূমি সমস্যার সমাধান হবে না।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরোমের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং

এদিকে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, ম্রো এবং আদিবাসীদের প্রথাগত ঐতিহ্যিক ভূমি অধিকারের স্বীকৃতির জন্য সরকারের আন্তরিকতা দেখাতে হবে। এটার জন্য প্রথমে যেটা করতে হবে তা হল লীজ বাতিল করতে হবে। কেননা, লীজে বলা হয়েছিল রাবার বাগান করার কথা পচিঁশ বছর আগে। কিন্তু তখন তারা রাবার বাগান করে নাই। যেহেতু মানবাধিকার লংঘন হচ্ছে এই বিষয়ে প্রশাসন ও ম্রো’রা সহ একটা উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা করতে হবে। দ্বিতীয়ত গতবছর যারা এই আক্রমণ করেছে, ঝিরিতে বিষ প্রয়োগ করেছে, বাগান ধ্বংস করেছে এবং এবছরে যারা ঘর-বাড়ি আক্রমণের সাথে যারাই যুক্ত তাদেরকে খুঁজে বের করে গ্রেফতার করতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

 

Back to top button