মতামত ও বিশ্লেষণ

মণি সিংহ বাংলার জমিনে প্রগতির রাজনীতির জনক: রুস্তম আলী খোকন

মণি সিংহ বাংলাদেশের সেই রাজনীতিক যিনি কৈশোর যৌবনে লড়াই করেছেন- ব্রীটিশ শাসন ও উপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে, পরিণত বয়সে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জন্মের সংগ্রামে, জীবনসায়াহ্নে স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যে। মণি সিংহ অগ্নিযুগের বিপ্লবী। দীক্ষা নিয়েছিলেন- সমাজবিপ্লবের। মৃত্যুর পুর্ব পর্যন্ত মণি সিংহ মানবমুক্তির আদর্শের বাইরে পা ফেলেননি। একই জীবনে নিজ ভূখন্ডের জনগোষ্ঠীর জন্য তিন তিনটি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিরবিচ্ছিন্ন লড়াইয়ের এমন নায়ক এই ভূখন্ডে দ্বিতীয়টি নেই। মণি সিংহ বাংলার জমিনে প্রগতির রাজনীতির জনক। আদর্শের রাজনীতির স্রস্টা।

নেত্রকোণার সুসং দুর্গাপুরে জমিদার পরিবারে জন্ম নেয়া মণি সিংহ কৈশোরে স্বদেশী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে যায়। অনুশীলন দলে যোগ দিয়ে সহিংস পথে ব্রিটিশদের তাড়িয়ে প্রিয় স্বদেশ স্বাধীনের পথে নেমে যায় কিশোর মণি সিংহ। দেশপ্রেমিক মণি সিংহ চাচাতো ভাই শশী সিংহ,প্রভাত চক্রবর্তী, উপেন স্যানালসহ বন্ধুদের নিয়ে চলে যায় গাড়ো পাহাড়ের হাজং পল্লীতে। জমিদার আর উচ্চবর্ণের হিন্দুদের দ্বারা নিগৃহীত হাজং সম্প্রদায়ের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন স্কুল। তাদের হাত হতে জলের ঘটি নিয়ে পান করেন পানি।জীবন হতে নিমিষেই জাত পাতের শৃঙ্খল ভেঙে ফেলেন তেজস্বী এই কিশোর।

বিজ্ঞাপণ

মস্কো ফেরত গোপেন চক্রবর্তী একসময়ে আত্নগোপনে আসেন দুর্গাপুরে। গোপেন চক্রবর্তীর সংশ্পর্শে এসে গ্রহন করেন সমাজতন্ত্রের মতাদর্শ। সেটি ডিসেম্বর ১৯২৫ সালের ঘটনা। সমাজতন্ত্রের মতাদর্শে দীক্ষিত হয়ে ১৯২৬ সালে চলে যায় কলকাতায়। দেখা করেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মুজফফর আহমেদ এর কলকাতার বাসায়। ৩৭ হ্যারিসন রোডের কমরেড মুজাফফর আহমেদ দোতলা বাসা হতে শ্রমিক আন্দোলনের দ্বায়িত্ব নিয়ে মণি সিংহ মিশে যান মেটিয়াবুরুজে শ্রমিক অঞ্চলে শ্রমিকদের মাঝে।

শ্রমিক আন্দোলনে তার নেতৃত্ব দেখে ব্রিটিশ শাসক ভীত হয়ে ওঠে।০১ লা মে ১৯৩০ এর মে দিবসে কলকাতা গর্জে ওঠে। শুরু হয় শ্রমিক ধর্মঘট। কলকাতার শ্রমিকদের প্রিয় নেতা মণি সিংহ ০৯ মে ১৯৩০ সালে গ্রেপ্তার হয়ে যায়। ১৯৩৫ সালে পর্যন্ত কখনও জেল, কখনও অন্তরীণ এভাবেই কাটে মণি সিংহের জীবন। কৃষককুলের কাছে মণিরাজ নামে খ্যাত মণি সিংহের ভয়ে ভীত ছিলো ব্রিটিশ রাজ। একপর্যায়ে ব্রিটিশ সরকার তাকে গৃহবন্দী করেন সুসং দুর্গাপুরের নিজ বাড়িতে। গৃহবন্দী থাকা অবস্হাতেই সুচনা করেন কৃষকদের ওপর জমিদারদের নির্মম টঙ্ক প্রথার বিরুদ্ধে কৃষক আন্দোলন । খোজ নিয়ে ব্রিটিশ সরকার জানতে পারে, টন্ক আন্দোলনে মণি সিংহের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। পুনরায় জেলে পুরে দেয় মণি সিংহকে। জেল হতে বেড়িয়ে আসেন ১৯৩৭ সালে।

কলকাতার শ্রমিক আন্দোলনে ফিরে না গিয়ে কৃষককুলের মুক্তির লড়াইয়ে নিজেকে আবদ্ধ করেন তিনি । গড়ে তুলেন একের পর এক কৃষক আন্দোলন। টন্ক, নানকার,তেভাগা- জমিদার আর ব্রিটিশের বিরুদ্ধে একের পর এক সুচিত হয় কৃষক বিদ্রোহ। পাকিস্তান সৃষ্টির পরও যতদিন জমিদারি প্রথা চালু ছিলো ততদিন কৃষক আন্দোলনে জ্বলেছে বাংলাদেশ।

বিজ্ঞাপণ

পাকিস্তান সৃষ্টির পর মুসলিম লীগের বিপরীতে পুর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয় ১৯৪৮ সালের ০৬ মার্চ।পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রথম বিরোধীদল হিসেবে কমিউনিস্ট পার্টি কাজ শুরু করলে মুসলিম লীগ শাসকগোষ্ঠী চরম নিপীড়ন চালাতে থাকে। এরই মধ্যে ভাষা আন্দোলন সুচিত হয়। ভাষা আন্দোলন, আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা, যুক্তফ্রন্ট গঠনে ঐতিহাসিক ভুমিকা রাখেন কমরেড মণি সিংহ।

পাকিস্তান একটি কৃত্রিম রাস্ট্র। ধর্মের ভিত্তিতে জাতিসত্বা হতে পারে না। কমিউনিস্ট পার্টির এই মুল্যায়নকে চিন্তায় রেখে ভাষা আন্দোলনে শিক্ষক ছাত্র বুদ্ধিজীবিদের দিয়ে চেতনার পরিবর্তন আনতে সচেস্ট ছিলেন তিনি। সফলতাও পেয়ে যায়।

মুসলিম লীগ হতে মাওলানা ভাসানীকে দিয়ে এর প্রগতির ধারাকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন করেন। ভাষা আন্দোলনের অসাম্প্রদায়িক রূপকে স্হায়ী করতে পুর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন গঠনেও তার পরোক্ষ ভুমিকা ছিলো।যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টি নামে ৪ টি আসন আর বিভিন্ন দলের ভেতর আরও ২২ টি আসন তিনি ছিনিয়ে এনেছিলেন মণি সিংহ।মুসলিম লীগ শাসকগোষ্ঠী তার এবং তার পার্টির কর্মকাণ্ডে এতটাই ভীত হয়ে পড়েন যে শেষ অবধি ১৯৫৬ সালে কমিউনিস্ট পার্টি আনুষ্ঠানিক ভাবে নিষিদ্ধ করে দেয়- পাকিস্তান সরকার।

১৯৬১ সালে শেখ মুজিব ইত্তেফাক সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে পাঠান মণি সিংহের কাছে। স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণার কথা জানান। মণি সিংহ শেখ মুজিবকে সময়মত পদক্ষেপ গ্রহন করতে এবং সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।অপেক্ষাকৃত তরুণ শেখ মুজিব মণি সিংহের যুক্তি মেনে নেন। মণি সিংহের মতন রাজনীতিকরা কাউকে কখনও মিথ্যা আশ্বাস দেন না।

,৬২, ‘৬৬,’৬৯, ‘৭০, এবং শেষে ১৯৭১। ছায়া দিয়ে গেছেন মণি সিংহ এবং তার দল মণি সিংহের কমিউনিস্ট পার্টি – বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। কখনও আত্নগোপন কখনও কারাবরণ। তারপরও মুক্ত স্বদেশ, শ্রেনীহীন সমাজের স্বপ্নপূরণে ছুটে চলেছে মণি সিংহ। ১৯৭১ এ কলকাতায় প্রবাসী সরকারের পাশে থেকে সোভিয়েত রাশিয়ার সমর্থন আদায়, অস্ত্র ও অর্থ সংগ্রহ, খন্দকার মোশতাকসহ আওয়ামী লীগের দক্ষিণ পন্হী অংশের ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ এর পাশে থেকেছেন তিনি। এরই মধ্যে মোহাম্মদ ফরহাদ এর মতন তরুণ মেধাবী করিৎকর্মা এক সংগঠক পাশে পেয়েছিলেন মণি সিংহ। ছাত্র ইউনিয়ন, ন্যাপ, সিপিবির সমন্বয়ে ১৯ হাজার যোদ্ধার স্বতন্ত্র গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলেন এই বিপ্লবী। ১৬ ই ডিসেম্বর ১৯৭১ এ যুদ্ধ জয়ের আনন্দে আত্মহারা আওয়ামী লীগ মুজিব মুক্তির পথ যতটা খুঁজেছেন তার চেয়ে বেশি খুঁজেছে মণি সিংহ ও তার পার্টি। প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করেছে সোভিয়েত রাশিয়া পাকিস্তান সরকারের ওপর। মুজিবকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছে মি. ভুট্টো। সোভিয়েত রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টিকে দিয়ে মুজিবকে মুক্ত করার অসম্ভব কর্মটি সম্পন্ন করেন মণি সিংহ। রাস্ট্রজনক শেখ মুজিব সোভিয়েত রাশিয়ায় সফরে তার জীবন রক্ষায় এই পদক্ষেপ এর জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এসেছেন।

একটি সদ্য স্বাধীন দেশে সেই দেশের জাতীয়তাবাদী নেতাকে কাছে এনে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দিকে অগ্রসর হওয়ার নীতিতে চলেছেন মণি সিংহ । যারা সেই সময়ে মণি সিংহের সমালোচনা করেছেন তারাই ২০০৯ এ শেখ মুজিবের কণ্যা শেখ হাসিনার সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা করে তার সরকারের মন্ত্রী হয়েছেন।

মুক্ত স্বদেশে রাস্ট্রজনক শেখ মুজিব তার দলকে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ধারা প্রতিষ্ঠায় যখন অনেকটাই ব্যর্থ সেই সময়ে খন্দকার মোশতাক আহমদ আঘাত হানেন। খন্দকার মোশতাক যা পারেননি ১৯৭১ এ তাই করে নেন ১৯৭৫ এ।খন্দকার মোশতাক ১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্টে সপরিবারে মুজিব এবং তার তিনমাসের মাথায় প্রবাসী সরকারের বাকি চারজন সদস্যকে হত্যা করে। বাংলাদেশের মুখটিকে ঘুরিয়ে দেয় পাকিস্তানের দিকে। অনৈতিকতা আর মুক্তিযুদ্ধের মুল্যবোধ হতে সরে যাওয়া আওয়ামী লীগ প্রতিবাদহীন হয়ে মুখ ধুবড়ে পড়ে থাকে। প্রতিবাদ করে মণি সিংহের কমিউনিস্ট পার্টি।

পরিপ্রেক্ষিতে জীবন সায়াহ্নে আবার কারাগার হয়ে যায় মণি সিংহের ঠিকানা। জেনারেল জিয়া তাকে কারাবন্দী করে। নিষিদ্ধ করে কমিউনিস্ট পার্টি। তারপরও থেমে থাকেননি তিনি।জেল থেকে বেরিয়ে এসে ৭৯ বছর বয়সে ১৯৮০ সালে সিপিবির তৃতীয় কংগ্রেসে তিনি পার্টির সভাপতি পুণঃনির্বাচিত হন।একঝাঁক তরুণ তরুণীর হাতে তুলে দেন পার্টির দ্বায়িত্ব। ১৯৮৪ সাল অবধি পার্টির সভাপতির পদে আসীন থেকে মুলত তরুণদেরকেই পার্টির কাজ ও সিদ্ধান্ত উৎসাহিত করে যান।১৯৮৪ সালে পক্ষাঘাতগ্রস্হ হওয়ার পুর্ব পর্যন্ত এই পদেই আসীন ছিলেন।১৯৯০ সালের ৩১ ডিসেম্বর মৃত্যুর পুর্ব পর্যন্ত সিপিবি সভাপতি পদে আর কাউকে নির্বাচিত করেননি। সভাপতির আসনটি তার মৃত্যুর পুর্ব পর্যন্ত তার জন্যই উৎসর্গকৃত ছিলো। আঁকড়ে থাকার আকরে বন্দী ছিলেন না মণি সিংহ। দল, রাস্ট্র, সমাজ, সংগঠন – কোথাও অযাচিতভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত কিংবা নিজের হাতে কর্তৃত্ব রেখে চলতে চাননি তিনি।

ব্রিটিশ হতে বাংলাদেশ। ইতিহাসের প্রতিটি ঘটনার বাঁকে কমরেড মণি সিংহ। কখনও সরব কখনও নীরব। স্বল্প পরিসরে এই মহান জীবন তুলে ধরা অসম্ভব। আদর্শ আর সংগ্রাম ছাড়া কোন কিছুর স্হান ছিলো না মণিরাজের জীবনে।ছিলো জন্মভুমি ছিলো মানুষ, গরিব মানুষ।

কমরেড মণি সিংহের স্হান হয়নি বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকে। অথচ ভাষা আন্দোলন ছিলো তার রাজনৈতিক জীবনের বড় সফলতা।যদি মণি সিংহের দেশপ্রেম,সংগ্রাম আর বিপ্লবী জীবন জানতে পারতো এ দেশের শিশু কিশোর তরুণরা তাহলে হয়তো কদর্যতার আবরণে ঢাকা রাজনীতিকের স্হান হতো না – বাংলাদেশে।

মণি সিংহের মতন সুর্য সন্তানদের যে দেশ যে সমাজ মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হয়, সে দেশ সে সমাজের আকাশে কখনও সুর্য ওঠে না, অন্ধকার আকাশে নক্ষত্রেরা জ্বলে ওঠে না, চাঁদও আলো দেয় না।

কমরেড মণি সিংহের মহাপ্রয়ান দিবসে তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।।

রুস্তম আলী খোকন: কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please Disable Your Ad Blocker.