জাতীয়

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভর্তি হওয়া নবীন জুম্ম শিক্ষার্থীদের পিসিপি’র অভিনন্দন:

‘আত্মকেন্দ্রিকতা, দ্যেদুল্যমানতা ও সংকীর্ণতাকে’ পরিহার করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনে সামিল হওয়ার আহ্বান সংগঠনটির

আইপিনিউজ ডেক্স(ঢাকা): পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে যারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে (২০২১-২২ সেশনে) ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন সেইসব জুম্ম শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ। গতকাল এক বার্তায় এই অভিনন্দন জানায় সংগঠনটি।

অভিনন্দন বার্তায় সংগঠনটি বলছে, ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় হবে স্বায়ত্বশাসিত এবং এখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে।’ কার্ডিনাল জন হেনরি নিউম্যানের ভাষায় ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে চেতনা ও বুদ্ধিমত্তার নিরাপদ পদচারণ নিশ্চিত হবে। জ্ঞানের সঙ্গে জ্ঞানের, চিন্তার সঙ্গে চিন্তার, ধারণার সঙ্গে ধারণার দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীর আগ্রহ ও অনুসন্ধিৎসা উজ্জীবিত হবে। চিন্তা, সৃষ্টি ও আবিষ্কারগুলো ক্রমাগত পরিশীলিত হয়ে উঠবে।’

বিজ্ঞাপণ

মূলত বিশ্ববিদ্যালয় হলো একটি জ্ঞানচর্চা ও প্রসার এবং জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্র দাবী করে সংগঠনটি অভিনন্দন বার্তায় উল্লেখ করে যে, জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় আপনাদের স্বাচ্ছন্দ্য পদচারণা স্বীয় মেধাকে যেমন ক্ষুরধার করবে, ঠিক তেমনি নিজ ভূমি, নিজ সত্ত্বাকে স্বমহিমায় পরিচিত করে তুলবে। বর্তমান বিশ্ব হচ্ছে প্রযুক্তির যুগ, যুক্তিভিত্তিক আধুনিক যুগ। বর্তমান সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য বর্তমান ছাত্র সমাজকে প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ হিসেবে গড়ে উঠতে হবে, যুক্তিশীল মানবিক মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে হবে। নিপীড়িত জাতির প্রতিনিধিত্বকারী ছাত্র সমাজকে ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে সামগ্রিক সমাজের স্বার্থকে দেখতে হবে।

সত্তর দশকে ড. রামেন্দু শেখর দেওয়ান বিলাসী জীবনকে প্রত্যাখান করে জুম্ম জনগণের মুক্তির জন্য তাঁর প্রবাস জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন উল্লেখ করে অভিননন্দন বার্তায় বলা হয়, ….. বর্তমান ছাত্র সমাজকেও স্রােতের বিপরীতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞান উৎপাদনের পাশাপাশি যুক্তিশীল মানবিক মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে হবে এবং সামগ্রিক স্বার্থের তাগিদে নিজিকে বিলিয়ে দেয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্পনের মাধ্যমে আপনারা জ্ঞানার্জন ও জ্ঞান চর্চার সীমাহীন ক্ষেত্র লাভ করেছেন। সীমাহীন এই ক্ষেত্র থেকে বিশ্বমানের শিক্ষা অর্জন করে অর্জিত এই জ্ঞানকে সমাজ উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজে লাগাতে হবে।

উক্ত বার্তায় আরো বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় হলো জাতি বিনির্মাণে কারিগর তৈরির কারখানা এবং শিক্ষার্থীরাই হলো জাতির ভবিষ্যত কান্ডারী। বিশেষত, ভারতীয় উপমহাদেশে উপনিবেশিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন, আত্মনিয়ন্ত্রাধিকারের আন্দোলনসহ প্রত্যেক গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছিল এবং এখনও করে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সত্তর দশকে রাষ্ট্রীয় শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা সমাজসংস্কার আন্দোলন ও আত্মনিয়ন্ত্রাণিধকার আন্দোলন, নব্বই দশকে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রথম সারিতে থেকে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছিলেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল জুম্ম শিক্ষার্থীরাই। সেই থেকে আজ অবধি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সমাজের স্রােতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে জুম্ম জনগণের জাতিগত অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলনে কান্ডারীর ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপণ

স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকেই বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী আদিবাসী জনগণের জাতিগত অস্তিত্বকে অস্বীকার করে চলছে উল্লেখ করে আরো বলা হয় যে, হাজারো জুম্ম জনগণের রক্ত ও ঘামের বদৌলতে অর্জিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’কে আজ পদলিত করা হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক ধারাগুলোকে অবাস্তবায়িত রেখে ও লঙ্ঘন করে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসন জারি রয়েছে, সামরিক-বেসামরিক বহিরাগতদের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম জুড়ে ভূমি বেদখলের মহোৎসব চলছে, পাহাড়ে ইসলামিকরণ প্রক্রিয়া জোরদারকরণ, জুম্ম জনগণকে বিভক্ত করার ষড়যন্ত্র জোরদারকরণ, জুম্মজনগণের জুমনির্ভর আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি ধ্বংসের ষড়যন্ত্র জোরদারকরণ, পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষার মেরুদ- ভেঙে ফেলার পায়তারা ব্যাপক পরিসরে বাস্তবায়িত হচ্ছে; ফলশ্রুতিতে জুম্ম জনগণ আজ প্রায় অস্তিত্বহীন। মোটকথা পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণকে আজ এক শ্বাসরূদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য করা হচ্ছে।

মূলত শিক্ষা, সংহতি, সাম্য ও প্রগতি – এই চার মূলনীতি ও মানবতাবাদকে আদর্শ হিসেবে ধারণ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, সারাদেশে বিজ্ঞানভিত্তিক ও অসাম্প্রায়িক শিক্ষা চালু, বিশ্ববিদ্যালয়সূহে মুক্তবুদ্ধি চর্চা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করা, পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগসহ সকল আদিবাসীদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালু ও নিশ্চিত করা, উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে আদিবাসীদের জন্য ৫% কোটা নিশ্চিত করাসহ তার গঠনতান্ত্রিক পাঁচদফা দাবি আদায়ে লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। উক্ত সংগ্রামে নবীন জুম্ম শিক্ষার্থীদের ঝাপিয়ে পড়ার আহ্বানও জানানো হয় উক্ত বার্তায়।

এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে শাসকগোষ্ঠীর অব্যাহতভাবে চুক্তি পরিপন্থি কার্যক্রম, উন্নয়নের নামে ভূমি বেদখল ও উচ্ছেদকরণ, ধর্মান্তরণকরণ ও ইসলামিকরণ, নারী ধর্ষণ, চুক্তিবিরোধী ও জুম্মস্বার্থ পরিপন্থি সশস্ত্র দল সৃষ্টি, সামাজিক অবক্ষয় রোধসহ শোষণ নিপীড়ন থেকে মুক্তির জন্য রাজনৈতিক আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার কোন বিকল্প নেই। বর্তমান ছাত্র সমাজকেও এই সত্য উপলদ্ধি করে তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান সামগ্রিক বাস্তবতায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে ২০২১-২০২২ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়া জুম্ম শিক্ষার্থীদের ‘আত্মকেন্দ্রিকতা, দ্যেদুল্যমানতা ও সংকীর্ণতাকে’ পরিহার করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনে সামিল হওয়ার জন্য আহ্বানও জানায় সংগঠনটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please Disable Your Ad Blocker.