মতামত ও বিশ্লেষণ

বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা: ইতিহাসের এক অনিবার্য নির্মাণ- সতেজ চাকমা

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’কে নিয়ে একটি ভিন্নধর্মী বিশ্লেষণ:

সমকালে আমরা যে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’কে নিয়ে আলাপ তুলছি তাঁর নির্মাণ ইতিহাস বিচারে অনিবার্য বলে আমার ধারণা। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা তাঁর জীবনের যে সময়টা কাটিয়েছেন সে সময়ে আমরা দেখি বৈশ্বিক ও স্থানীয় বাস্তবতায় নানা ধরণের ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে, বাঁক বদল হচ্ছে মানব ইতিহাসের। ফলে বাঁক বদলের যুগান্তরে অনিবার্যভাবে তাঁর আপন মহিমা নিয়ে বেড়িয়ে এসেছে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। ইতিহাসের ভেতর দিয়ে কীভাবে একজন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা নির্মিত হন তাঁর নাতিদীর্ঘ বিশ্লেষণই চলটি লেখার চৌহদ্দি।

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা যে সময়ে পাহাড়ে জন্ম নেন সেই ১৯৩৯ সালে পুরো ভারতীয় উপমহাদেশে চলছে বাঁক বদলের হাওয়া। যেটাকে আমরা একটা ‘ট্রানজিশনাল প্যরিয়ড’ বলতে পারি। অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী বাজছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা। রাশিয়ার সাথে করা অনাক্রমণ চুক্তি ভেঙ্গে আক্রমণের উদ্যোগ নিচ্ছে জায়ান্ট হিটলার। এইসব যুদ্ধায়োজনে নিবিরভাবে যুক্ত ব্রিটেন ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের সেসময়কার হর্তাকর্তা। ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে তখন চলছে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন। ভারতছাড় আন্দোলনের হাওয়া তখন আকাশে বাতাসে। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার জন্মের বছরের পরের বছর ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ এই উপমহাদেশের অন্যতম জাতীয় নেতা তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শের এ বাংলা একে ফজলুল হক অবিভক্ত পাঞ্জারের লাহোরে উত্থাপন করলেন ‘লাহোর প্রস্তাব’। যে প্রস্তাবটি পাকিস্তান প্রস্তাব নামেও অভিহিত। মূলত মুসলমানদের অধিকার ও স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করাই ছিল এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য।

বিজ্ঞাপণ

লাহোর প্রস্তাবের মূল বিষয়গুলো নিয়ে যদি সামান্য দৃষ্টি দিই তাহলে আমরা দেখি সেখানে ভারতের পশ্চিম ও পূর্বভাগের মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে নিয়ে মুসলমানদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হচ্ছে সেখানে। তাছাড়া এসব স্বাধীন রাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যসমূহ স্বায়ত্বশাসিত ও সার্বভৌম হবে বলেও প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্’র দ্বিজাতি তত্তে¡র প্রচার তো আছেই।

এমনি এক দোলাচলের মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিধ্বংসী আয়োজনও এই জনপদকে নাড়া দিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বিশ্বব্যাপী মানবিক বিপর্যয় জুম পাহাড়কেও স্পর্শ করবে না তা হয়? আকার ও প্রভাব বলয়ের বিচারে চলমান ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ সামান্য হলেও এখন দেশের মানুষের জনজীবনে কী পরিমাণ প্রভ্বা রাখছে তা বিচার করলেই তো তৎসময়ের জীবনকে খুঁজে পাওয়া যায়। তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম তখনও বিট্রিশদের ‘এক্সক্লুশন পলিসি’ দিয়ে শাসিত হচ্ছে। ১৯০০ সালের শাসনবিধি দিয়ে শাসিত পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসনিক স্বতন্ত্র কাঠামো এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বাতন্ত্র ব্যবস্থা হয়তোবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভৎসতাকে সেভাবে অনুভব করতে দেয়নি। যদিওবা পাহাড়ে গুর্খা রেজিমেন্ট এর উপস্থিতির খবর পাওয়া যায়, তবুও পাহাড়ের সাধারণ মানুষের অংশগ্রহন সেভাবে পাওয়া যায় না। নিজেদের স্বতন্ত্র জীবনবোধই চালিকা শক্তি ছিল বলে আমার মত। যার কারণে তৎসময়েও গোয়াল ভরা গরু, গোলা ভরা ধান, মাঠ ভরা ফসল আর মৌসুমভরা ফলাদি’র কথা আমরা পাহাড়ের বয়ো:বৃদ্ধদের মুখে মুখে এখনও শুনি। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’র বড়বোন জ্যোতিপ্রভা লারমা মিনু’র স্মৃতিচারণ মূলক লেখায় তাই এই বক্তব্যের সত্যতা মেলে (পৃষ্ঠা ৫৭, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’র জীবন ও সংগ্রাম)। যুদ্ধে পাহাড়ের সাধারণ মানুষের সেরকম অংশগ্রহন না থাকলেও কিংবা যেরকম প্রভাব জনজীবনের পড়বার কথা ছিল তা স্বতন্ত্র প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর দেওয়ালকে সেভাবে ভেদ করতে না পারলেও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে তা স্পর্শ করেছে বলে আমার ধারণা। কেননা, তৎসময়ের এম এন লারমা যে পরিবারে বেড়ে উঠেছেন তা ছিল শিক্ষিত একটি পরিবার। তাঁর বাবা চিত্তকিশোর চাকমা ছিলেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক আর জেঠা কৃষ্ণকিশোর চাকমা ছিলেন বিদ্যালয় পরিদর্শক। কাজেই স্বাভাবিকভাবেই প্রগতির চর্চা ছিল সেই পরিবারে। তাই প্রবলভাবে পাঠভ্যাসী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা সংস্পর্শ পেয়েছেন তৎসময়ে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ছোটদের জনপ্রিয় পত্রিকা ‘শুকতারা’ ও ‘মাসিক বসুমতি’ পত্রিকাসহ আরো নানা বই ও পত্র-পত্রিকার। জ্যোতিপ্রভা লারমা মিনু’র স্মৃতিচারণমূলক লেখায় জানা যায়, বাবা চিত্তকিশোর চাকমা সেসময়ে কলকাতা থেকে ডাকযোগে এসকল পত্রিকা ও নানা বই সংগ্রহ করে দিতেন নিয়মিত।

বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা

মাসিক বসুমতি পত্রিকাটি ছিল মূলত দেশীয় কৃষ্টি ও ঐতিহ্য রক্ষায় সচেতন একদল সাহিত্যসেবী, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রকাশনা। ইংরেজ অধিকৃত ভারতবর্ষে পরাধীনতার গ্লানিতে নিমজ্জ্বিত ভারতীয়দের নানা ক্ষোভ, বেদনা, স্বদেশ প্রেমের নানা আখ্যান, দেশ গঠনের কর্মসূচী ও বিশ্লেষণে ভরপুর ছিল এই পত্রিকাটি। পত্রিকাটি ১৯১৪ সালের ৬ আগষ্ট প্রথম কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বেশ পুরনো একটি পত্রিকার নিয়মিত পাঠক তৎসময়ে কিশোর ও তরুণ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’কে নিশ্চয় সমকালীন নানা বিষয় আলোড়িত করেছিল নানাভাবে।

বিজ্ঞাপণ

বৈশ্বিক যত ঘটনা:
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতি ঘটলেও কিছু যুগান্তকারী ঘটনা ও বৈশ্বিক নানা কর্মসূচী ছিল এই সময়ের বেশ সাড়া জাগানো। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা যে ‘আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার’ (self-determination) এর কথা পাহাড়ের জুম্ম জনগণকে শুনিয়েছেন তার ধারণা (Concept) নিয়ে আলাপচারিতা শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে। রুশ বিপ্লবের সময়ে লেনিনসহ তৎকালীন রুশ নেতারা আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারকে রাজনৈতিক ধারণা হিসেবে নিজেদের কর্মসূচীতে অর্ন্তভুক্ত করেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন ১৯১৮ সালে ইউরোপে শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রণীত চৌদ্দ দফা’তেও এই ধারণা’কে ফুটিয়ে তোলেন, যাতে এই আত্মনিয়ন্ত্রণের ধারণার প্রচার ও প্রসার বেশী হয়। অর্থাৎ মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা জন্মের দুই দশক আগেই এই ধারণাগুলো বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আলোচিত হতে থাকে।

অন্যদিকে আমরা দেখতে পায় যে, ১৯৪১ সালের আগষ্ট মাসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ঘোষিত বিখ্যাত আটলান্টিক সনদ ( Atlantic Charter) এ সার্বভৌমত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণের ধারণাগুলো পুনরায় তুলে ধরেন। পরবর্তীতে শান্তির খোঁজে প্রতিষ্ঠিত হল জাতিসংঘ। এছাড়াও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী অনুপনিবেশিকরণ প্রক্রিয়া এবং এক একে নানা জাতি স্বাধীন হওয়ার ঘটনাসমূহের সাথেই বেড়ে উঠছিলেন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। ১৯৪৯ সালে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পরাজয় ঘটিয়ে এশিয়ার উত্থায় ঘটেছে নতুন একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র- চীনের। কমরেড মাও সেতুং চীন বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়ে শিয়াং কাইশেক ও তাঁর সহায়তাকারী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে পারজিত করে প্রতিষ্ঠা করলেন বিশাল ভ‚খন্ডের চীন। ফলে এ ধরণের সাড়া জাগানো ঘটনাগুলো মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’র চোখের সামনেই ঘটে চলছিল অনবরত। ফলে ১৯৫৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রথম পাহাড়ী ছাত্র সম্মেলন আয়োজনে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে দেখতে পাচ্ছি নেতৃত্বে ভ‚মিকায়। আমি নিশ্চিত, তাঁর সমসাময়িক বৈশ্বিক ঘটনাগুলোয় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’কে উদ্ধুদ্ধ করেছে স্বজাত্য বোধ চেতনায় এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের দৃঢ সংকল্পে।

দেশভাগ, বঞ্চনা ও উচ্ছেদের যন্ত্রণা:

সেই ১৯৪০ ও ৫০ এর দশকেই তো কত ধরণের বৈশ্বিক পরিবর্তন তিনি লক্ষ করলেন। পঞ্চাশের দশকের শেষে ষাটের দশকের শুরুর দিকে নিজের বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদের যন্ত্রণা তরুণ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে নির্মাণ করল বিপ্লবী বেশে। এর মধ্যে হয়ে গেল দেশ ভাগ। ১৯৪৭ সালে চোখের সামনে জন্মলাভ করল ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের। চলে গেল বৃটিশ। অন্যদিকে ৯৮% অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট পাকিস্তানের সাথে জুড়ে দেওয়া সহ ব্রিটিশ-ভারতীয় শাসকদের নানা অবিচারের ঘটনাগুলো মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’র মধ্যে গভীরভাবে রেখাপাত করবে নিশ্চয়।

কাজেই দেশভাগের মত বিশাল ঘটনা এবং ১৯৬০ এর দিকে কাপ্তাই বাঁধের ভয়াবহতা তরুণ লারমাকে এই উপলব্ধি করাতে ভুল করেনি যে, ‘কাপ্তাই বাঁধ জুম্ম জনগণের মরণ ফাঁদ’। মার্কিন কোম্পানির টাকায় কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দিয়ে তৈরী হবে কৃত্রিম লেক। ডুবে যাবে জনপদ। তারই বিরুদ্ধে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’র রুখে দাঁড়ানো। আমার এ গল্প শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বর্তমান সভাপতি ও আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা’র কাছ থেকে। তৎসময়ে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’র আহ্বানে উদ্ধুদ্ধ হয়ে সন্তু লারমাসহ গুটিকয়েক তরুণ পাহাড়ের গ্রামে গ্রামে কাপ্তাই বাঁধের বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করার জন্য তাঁরা লিফলেট বিলি করেছিলেন। পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে এই প্রচারণায় অনেক সামন্তীয় প্রথাগত নেতৃত্ব (কার্বারী হ্যাডম্যান) মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাসহ অন্যান্য সহযোদ্ধা তরুণদের ‘বোকা’ বলেও উপহাস করেছিল। আবার অনেকে আড়চোখে তাকিয়ে শাসকগোষ্ঠীর দালালিতেও লিপ্ত ছিল।

এ বিষয়টি উল্লেখ না করে উপায় নেই যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম তখন ছিল সামন্তীয় সমাজ কাঠামোতে নিমজ্জিত। সার্কেল চীফ (রাজা), হ্যাডম্যান, কার্বারী, রাজার নিয়োজিত দেওয়ান, তালুকদার ও খীসাদের চরম দাপট। এই দাপটে সাধারণ পাহাড়ীরা পড়ালেখা থেকে শুরু করে সামর্থ থাকলেও ভালো বাড়ী তৈরীসহ নানা সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এমনি একটা সমাজ ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’র উত্থানকে যদি কল্পনা করি তবে ১৯৪১-১৯৪৫ এর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ মানবিক সংকট, ১৯৪৭ এর দেশভাগ এবং অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম অধ্যুষিত পাকিস্তানে অন্তভর্‚ক্তি, ১৯৬০ এর দশকের কাপ্তাই বাঁধ- এই বাঁক বদলকারী ঘটনাগুলোই মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’কে তরুণ বিপ্লবী হিসাবে নির্মাণ করেছে অনিবার্যভাবে। তাঁর বয়স যখন ২০ তখনই তাকে ছাড়তে হল তাঁর বেড়ে ওঠা মাওরুম আদাম(গ্রাম)। একজন মানুষ যেভাবে তাঁর শৈশব কাটিয়ে বেড়ে উঠেছে নিশ্চয় সেখানকার ভ‚গৌল, পরিবেশ ও অন্যান্য বাস্তবতা তাকে সেভাবেই তৈরী করে এবং সত্যিকার অর্থে মাতৃ ‘ভ‚মি’ বলতে যেটাকে বোঝায় সে বেড়ে ওঠার জায়গাকেই সে আপন করে নিতে শেখে। কিন্তু বয়স বিশ না পেরোতেই মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’কে ছাড়তে হল তার সেই মাতৃভ‚মিকে। ফলে তাঁর মধ্যে এই মাটির প্রতি যে মায়া সেটা আরো গাঢ় হয়ে গ্রথিত হল হৃদয়ের গহীনে। বাঁধের পানি যখন বাড়ছে, গ্রাম যখন ছাড়তে হচ্ছে ঠিক সেই ক্ষণে তাঁর নিজ বাড়ীর উঠান থেকে তাই একমুঠো মাটি এনে তার বড়বোন জ্যোতিপ্রভা লারমা মিনু’কে দেওয়ার এবং সেই মাটি সংরক্ষণের কথা আমরা শুনি। এর মধ্যে সে মাটির প্রতি তাঁর যে ভরা আবেগ তারই প্রমাণ দেয়। ফলে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা যখন নিজ বাস্তুভ‚মি থেকে বিতাড়িত হচ্ছেন তখন ঘুরে না দাঁড়িয়ে, প্রতিবাদ না করে, প্রতিরোধের অগ্নিমন্ত্রে দিক্ষীত না হয়ে কী আর কোনে বিকল্প থাকতে পারে?

তাইতো কাপ্তাই বাঁধের বিরুদ্ধে জুম্ম তরুণদের সংগঠিত করতে দেখছি আমরা। ১৯৫৭ সালে পাহাড়ী ছাত্রদের প্রথম ছাত্র সম্মেলনে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’র সম্পৃক্ততা ছিল চোখে পড়ার মত। অন্যদিকে তাঁর অব্যাহত প্রতিবাদের দরুণ ১৯৬৪ সালে নিবর্তনমূলক আইনে তাকে গ্রেফতার হতে দেখছি আমরা।

মুক্তিযুদ্ধ ও আত্মপরিচয়ের বঞ্চনা:
কাপ্তাই বাঁধ। যে বাঁধ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’কে করেছে ছন্নছাড়া, গৃহহারা, বাস্তুহারা। বোধহয় এর পরবর্তী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’র যাযাবর জীবনের সূত্রপাত। ঘরহীন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা তাঁর জীবনে আর কোথাও থিতু হতে পেরেছিলেন বলে আমরা শুনি নি। পুরো জুম পাহাড়ের জুম্ম জনমানুষের জন্য জীবনকে সঁপে দিলেন। একে একে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেন। একঝাঁক তরুণকে উদ্ধুদ্ধ করলেন সংগ্রামী ও জাতীয়তাবাদী মন্ত্রে। দিলেন নতুন জাতীয়তাবাদের ধারণা। জুম্ম জাতীয়বাদ বলে নতুন এক জাতীয়তাবাদের কথা পরিচয় করিয়ে দিলেন জুম জনপদে। এর পেছনে আছে বঞ্চনার ব্যাথা। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’রা সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার প্রয়াস চালালেও তৎকালীন স্থানীয় আওয়ামী নেতৃত্ব তাঁদেরকে অংশ নিতে দেননি বলে আমরা জানি। অন্যদিকে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি বিজয় অর্জন করলেন। পরে দেশ স্বাধীন হলে, যোগ দিলেন গণপরিষদে। সেখানে নবসৃষ্ট একটি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক সভায় বারংবার উচ্চারণ করলেন মেহনতী মানুষ ও প্রান্তজনের নানা আহাজারি। মেথর, পতিতা, বেদে, জেলে, কৃষক, বাঙালি ভিন্ন অপরাপর আদিবাসী মানুষ, ভবঘুরে থেকে শুরু করে সমস্ত প্রান্তজনের জন্য কল্যাণকর ও সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার সাম্যের ও সার্বজনীন রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা তিনি উত্থাপন করলেন সংসদীয় সভায়। কিন্তু জাত্যভিম্যানের ঘোরে তাচ্ছিল্ল্য করা হল মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে। নিজের আত্মপরিচয় যখন বাঙালিত্বের চরম জাত্যভিম্যানের অহংকারের কাছে বিলীন হতে দেখলেন তখন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’কে আবারও তাড়িত করল নতুন করে ভাবতে। দেশের সকল জনগণকে জাতি হিসেবে ‘বাঙালি’ করা হলে তিনি সংসদ থেকে ওয়াক-আউট করলেন। কিন্তু বাঙালি জাতীয়বাদে টইটুম্বুর তৎকালীন অধিপতি শাসকবর্গ কী আর মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’র এই প্রতিবাদকে কানে তোলে?
ফলে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা আবার ফিরে গেলেন তাঁর জুম জনপদে। প্রতিষ্ঠা করলেন নিজের লড়াইয়ের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সংগঠন। তবুও হাল ছাড়েননি। বঙ্গুবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাকশালে যোগদান করেছিলেন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। শর্ত ছিল পাহাড়ের স্বায়ত্বশাসন মেনে নেবে বাকশালের নেতৃত্ব। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্টের নির্মম ঘটনা পুরো বাংলাদেশকে ঠেলে দিল অন্ধকার এক গহŸরে। জলপাইয়ের দাপটে ছেয়ে গেল পুরো দেশ। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’র পাহাড়েও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে সেনা কর্তৃত্ব। অবাধ জুমিয়া জীবন নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে চেক পোস্টের অঙ্গুলিতে। যা এখনো চলমান। যার ফলে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বেছে নিলেন গেরিলা জীবন। অসংখ্য গেরিলার সাংঘিক উদ্ধোধনে তিনি রাষ্ট্রকে বুঝিয়ে দিলেন যে, যদি রাষ্ট্র তাঁর সন্তানদের আগলে রাখতে ভুল করে তবে অভিমানে, অপমানে তাঁর সন্তানরা জ্বলবেই। পুরো জুম জনপদে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা পদচারণা করলেন গেরিলা পদধ্বনি দিয়ে। পরে ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর বিভেদপন্থী গিরি-প্রকাশ-দেবেন-পলাশ এই চার কুচক্রী এবং দেশি-বিদেশী ষড়যন্ত্রে আট সহযোদ্ধাসহ হত্যা করা হল তাঁকে। কিন্তু মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’র শারিরীক মৃত্যু হলেও তাঁর চেতনা, আদর্শ যে যুগোত্তীর্ণ তা এখন প্রমাণিত।
মাত্র ৪৪ বছরের নাতিদীর্ঘ একটি জীবনে যতগুলো যুগান্তকারী বৈশ্বিক ও স্থানীয় নানা ঘটন অঘটনকে অবলোকনের মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনকে অতিবাহিত করেছেন তা যেন অনিবার্যভাবেই নির্মাণ করেছে একজন বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে। বাস্তুহারা, পরিচয় হারা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা তাই শত বঞ্চনার অগ্নি দহনের শিখায় বিপ্লবী না হয়ে পারেনি। এই মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে লাল সালাম।

*তরুণ লেখক ও আদিবাসী অধিকার কর্মী।

* লেখাটি বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’র ৩৯তম মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণ জাতীয় কমিটি’র স্মরণিকায় প্রকাশিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please Disable Your Ad Blocker.