সাক্ষাৎকার

বাংলাদেশের হয়ে ফুটবল বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন দেখি – মারিয়া মান্দা

বাংলাদেশ অনুর্ধ্ব ১৫ নারী ফুটবল দলের অধিনায়ক মারিয়া মান্দা। ভারতের সীমানা ঘেঁষে প্রত্যন্ত কলসিন্দুর গ্রামের মেয়ে মারিয়া মান্দা বাংলাদেশের নারী ফুটবলে আশার প্রতীক হয়ে উঠছেন দিনকে দিন। ফুটবলার হয়ে উঠবার শুরুর দিনগুলো মসৃন ছিলোনা মোটেও। লড়াই করতে হয়েছে দারিদ্রতার সাথে, লড়াই করতে হয়ছে প্রবল পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পারিপার্শ্বিকতার সাথে। সফল হয়েছেন, কিন্তু এ যাত্রা আরো দীর্ঘ করে তোলার জন্য আরো বহু পথ পাড়ি দিতে হবে। তার অধিনায়কত্বে দলটি সাফ ফুটবলের শিরোপা জয় করেছে, অংশ নিচ্ছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন টুর্নামেন্টে। সম্প্রতি অনন্যা শীর্ষদশ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। বাংলাদেশের নারী ফুটবল মারিয়া মান্দা ও তার দলকে নিয়ে নতুন করে সফল আগামীর স্বপ্ন দেখছেন বললে খুব বেশি বলা হবেনা। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলতে আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম মারিয়া মান্দার সাথে। তিনি আমাদের সাথে কথা বলেছেন, সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতায় জানিয়েছেন আগামী দিনের স্বপ্নযাত্রার কথা।
আইপি নিউজের পক্ষ থেকে সাক্ষাতকার নিয়েছেন শ্যাম সাগর মানকিন।

শ্যাম সাগর মানকিন- কেমন আছেন?
মারিয়া মান্দা- এইতো ভালো আছি।

বিজ্ঞাপণ

শ্যা. সা. মা. – বিশ্বকাপ খেলা চলছে, খেলা দেখছেন নিশ্চয়, কোন দল পছন্দ করেন?
মা. মা. – বিশ্বকাপের খেলা দেখছি। আমার পছন্দের দল হল আর্জেন্টিনা । কিন্তু আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে ভালো ফলাফল করতে পারছেনা। তাদের নিজেদের খেলা দেখাতে পারছেনা বলে আমার মনে হয়। একটা খেলায় ড্র আরেক খেলায় হেরে গেছে তারা। এদিকে বিশ্বকাপে স্পেন, ফ্রান্স সহ কয়েককটা দল অনেক ভালো খেলছে।

শ্যা. সা. মা.– কাদের হাতে বিশ্বকাপ উঠতে পারে বলে অনুমান করছেন?
মা. মা. – যাদের আমরা ভাবছিনা বিশকাপ নিতে পারে তাদের হাতেও এবারের বিশ্বকাপ যেতে পারে বলে আমার মনে হয়। কেননা যে দলগুলো নিয়ে আশাবাদী ছিলাম যেমন ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি তারা খুব একটা ভালো করতে পারছেনা। আর যে দলের কথা হয়তো আমরা ভাবিনাই, সে দলগুলোই ভালো ফলাফল করছে এবারের বিশ্বকাপে।

শ্যা. সা. মা. – আপনার নিজের ফুটবলার হয়ে ওঠার গল্পটা শুনতে চাই…
মা. মা . – ২০১১ সালে প্রাইমারী স্কুল নিয়ে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা গোল্ড কাপ টুর্ণামেন্টে আমি কলসিন্দুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে খেলায় অংশগ্রহন করি। ২০১১-১২ এই দুই বছর আমাদের দল ঢাকা বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হলেও বিভাগীয় পর্যায়ে হেরে যায়। পরে ২০১৩ সালে এসে আমরা বিভাগীয় পর্যায়েও চ্যাম্পিয়ন হই। ২০১৪তে আমি সহ কলসিন্দুরের অনেকেই অনুর্ধ্ব ১৪ জাতীয় দলের ক্যাম্পে ডাক পাই। রাজশাহীতে ফুটবল ক্যাম্পটি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ভালো করার পরই সরাসরি অনুর্ধ্ব ১৫ জাতীয় দলের হয়ে খেলার জন্য দলে সুযোগ পেয়ে যাই। আমার ফুটবলার হয়ে ওঠার গল্পটা এমনই।

বিজ্ঞাপণ

শ্যা. সা. মা. – এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কারো না কারো অনুপ্রেরণা নিশ্চয় ছিলো?
মা. মা. – আমার মা আর মফিজ উদ্দিন স্যার অনুপ্রেরণা দিয়েছে বলেই আমি ফুটবলার হওয়ার দিকে এগিয়ে গেছি। শুরুর দিকে অনেক সময় প্র্যাকটিসে যেতে অলস লাগতো, ভালো লাগতোনা। তখন মফিজ স্যার ফোন দিয়ে আমার খোঁজ নিতেন, প্র্যাকটিসে যেতে বলতেন। কোন কোন সময় যখন আমার একদমই যেতে ইচ্ছে করতোনা তখন মা আমাকে বারবার বলতেন প্র্যাকটিসে যেতে, অনেক সময় জোর করেও পাঠিয়ে দিতেন। মা আমাকে অনেক উৎসাহ দিয়েছেন ফুটবল খেলতে।

শ্যা. সা. মা. – ফুটবল খেলতে গিয়ে আশেপাশের মানুষের কাছে কেমন প্রতিক্রিয়া পেয়েছিলেন শুরুর দিকে?
মা. মা. – যখন মাঠে খেলতে যেতাম, প্র্যাকটিস করতে যেতাম তখন গ্রামের অনেককেই বলতে শুনেছি মেয়েরা তো ফুটবল খেলেনা। মেয়েরা কেনো হাফপ্যান্ট পড়ে ফুটবল খেলবে এরকম নানান কথাও শোনাতো। আর অনেকেই মাকে গিয়ে বলতো আপনার মেয়েকে কেনো ফুটবল খেলতে দিচ্ছেন? ফুটবলতো ছেলেদের খেলা । এরকম নানা কথা শুনতে হয়েছে শুরুর দিকে। তখন অনেক কষ্ট লাগতো। আমরা মফিজ স্যার কে সেগুলো বলতাম। তখন স্যার আমাদের বলতেন, লোকে কে কি বললো তাতে কান দেয়ার প্রয়োজন নেই। তুমি তোমার মতন খেলে যাও, একদিন দেখবে নিজের জন্য, দেশের জন্য, মানুষের জন্য ভালো কিছু করতে পারলে লোকজন তোমাকে সন্মান করবে।

শ্যা. সা. মা. – এখন লোকজনের প্রতিক্রিয়া কেমন?
মা. মা. – ভালো করার পর এখন এলাকার সবাই চিনে, দেশের মানুষ সবাই চিনে। এখন সন্মান করে অনেক আর অনেকেই বলে তোমরা অনেক ভালো করছো দেশের জন্য সুনাম বয়ে নিয়ে আসছো। তোমরা আমাদের গর্ব, তোমরাই আমাদের আগামী দিনের ভবিষ্যত। তোমরা এভাবেই চালিয়ে যাও, দেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে নিয়ে আসো। আমাদের দোয়া সবসময় থাকবে। আগে অনেকেই অনেক কিছু বলতো এখন বরং আরো উৎসাহিত করে। লোকের কথা শুনে বসে থাকলে হয়তো এই পরিবর্তন হতোনা।

শ্যা. সা. মা. – আপনাকে যদি ফুটবলার হিসেবে নিজেকে মূল্যায়ন করতে বলি কি বলবেন?
মা. মা. – আমার খেলা দেখে আমার কোচ বুঝতে পারে আমি খারাপ খেলছি কি ভালো খেলছি, তখন তিনি আমাকে আমার দূর্বলতা গুলো বলে দেন। আর নিজে থেকে যদি ভালো খেলতে চাই, সেদিন ভালো খেলতে পারি। কিন্তু ক্লান্ত হয়ে পড়লে নিজের খেলাটা আর খেলতে পারিনা।

শ্যা. সা. মা. – কাদের খেলা দেখে ফুটবল খেলতে অনুপ্রাণিত হন?
মা. মা. – মেসি রোনালদো নেইমার এদের খেলা দেখে অনুপ্রাণিত হই। তাদের খেলা দেখে মনে মনে তাদের মতন খেলার ইচ্ছে জাগে। ব্রাজিলের নারী ফুটবলার মার্তার খেলা আমার অনেক ভালো লাগে। সেও ব্রাজিলের জাতীয় দলের অধিনায়ক ছিলো। তাদের মতন করে খেলতে চাই ভবিষ্যতে।

শ্যা. সা. মা. – বিশ্বকাপে বাংলাদেশের খেলার সম্ভবনা কতটুকু আপনার দিক থেকে কি মনে হয়?
মা. মা. – চেষ্টা করে যাচ্ছি আমরা। এখনো অনুর্ধ্ব ১৫, ১৬ সিনিয়র সাফ খেলাগুলো রয়েছে। সেগুলোতে ভালো ফল করার জন্য চেষ্টা করছি। আমরাও চাই বাংলাদেশের নারী ফুটবলাররা হিসেবে বিশ্বের অন্যান্য দলের মতন যেন বিশ্বকাপে খেলতে পারি। সেভাবেই নিজেদের প্রস্তুতিটাও নিচ্ছি আমরা। বাকিটা দেখা যাক কি হয়।

শ্যা. সা. মা. – কি ধরণের পদক্ষেপ নিলে বাংলাদেশের নারী ফুটবল এগিয়ে যাবে বলে মনে করেন?
মা. মা – ক্লাব লীগ আবার শুরু করা গেলে বাংলাদেশের আনাচে কানাচে যে সব ফুটবল প্রতিভা রয়েছে তারা ঊঠে আসবে বলে মনে করি। আমার কাছে মনে হয় ক্লাব লীগের খেলা ধারাবাহিকভাবে চলা উচিৎ। আমরা খেলছি, কিন্তু বাংলাদেশের এগিয়ে যেতে হলে আরো অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের উঠে আসা প্রয়োজন।

শ্যা. সা. মা. – আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ হিসেবে বাংলাদেশের অনুর্ধ্ব ১৫ জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এটাকে কিভাবে দেখেন?
মা. মা. – আমি গর্বিত। খেলোয়াড় হিসেব সবসময় নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে খেলার চেষ্টা করে যাই। ভালো কিছু করার চেষ্টা করি। দলের সবার চেষ্টায় এবং অধিনায়ক হিসেবে বাংলাদেশের জন্য ভালো কিছু নিয়ে আসতে পারছি এটা অনেক আনন্দের আমার কাছেও।

শ্যা. সা. মা. – কিছুদিন আগে অন্যন্যা শীর্ষদশ পুরস্কার পেলেন, কেমন লাগে?
মা. মা. – খুবই ভালো লাগে। এরকম পুরস্কার আমি কখনো পাইনি, প্রথমবার পেলাম বলে আনন্দটা একটু বেশিই বলা যায়।

শ্যা. সা. মা. – সামনে আপনাদের কি কি গুরুত্বপূর্ণ টুর্ণামেন্ট রয়েছে?
মা. মা – অনুর্ধ্ব ১৫ সাফ অগাস্টে ভুটানে অনুষ্ঠিত হবে। তারপর অনুর্ধ্ব ১৬ বাংলাদেশে, অনুর্ধ্ব ১৮ তাজিকিস্তানে অনুষ্ঠিত হবে এবং তারপর অনুর্ধ্ব ১৯ ও সিনিয়র সাফ ফুটবলের খেলাও রয়েছে।

শ্যা. সা. মা. – আপনার ভবিষ্যত স্বপ্ন কি?
মা. মা. – আপাতত আগামীতে ভালো খেলে যেতে চাই। বিশ্বের বিভিন্ন ক্লাব লীগে খেলা, বাংলাদেশের হয়ে ফুটবল বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন দেখি। শুধু খেলা নিয়েই আপাতত আমার সমস্ত ভাবনা চিন্তা, স্বপ্ন দেখা।

শ্যা. সা. মা. – ভবিষ্যতে যারা ফুটবলার হতে চায়, তাদের জন্য কি ধরণের পরামর্শ দিবেন?
মা. মা. – ফুটবলার যদি কেউ হতে চায়, তবে অনেক ভালো। আমি তাদের উৎসাহিত করতে চাই। প্রতিনিয়ত খেলে যেতে হবে, প্র্যাকটিসের মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। এ জন্য পরিবার, এলাকার লোকজন, শিক্ষকদের ভূমিকা রাখা উচিৎ বলে আমি মনে করি।

শ্যা. সা. মা. – ধন্যবাদ আপনাকে।
মা. মা. – আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।

Back to top button