জাতীয়

পাহাড়ে বিশেষ মহলের দ্বারা আরো কিছু জাতিগত সশস্ত্র দল গঠনের পর্যায়ে: সন্তু লারমা

অস্ত্র দিয়ে পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর ভেতরে বিভেদ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলেও মত দেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

আইপিনিউজ ডেক্স(ঢাকা): পাহাড়ে বিশেষ মহলের দ্বারা আরো কিছু জাতিগত সশস্ত্র দল গঠনের পর্যায়ে আছে বলে অভিযোগ করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা। পাহাড়ে যে সশস্ত্র গ্রুপগুলো আছে তাদের নিয়ে ভালোভাবে বোঝা জরুরী বলেও মনে করেন তিনি। ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৫ বছর: পার্বত্য চট্টগ্রামের টেকসই উন্নয়ন, সংকট ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

সন্তু লারমা আরো বলেন, উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো সুষ্ঠু প্রশাসন, সৃষ্ঠু শাসনতান্ত্রিক শৃংখলা। এই দুটো বিষয় না থাকলে কোনো উন্নয়ন জনগণের কাজে আসে না। আজ পর্যন্ত পাহাড়ে কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প হয়েছে। কিন্তু উক্ত দুটি বিষয়ের অনুপস্থিতির কারণে এসবের কী হয়েছে তা খুঁজে পাওয়া যায় না। পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন বিল্ডিং দেখা যায়, কালভার্ট দেখা যায়। এটা কোনো উন্নয়ন হতে পারে না।

বিজ্ঞাপণ

খাগড়াছড়ির দিঘীনালা থেকে বাঘাইছড়ি হয়ে মাচালং ও সাজেক পর্যন্ত করা পাকা রাস্তা নির্মাণ বিষয়ে তিনি আরো বলেন, এই রাস্তার মধ্য দিয়ে কাচালং ও মাচালং এর রিজার্ভ ফরেষ্ট ধ্বংস করা হয়েছে। কাজেই এই রাস্তা বিশেষ মহলের জন্যই করা হয়েছে এবং সামরিকায়নকে বিস্তার করার জন্যই এই উদ্যোগ বলেও মনে করেন তিনি। পাহাড়ের সামগ্রিক বিষয়ে তরুণ সমাজকে আরো এগিয়ে আসার আহ্বান জানান এই নেতা।

উক্ত আলোচনা সভার আয়োজন করে কাপেং ফাউন্ডেশন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, এএলআরডি ও বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং এর সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য , বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল, এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম প্রমুখ।

আলোচনা সভায় বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারী খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে শান্তিবাহিনীর অস্ত্র সমর্পন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বহরের সাথে উপস্থিত থাকবার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সেখানে দু’পক্ষের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস দেখেছিলাম আজকের ২৫ বছর পরে অনেকটাই তিরোহিত হয়ে গেছে। পার্বত্য চুক্তি নিয়ে কথা বলতে গেলে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ, আঞ্চলিক পরিষদ, ভূমি সমস্যা ও স্থানীয় আদিবাসীদের পুনর্বাসনের কথা বলতে হয়। এখনো অনেক শরনার্থী সীমান্তের ওপারে রয়ে গেছে। কিন্তু তাদেরকে শান্তি ও স্বস্তি দিয়ে তাঁদেরকে এখনো পুনর্বাসন করা হচ্ছে না।

বিজ্ঞাপণ

পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর ভেতরে অস্ত্র দিয়ে বিভেদ সৃষ্টি করা হচ্ছে উল্লেখ করে এই অর্থনীতিবিদ আরো বলেন, এক পক্ষকে দিয়ে আরেক পক্ষের মানবাধিকারকে লঙ্ঘন করা হচ্ছে।সারা বিশ্বের অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, খুবই স্বল্পমেয়াদী ও ক্ষুদ্র চিন্তা থেকে বৃহৎ গোষ্ঠীর স্বার্থের জন্য ক্ষুদ্র গোষ্ঠীকে বিভেদের মধ্যে রাখা হয় । পাহাড়ে জনসংহতি সমিতিকে দুর্বল করার জন্য যা যা করা হচ্ছে তা দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি বয়ে আনবে। তারা দুর্বল হলে বাংলাদেশ দুর্বল হবে। এই সরকারের সময়ে অর্থনীতির অনেক অগ্রগতি হলেও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে বেশ পিছিয়ে পড়েছে। পাহাড়ের সমস্যার ক্ষেত্রে ‘ভাশুর’ এর নাম মুখে নেওয়া যায় না বলেও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল বলেন, রাষ্ট্র এমনি পার্বত্য চুক্তি করেনি। না করে যদি কোনো পথ থাকতো তাহলে রাষ্ট্র এই চুক্তি করতো না। সন্তু লারমারাই এই চুক্তি করতে রাষ্ট্রকে বাধ্য করেছেন। তাছাড়া দেশের ভেতর থেকে একটা চাপ ছিল, বিদেশের চাপ ছিল, যুদ্ধের চাপ ছিল। পাহাড়ের সমস্যাকে বুঝতে হলে পাহাড়ীর চোখ দিয়ে দেখতে হবে। যদি তা না হয় তাহলে তো এই সমস্যাকে বোঝায় যাবে না, অনুধাবনই করা যাবে না। এই রাষ্ট্র দেখে বাঙালির চোখ দিয়ে, মুসলমানের চোখ দিয়ে। তাই এই চুক্তি বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

আলোচনা সভায় মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমা। তিনি বলেন, নিজেদের উন্নয়ন নিজেরাই নির্ধারণ করার লক্ষ্যে চুক্তির মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হলেও এখনো উপর থেকে চাপিয়ে দেয়ার উন্নয়ন ধারা পার্বত্য চট্টগ্রামে বলবৎ রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে যে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে তা অনেকটা জুম্ম স্বার্থ-পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায় যদি সেখানে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর স্বশাসন ও সিদ্ধান্ত-নির্ধারণী অধিকার না থাকে এবং সেই উন্নয়ন কার্যক্রম যদি জুম্ম জনগোষ্টীর সংস্কৃতি ও জীবনধারার উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে থাকে।

আলোচনা সভায় অংশগ্রহনকরীদের একাংশ। ছবি: আইপিনিউজ। 

পল্লব চাকমা আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের সকল আদিবাসীদের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে দেশের আদিবাসী জাতিগোষ্টীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সর্বোপুরী পার্বত্য চট্টগ্রামের যথাযথ উন্নয়ন ও প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সর্বাগ্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার যথাযথ রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানেই এগিয়ে নিতে হবে এবং পার্বত্যবাসীর স্বশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, পার্বত্য চুক্তির ২৫ বছর হয়েছে। এই চুক্তি নিয়ে প্রতিবছর একই কথা বার বার বলতে হচ্ছে। কিন্তু হতাশ হওয়া যাবে না। হতাশার কাছে আমরা আত্মসমর্পন করতে পারি না। এই চুক্তি ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির নয়। রাষ্ট্রের সাথেই  এই চুক্তি হয়েছে। এই রাষ্ট্র আমরাই তৈরী করেছি। কাজেই রাষ্ট্র তার জনগণের সাথে বেঈমানী করতে পারে না। পার্বত্য চুক্তি অনুসারে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির দাবীও তুলেন তিনি। চুক্তি বাস্তবায়নের পথে না হেঁটে চুক্তি বিরোধী কাজগুলোকে পরিপুষ্ঠ করার জন্য সরকারকে নিন্দাও জানান শামসুল হুদা। পাহাড়ে যেসব সেটলার বাঙালিদেরকে পুনর্বাসন করা হয়েছে তাদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে পুনর্বাসনের জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ রাখারও দাবি করেন তিনি।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, সারাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা হচ্ছে। কোনোটারই প্রতিকার আমরা পাচ্ছি না। কিন্তু পাহাড়ে নারীর প্রতি সহিংসতার ধরণটা আলাদা। সেখানে নারীকে টার্গেট করা হয় তাদের ভূমি দখলের জন্য। পাহাড়ে অনেকগুলো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কিন্তু টেকসই উন্নয়ন হচ্ছে না সেখানে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আজকে সকল সূচকে পিছিয়ে আছে তার প্রশ্নও তোলেন তিনি। আমরা যে টেকসই উন্নয়ন বাস্তবায়নের কথা বলি পাহাড়ের আদিবাসীদেরকে পিছিয়ে রেখে  কীভাবে তা সম্ভব। পার্বত্য চুক্তির ২৫ বছর পরে যে পরিবর্তন হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি। পাহাড়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি আমরা যদি দাতা-সংস্থার কাউকে নিয়ে যায় তাহলে অনেক ধরণের প্রশ্নের সম্মুখীন হই। এটাতো হওয়ার কথা ছিল না।

আলোচনায় অংশ নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি জুমলিয়ান আমলাই বলেন,  বর্তমানে বান্দরবানে বম জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বাজার থেকে কিছু ক্রয় করতে পারছে না আর বিক্রিও করতে পারছে না। কুকি-চিন আইনশৃংখলা বাহিনীর সৃষ্টি। এখন শোনা যাচ্ছে তারা আইন রক্ষাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এমনি বাস্তবতায় বম জনগোষ্টীর অনেকেই পাশ্ববর্তী মিজোরামে আশ্রয় নিচ্ছে। সাম্প্রতিক আদমশুমারি অনুযায়ী বম জাতিগোষ্ঠীর সংখ্যা ১৩ হাজার। কিন্তু এই সমস্যার আবর্তে যদি ছয়-সাতশত লোক সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার পর্যায়ে থাকে তাহলে আমাদের কী হবে বলেও প্রশ্ন তোলেন এই আদিবাসী নেতা।

উক্ত আলোচনা সভায় আরো অংশ নেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজল দেবনাথ, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন, ভারত প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থী কল্যান সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্তোষিত চাকমা বকুল, আইনজীবি তন্ময় চাকমা।

Back to top button