মতামত ও বিশ্লেষণ

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৫ বছর উপলক্ষে সম্মিলিত গণমিছিল ও সংহতি সমাবেশের লিখিত বক্তব্য 

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৫ বছর উপলক্ষে আজ ঢাকার শাহবাগে আয়োজিত সম্মিলিত গণমিছিল ও সংহতি সমাবেশের লিখিত বক্তব্য নিচে দেওয়া হলো-

সম্মানিত সুধী,
শুভেচ্ছা জানবেন। আপনারা সকলে অবগত আছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম জুম্ম আদিবাসী অধ্যুষিত বৈচিত্র্যপূর্ণ একটা অঞ্চল। এই অঞ্চলে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাস করে আসছে ১৩ ভাষা-ভাষী ১৪টি আদিবাসী জনগোষ্ঠী। কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে ১৯৭২ সালে সদ্য স্বাধীন দেশের সংবিধান রচনার সময় পার্বত্য আদিবাসীদের জাতিগত পরিচয়কে অস্বীকৃতির মাধ্যমে এই সমৃদ্ধ জাতিসমূহকে রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়। যার ধারাবাহিকতায় এই জাতিসমূহের রাজনৈতিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়। পাশাপাশি নিজেদের স্বকীয় শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিকাশের মাধ্যমে বহুত্ববাদী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় সামিল হওয়া থেকেও ছিটকে পড়ে তারা।

বিজ্ঞাপণ

এমনি বাস্তবতায় দীর্ঘ দুই যুগের অধিক সশস্ত্র সংঘাতের অবসানে ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে তৎকালীন সরকারের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ঐতিহাসিক এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সকলে তখন আশা করেছিল, সাংবিধানিক কাঠামোতে এইসব আদিবাসী জাতিসমূহের স্বাতন্ত্র্য অস্বীকারের মধ্য দিয়ে যে ঐতিহাসিক ভুল এই রাষ্ট্র করেছিল তার কিছুটা হলেও সংশোধন হবে উল্লিখিত চুক্তির মধ্যদিয়ে।

দু:খজনক হলেও সত্য, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ স্বাক্ষরের ২৫ বছর পেরোলেও এই চুক্তির মৌলিক বিষয়সমূহ বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে তার অনন্য বৈশিষ্ট্যসহ সংরক্ষণ ও বিকাশের কাজটি অসম্পূর্ণ থেকে গেছে। পাহাড়ে এখনো উপনিবেশিক কায়দায় পাহাড়ী মানুষের উপর শাসন ও শোষণ অব্যাহত আছে।

সংগ্রামী সচেতন দেশবাসী,
আমরা মনে করি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ার মূল কারণ রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। তাছাড়া পাহাড়ে নিয়োজিত সামরিক ও বেসামরিক আমলা কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখা, কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী, অসাধু ব্যবসায়ী ও ধনীক-বণিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার জন্য নিরাপত্তার নামে জাতিগত সংঘাত জিইয়ে রাখা রয়েছে। ফলে পার্বত্য চুক্তির সফল বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পাহাড়ের জুম্ম জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও তাঁদের স্থানীয় স্বশাসন নিশ্চিত করবার যে অঙ্গীকার ছিল তা বাস্তব রূপ পায়নি। অপরদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের নানা কৌশলে নিয়ন্ত্রণ ও তাঁদের ওপর বৈষম্যপূর্ণ শাসন-শোষণ অব্যাহত রাখতে বিভিন্ন অপকৌশল নেয়া হচ্ছে ক্রমাগত। কার্যত পাহাড়ে এখনো অগণতান্ত্রিক সামরিক শাসন অব্যাহত আছে। দেশের এক দশমাংশ ভূখন্ডকে ক্রমাগত উপনিবেশিক শাসনের মধ্যে রাখা মহান মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার- সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের পরিপন্থি।

বিজ্ঞাপণ

সংগ্রামী নাগরিকবৃন্দ,
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছরে যে অগ্রগতি ঘটেছে তা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ অনেকখানি বঞ্চিত। এই অঞ্চলকে সংঘাতপূর্ণ রেখে গোটা দেশের স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন অসম্ভব। বাংলাদেশ স্বল্প আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত না হওয়ায় সেখানকার মানুষ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতিসহ সামাজিক নানা সূচকে এখনো অন্ধকার গহ্বরেই রয়ে গেছে। এটা যেন অনেকটা প্রদীপের পাদদেশে থাকা অন্ধকারের মত।

অন্যদিকে, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ বাস্তবায়নের যে রাজনৈতিক দায় ও অঙ্গীকার এই রাষ্ট্রের ছিল তাও অনেকটা ভুলুন্ঠিত। রাজনৈতিক দলসমূহও স্ব স্ব নির্বাচনী ইশতেহারে এই চুক্তি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ভুলে গেছে। পাহাড়ের জুম্ম জনগণকে রাষ্ট্রের উন্নয়নের মূলস্রোতধারায়  ফিরিয়ে নিয়ে আসা, রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে উপনিবেশিক আমল থেকে চলে আসা বৈষম্যপূর্ণ অগণতান্ত্রিক শাসন ও সামরিক কর্তৃত্বের বিলোপ সাধনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন জরুরী।

তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে দেশের আপামর জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। সেই সাথে দেশের সকল রাজনৈতিক দল ও জোটসমূহের কর্মসূচীতে এবং নির্বাচনী ইশতেহারে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের দাবীটি অর্ন্তভূক্ত করার জোর দাবী জানাচ্ছি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দ্রুত ও যথাযথ বাস্তবায়ন করে পার্বত্য সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য এই সম্মিলিত গণমিছিল ও সংহতি সমাবেশ থেকে সরকারের নিকট নিম্নোক্ত পাঁচ দফা দাবি পেশ করছি আমরা:

১. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সময়সূচী ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে চুক্তির দ্রুত ও যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে।
২. পাহাড়ে সামরিক কর্তৃত্ব ও পরোক্ষ সামরিক শাসনের স্থায়ী অবসান করতে হবে।

৩. আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদকে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক করা এবং স্থানীয় শাসন নিশ্চিত করতে পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক এসব পরিষদের যথাযথ ক্ষতায়ন করতে হবে।

৪. পার্বত্য ভূমি সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনকে কার্যকরের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ উদ্ভাস্তু ও ভারত প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থীদের পুনর্বাসন করে তাঁদের ভূমি অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

৫. দেশের মূলস্রোতধারার অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও স্থায়িত্বশীল উন্নয়নে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

 

 

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন।
২০ ডিসেম্বর, ২০২২, মঙ্গলবার, ঢাকা থেকে প্রকাশিত ও প্রচারিত।

Back to top button