মতামত ও বিশ্লেষণ

দিন যত যাচ্ছে মনোরঞ্জন হাজংয়ের ন্যায় বিচার প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা বেড়েই চলেছে: সোহেল হাজং

মনোরঞ্জন হাজং গাড়ী চাপায় গুরুতর আহত হওয়ার ৩৫ দিন পার হয়ে গেলেও বিচার কাজে কোনো অগ্রগতি নেই। প্রথমে এ ঘটনায় বনানী থানা মামলা নিতে না চাইলে মিডিয়াতে ব্যাপক প্রচারের পর দুর্ঘটনার ১৪দিন পর মামলা নথিভুক্ত হয় অজ্ঞাত আসামীদের নামে। কিন্তু সে মামলা গ্রহণেরও ২২ দিন পার হয়ে গেলেও ‘তদন্ত কাজ চলছে’- এ রকম কথা ছাড়া মামলার ব্যাপারে পুলিশের কাছ থেকে আর কোনো উদ্যোগের খবর পাওয়া যাচ্ছে না। তদন্ত প্রতিবেদন কবে জমা দেয়া হবে সেটিও সঠিক জানা যাচ্ছে না। গণমাধ্যমও আর আগের মতো এ কেসটি নিয়ে তেমন প্রতিবেদন প্রকাশ করছে না। ভিকটিম মনোরঞ্জন হাজংয়ের মেয়ে সার্জেন্ট মহুয়া হাজং বিভিন্ন চাপের মুখে পড়ে এখন আর মিডিয়ার সামনেও কথা বলতে পারছেন না। এর ফলে মনোরঞ্জনের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির বিষয়টি যেন অনিশ্চয়তার দিকেই ধাবিত হচ্ছে। এমনটিই মনে করছেন ক্ষতিগ্রস্ত মনোরঞ্জন হাজংয়ের পরিবার।

গত ৭ জানুয়ারি শুক্রবার জাতীয় হাজং সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক সোহেল হাজং ঢাকার বারডেম হাসপাতালে মনোরঞ্জন হাজংয়ের অবস্থা দেখতে গেলে পরিবারের সদস্যদের সাথে আলোচনায় এ তথ্যগুলো ওঠে আসে। মনোরঞ্জন হাজংয়ের পরিবারের সদস্যরা আক্ষেপ করে বলেন, এখনও নাকি তদন্ত পুলিশ সেই ঘাতক বিএমডব্লিউ গাড়ীটি খুঁজছে এটি কোথায় আছে! অথচ সেদিন রাতে এই দুর্ঘটনার পর পুলিশ গাড়ীটি চালক ও যাত্রীসহ আটক করেছিলেন যা অনেক লোক দেখেছে এবং এর ভিডিও ফুটেজও আছে। তাহলে এই সত্য ঘটনাটি উদ্ঘাটন করে আসামীকে কেন আইনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে না এ প্রশ্ন তাদের। বিছানায় শায়িত চিকিৎসাধীন মনোরঞ্জন হাজং বলেন, ‌’ভিডিও ফুটেজটিই তো এই ঘটনার একটি বড় সাক্ষী’।

বিজ্ঞাপণ

এসময় মনোরঞ্জন হাজংয়ের কেবিনে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, মেয়ে সার্জেন্ট মহুয়া হাজং, ছেলে মৃত্যুঞ্জয় হাজং, ও মনোরঞ্জনের সহধর্মীনী। তারা সকলেই দিনরাত ধরে চেষ্টা করছেন কীভাবে রোগীকে দ্রুত সুস্থ করে তোলা যায় এই নিয়ে। মা ও ছেলে সবসময় মনোরঞ্জনের সাথে হাসপাতালে থাকেন। মহুয়া হাজং তার ডিউটি শেষ করে প্রতিদিন বাবার সেবায় বাকি সময় কাটান। তবে, পা হারানো মনোরঞ্জন এখন কিছুটা সুস্থ। কথা বলতে পারেন, অল্প খেতে পারেন এবং ধরে বসালে বিছানায় বসতে পারেন। আগামী সোমবার তার ডান পায়ে একটি প্লাস্টার সার্জারি হওয়ার কথা রয়েছে। অবস্থা তৈরি হলে ডান পায়েও একটি অপারেশন করা হবে। এই অবস্থায় রোগীকে সুস্থ হতে আরো ৬-১৮ মাস লাগতে পারে বলে জানালেন মহুয়া হাজং। রোগীর সুস্থতা এবং অপরাধীকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা, দুটোই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে ন্যায় বিচার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা তত কমে যাচ্ছে বলে তারা আশঙ্কা করছেন!

ইতোমধ্যে ডিএমপি মহুয়ার বাবার চিকিৎসার জন্য ৮ লাখ ৪২ হাজার টাকা সহায়তা প্রদান করে যা এই কয়দিনের চিকিৎসা বাবদ প্রায় শেষ হয়ে গেছে এবং আরও দীর্ঘ সময় ধরে তার চিকিৎসার খরচ পরিবারকে চালিয়ে যেতে হবে।

সোহেল হাজং তাদের সাথে সাক্ষাতের সময় বলেন, দেশবাসী এখন গণমাধ্যমের কারণে মনোরঞ্জন হাজংয়ের ব্যাপারটা সম্পর্কে অবগত এবং এ ঘটনার সুবিচারের প্রত্যাশী। এ ঘটনার সাথে এখন আমাদের বিচার বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন এবং সর্বোপরি আমাদের রাষ্টের ইমেজ জড়িত। এতকিছুর পরও যদি মনোরঞ্জন হাজং ন্যায়বিচার না পান তাহলে দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা আরো কমে যাবে।

বিজ্ঞাপণ

তিনি বলেন, একটি ঘটনা যত পুরনো হোক না কেন, ন্যায়বিচারে প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কথা বলে যাওয়া উচিত, গণমাধ্যমকেও এক্ষেত্রে সোচ্চার থাকা উচিত। এ সময় কেবিনে আরো উপস্থিত ছিলেন বাদল হাজং, জয় হাজং, মনিরাজ হাজং ও নারায়ন হাজং।

২ ডিসেম্বর দিবাগত রাত সোয়া ২ টার সময় মনোরঞ্জন হাজং তার কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরার পথে নিজস্ব মোটর সাইকেলযোগে ঢাকার বনানী থানাধীন নিউ এয়ারপোর্ট রোডের চেয়ারম্যান বাড়ীস্থ ইউলুপ এ পৌঁছালে পেছনে এক প্রাইভেট কার (বিএমডব্লিউ, ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৫-৪৯০৬) বেপরোয়া ও দ্রুত গতিতে এসে মোটর সাইকেলের পেছনে ধাক্কা দিলে এ দুর্ঘটনাটি ঘটে। গাড়িচাপায় কোমরের নিচের অংশ থেঁতলে যায় মনোরঞ্জনের। চূর্ণ হয়ে যায় তার মোটরসাইকেলটিও। প্রথমে তাকে পঙ্গু হাসপাতালে নিলে সেখানে দু’দফা অপারেশন করে তার ডান পায়ের হাঁটু থেকে নিচ পর্যন্ত কেটে ফেলা হয়। তার দু’পায়ে আরো কয়েক দফা অপারেশনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু রোগীর শারীরিক অবস্থা অপারেশনের জন্য ফিট না দেখে তাকে বারডেম হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়।

দেরিতে হলেও দেশবাসী বিভিন্ন মাধ্যমে খবর নিয়ে জেনেছে সেই বিএমডব্লিউ প্রাইভেট কারের চালক ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতি মোঃ রেজাউল হাসানের ছেলে সাইফ হাসান (৩২)। এ সময় গাড়িতে তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী অন্তরা ও বন্ধু রোয়াদ হাসান। তারা সবাই ঢাকার গুলশান-১ এর বাসিন্দা। গাড়ীচালক একজন প্রভাবশালী বিচারপতির ছেলে বলে বনানী থানা ঘাতক গাড়ী ও গাড়ী চালককে কিছুক্ষণ রেখে ছেড়ে দিয়েছে। এরপর ভুক্তভোগী মনোরঞ্জন হাজংয়ের মেয়ে সার্জেন্ট মহুয়া হাজংয়ের মামলা নিতে গড়িমসি করেছে বলে গণমাধ্যমে প্রচার হলে এই নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। অবশেষ ১৪ তিন পর মামলা নথিভুক্ত করা হয় কোনো আসামীদের নাম উল্লেখ না করে। আরো শোনা যায়, ভুক্তভোগীর মামলা গ্রহণের ২ দিন পূর্বে উল্টো মনোরঞ্জনের বিরুদ্ধে ঐ গাড়ী চালকের (বিচারপতির ছেলে) দেয়া সাধারণ ডায়েরী গ্রহণ করে বনানী থানা।

সোহেল হাজং, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please Disable Your Ad Blocker.