সোশ্যাল মিডিয়া আইপিনিউজ-

তেলিয়াপাড়া চা বাগানে চা শ্রমিকদের নারী দিবস উদযাপন

“নারীর সুস্বাস্থ্য ও জাগরণ,, এই স্লোগানকে ধারণ করে আজ পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া চা বাগানের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে।

মঙ্গলবার সকাল ১১ টায় ৮ই মার্চ দিবসটি উপলক্ষে একটি বর্ণাঢ্য র ্যালি অনুষ্টিত হয়। দুপুর ১২ টায় বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি জেসমিন আক্তার এর সভাপতিত্বে এবং বাংলাদেশ চা কন্যা নারী সংগঠন এর আহবায়ক ও সদস্য সচিব – খাইরুন আক্তার ও সন্ধ্যা রানী ভৌমিক এর পরিচালনায় শুরু হয় র ্যালি পরবর্তী আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি জেসমিন আক্তার এবং অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র এর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শ্রমিক নেতা – জলি তালুকদার। তিনি তার বক্তব্য বলেন বাংলাদেশের ৮০ ভাগ রপ্তানি আয় করেন বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকরা তারপর সর্বোচ্চ একটি বড় রপ্তানি আয় হয় বাংলাদেশের চা শ্রমিকদের মাধ্যমে অথচ চা শ্রমিকদের মজুরি দেয়া হয় ১২০ টাকা। তিনি আরও বলেন আমি প্রশ্ন রাখতে চাই চা বাগানের মালিক পক্ষ থেকে শুরু করে সরকারের লোকজনের কাছে এমনকি প্রশ্ন রাখতে চাই শ্রম প্রতিমন্ত্রীও প্রধানমন্ত্রীর কাছে আপনারা এই ১২০ টাকা দিয়ে কতক্ষণ চলতে পারবেন নিশ্চিত ৫ মিনিট ও নয় তাহলে একজন চা শ্রমিকের পরিবার এই মজুরি নিয়ে কিভাবে তার জীবন পরিচালিত করবে!!
তিনি দাবি জানান এবং আহবান রাখেন অনতিবিলম্বে চা শ্রমিকের মজুরি নুন্যতম ৫০০ টাকা করা হোক।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বস্তীবাসী ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি কুলসুম বেগম। তিনি তার বক্তব্য বলেন এই দেশকে পরিচালিত করছে শ্রমিক শ্রেণীর মানুষ অথচ তাদেরকই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত অবস্থায় রাখা হয় যেমন রাখা হয়েছে চা শ্রমিক ভাইবোনদেরকেও। তিনি বলেন একদিকে নেই চা শ্রমিকের ভূমির অধিকার অন্যদিকে নিম্ন মজুরি যা দিয়ে কোনভাবে খেয়ে পরে দিন পার করতে হয়। সুতরাং এ থেকে উত্তোরণের জন্য শ্রমিক শ্রেণীর মানুষকে এক হয়ে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশের ৪০ লক্ষ বস্তীবাসীও চা শ্রমিক ভাইবোনদের জন্য রাজপথে নেমে আসবে দাবি আদায়ের জন্য।

আজকের সমাবেশে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক চা শ্রমিক নেতা – নৃপেন পাল। তিনি বলেন আমরা চা শ্রমিক ইউনিয়ন সব সময়েই শ্রমিকের পাশে থেকে তাদের দাবি আদায়ের জন্য জোরালো অবস্থান রাখি এবং তিনি চা কন্যা নারী সংগঠনের ১৩ দফা দাবির প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করেন।

আরও বক্তব্য রাখেন চা শ্রমিক সংগঠক ও মানবাধিকার কর্মী মাহমুদা খাঁ, শ্রমিক নেতা ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি চুনারুঘাট উপজেলার সভাপতি রশিদ আহমেদ, চা শ্রমিক যুবনেতা চা বাগানের জাগরন যুব ফোরাম এর সভপতি – মোহন রবিদাস, মনোবল চা ছাত্র যুব সংগঠনের সভাপতি – রনি যাদব,বাংলাদেশ মুসলিম ছাত্র চা ফোরামের সভাপতি সফররাজ সাজু ও সাংগঠনিক সম্পাদক সাব্বির হোসেন, ছাত্র ইউনিয়ন হবিগঞ্জ জেলা সংসদের দফতর সম্পাদক ইমদাদ মোহাম্মদ, জনপ্রিয় চা শ্রমিকদের প্রত্রিকা চা মজদুর এর সম্পাদক – সীতারাম বীন, সংবাদকর্মী লিটন মুন্ডা, রুমা উরাং, প্রমিলা কর্মকার, বিষ্ণু হাজরা, স্বপন গোয়ালা, লক্ষীকান্ত রায় প্রমূখ।

বাংলাদেশ চা কন্যা নারী সংগঠন এর সদস্য সচিব সন্ধ্যা রাণী ভৌমিক স্বাগত বক্তব্য রাখেন এবং আহবায়ক – খাইরুন আক্তার আন্তর্জাতিক নারী দিবসে চা কন্যা নারী সংগঠনের ১৩ দফা দাবি গুলো উপস্থাপন করেন। ১৩ দফা দাবিগুলো হলো ঃ

১। প্রতিটি চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরী ৫০০ টাকা করতে হবে পাশাপাশি লিপ পাই অতিরিক্ত পাতা তোলার জন্য কেজি প্রতি চা শ্রমিককে ১০ টাকা করে দিতে হবে।
২। নারী চা শ্রমিকের মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস উন্নিত করতে হবে।
৩। প্রতিটি চা বাগানে কমিউনিটি ক্লিনিকে নারীদের জন্য বিনা মূল্যে স্যানিটারী প্যাড প্রদান করতে হবে।
৪। মাসিকের সময়কালীন পাহাড় বেয়ে পাতা তোলা নারীর শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক। তাই প্রতিমাসে মাসিকের সময়কালীন নারী চা শ্রমিককে ২ দিনের ছুটি দিতে হবে।
৫। প্রতিটি চা বাগানে প্রসূতি নারীর জন্য উন্নতমানের নিরাপদ ডেলিভারীর ব্যবস্থা, পুষ্টিকর খাদ্য এবং প্রয়োজনীয় ঔষুধ ও টিকা বিনা মূল্যে সরবরাহ করতে হবে।
৬। গর্ভবর্তী মহিলাসহ যেকোনো রোগীকে হাসপাতালে আনা নেওয়ার জন্য প্রতিটি চা বাগানে নূন্যতম ১ টি এম্বুলেন্স থাকতে হবে।
৭। বর্ষাকালে চা বাগানে নারী শ্রমিকদের বৃষ্টির পানি মাথায় দিয়ে চা পাতা সংগ্রহ করতে হয়। সেজন্য প্রতিটি নারীকে ১টি করে রেইনকোট বরাদ্দ দিতে হবে।
৮। চা বাগানে নারী শ্রমিকদের মধ্যে জরায়ুমুখ নেমে যাওয়া রোগীটি ব্যাপক আকারে রয়েছে। দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব চেপে রাখার ফলে নারীর জরায়ুমুখ নেমে আসে। তাই প্রতিটি সেকশনে নারী শ্রমিকদের জন্য ১ টি করে শৌচাগার এর ব্যবস্থা করতে হবে।
৯। প্রতিটি চা বাগানে বাল্য বিয়ে বন্ধ করতে কার্যক্রম পদক্ষেপ নিতে হবে।
১০। সকল বাগানে নারী সহ চা শ্রমিকদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
১১। প্রতিটি বাগানে নূন্যতম ১ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
১২। ঘরে বাইরে যেকোন প্রকার নারী নির্যাতন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সেই নারী/শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
১৩। চা বাগানের শিক্ষিত নারীকে স্টাফ হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে।

আলোচনা সভা শেষে ও দুপুরের খাবার বিরতির পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের অনুষ্টানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত

Leave a Comment

Your email address will not be published.

আইপিনিউজের সকল তথ্য পেতে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন