আন্তর্জাতিক

জলবায়ু অভিযোজনে অবদানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেল জুরাছড়ির আদিবাসী নারীদের উদ্যোগ

আইপিনিউজ ডেক্স(ঢাকা):  জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় লড়ছে গোটা বিশ্ব। এমনি প্রেক্ষাপটে মিসরের শার্ম আল-শেখ অবকাশ যাপন কেন্দ্রে চলছে বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলন। এই সম্মেলনে গতকাল শনিবার জলবায়ু অভিযোজনে অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপটেশনের (জিসিএ) ‘লোকাল অ্যাডাপটেশন চ্যাম্পিয়নস অ্যাওয়ার্ড’ পেল রাঙ্গামাটির পার্বত্য জেলার জুরাছড়ি উপজেলার আদিবাসী নারীদের পানি সরবরাহের একটি উদ্যোগ। মূলত প্রত্যন্ত অঞ্চলের আদিবাসী নারীদের উদ্যোগে পৃষ্ঠপোষকতা করে এ পুরস্কার পেল পার্বত্য চুক্তির মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ।

জানা যায়, বিশ্বের ১৭০টি দেশের মধ্যে থেকে ৪টি দেশের ৪ প্রকল্পকে এবার বেছে নিয়েছে জিসিএ। এর মধ্যে রাঙামাটি জেলা পরিষদ ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব’ ক্যাটাগরিতে এই পুরস্কার পেল।
গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত আটটায় জলবায়ু সম্মেলনে এ পুরস্কার গ্রহন করেন রাঙামাটি জেলা পরিষদের প্রতিনিধি অরুনেন্দু ত্রিপুরা। উক্ত পুরস্কারের অর্থমূল্য ১৫ হাজার পাউন্ড যা বাংলাদেশী টাকায় ১৮ লাখ।

বিজ্ঞাপণ
রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের পক্ষে পুরষ্কার গ্রহন করছেন পরিষদের প্রতিনিধি অরণেন্দু ত্রিপুরা। ছবি- সংগৃহীত। 

জুরাছড়ির নারীদের এ উদ্যোগ নিয়ে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেছেন, ‘উদ্যোগটি স্থানীয় ও প্রথাগত ব্যবস্থাপনার এক সম্মিলিত রূপ। প্রান্তিক পর্যায়ে জলবায়ু অভিযোজনের জন্যই এটি করা হয়েছে। তাদের এই উদ্যাগ শুধু টেকসই–ই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় এ উদ্যোগ যথাযথভাবে এবং কার্যকরভাবে অন্যরাও অনুসরণ করতে পারে।’

মূলত বৈশ্বিক জলবায়ু অভিযোজন নিয়ে কাজ করা বৃহত্তম সংস্থার নাম গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপটেশন (জিসিএ)। এই সংস্থাটির সদর দপ্তর নেদারল্যান্ডসের রটেরড্যামে। প্রতিষ্ঠানটির কো-চেয়ার জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন। মোট চারটি ক্যাটাগরিতে এবার পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। সেগুলো হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব, আর্থিক সুশাসন, সক্ষমতা এবং জ্ঞান ও স্থানীয় উদ্ভাবন। এবারে পুরষ্কার পাওয়া রাঙামাটি জেলা পরিষদ ছাড়া বাকি তিনটি পুরস্কার পাওয়া প্রতিষ্ঠানসমূহ হলো ভারতের পুনের বেসরকারি সংগঠন স্বয়াম শিক্ষণ প্রয়োগ, নেপালের বেসরকারি সংগঠন কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি ফোরাম, নেপাল (সিডিএএফএন) এবং কেনিয়ার সংগঠন অ্যাডাপটেশন কনসোর্শিয়াম।

জুড়াছড়ির নারীদের সেই উদ্যোগ:
পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের পানির কষ্টের কথা নতুন নয়। থানচির প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে রাঙ্গামাটির সাজেক, জুড়াছড়ি, বরকলসহ নানা অঞ্চলের প্রত্যন্ত পাহাড়ী জনপদের আদিবাসীরা প্রায় সারা বছর পানির কষ্টে থাকে। পানি সংগ্রহনের এই কষ্ট বেশির ভাগ পোহাতে হয় আদিবাসী নারীদেরকেই। কেননা নারীরায় গৃহস্থালীর পানি সংগ্রহ করে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ছড়ার পানি কমে এলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞাপণ

অনেক সময় বহু মাইল হেঁটে এই নারীদেরকে ছড়ার পানি সংগ্রহ করতে যেতে হয়। কিন্তু ২০১৭ সালে প্রবল ভূমিকম্পে ছড়া নষ্ট হয়ে যায় । ফলে জুরাছড়ি সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরত্বের চৌমহনী, বাদলপাড়া, লক্ষ্মী মেম্বার পাড়া, এনকে পাড়া ও চেয়ারম্যান পাড়ার কয়েকটি গ্রামের পানির কষ্ট আরো বেড়ে যায়।

এ নিয়ে গত বছর এসব গ্রামে জলবায়ু সহিষ্ণুতা প্রকল্পের কাজ নিয়ে এলাকাগুলোতে কাজ শুরু করে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ। এ কাজে তাদের সহযোগিতা করে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও ডেনমার্ক উন্নয়ন করপোরেশন (ডানিডা)। প্রয়োজনীয়তার তাগিদ থেকে পানির কষ্ট লাঘরের জন্য কোনো প্রকল্প নেওয়ার কথা যখন বলা হলে তখন একজোট হয়ে এসব গ্রামের নারীরা তাদের উদ্যোগের কথা জানান। পাঁচ গ্রামের প্রতিটি থেকে একজন পুরুষ ও একজন নারী নিয়ে মোট ১০ জনের একটি কমিটি করা হলো। এ কমিটির নাম কমিউনিটি রেসিলিয়ান্স কমিটি (সিআরসি)। উক্ত উদ্যোগের সাথে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, হেডম্যান (মৌজাপ্রধান) ও কার্বারিরাও (পাড়াপ্রধান)ও অংশ নিলেন।

এর পর ভূগর্ভস্থ পানি ওঠানোর জন্য গভীর নলকূপ স্থাপিত হল বাদলপাড়া গ্রামে। স্থাপন করা হল পাঁচ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার পানির ট্যাংক। সেখান থেকে পাইপ দিয়ে গ্রামগুলোতে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হল। তবে কিছু গ্রামে এখনো পানি যায়নি। সেখানকার নারাীরা বাদলপাড়ায় এসে পানি নিয়ে যান বলে জানা যায়।

এ নিয়ে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহকারী আবাসিক প্রতিনিধি প্রসেনজিত চাকমা বলেন, ‘নারী-পুরুষনির্বিশেষ স্থানীয় অধিবাসীদের পাশাপাশি এই কমিটিতে যুক্ত। কিন্তু এর নেতৃত্বে নারীরা। এটিই এ প্রকল্পের অভিনবত্ব।’

এ প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য বিষয় ছিল, স্বল্প খরচে পানি উত্তোলন করতে হবে। বিদ্যুতের দিকে চেয়ে থাকলে হবে না, তাই সৌরবিদ্যুতে ভর করেই হলো নলকূপ স্থাপন। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় একটি কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়। জিসিএর স্বীকৃতি অর্জনে এই বিষয়টিও কাজ করেছে।

জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত আন্তসরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) সাবেক লিড অথর আতিক রহমান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামের নারীদের এই স্বীকৃতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জিসিএর এই স্বীকৃতি আমাদের নীতিনির্ধারকদের তো বটেই, বিশ্বকেও আমাদের সাফল্যের বার্তা দেবে।’

এখন এই নলকূপ পরিচালনা কমিটি নলকূপ পরিচালনা করে। নারীরা একটি তহবিল গঠন করেছেন, যা দিয়ে নলকূপ প্রয়োজনীয়তা বুঝে নলকূপ সারাইয়ের কাজ হবে। এসবই দেখভাল করেন নারীরা। পানির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট এখন অতীত বলেও মনে করছেন স্থানীয় নারীরা।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। সেই বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকার নারীদের একটি প্রকল্পের এই স্বীকৃতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি-বেলার প্রধান নির্বাহী ও মিসরের জলবায়ু সম্মেলনে অংশগ্রহনরত সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক ভাবনা আর স্থানীয় পর্যায়ে কাজ—এই ভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে জুরাছড়ির নারীদের এ উদ্যোগে। আশা করি, সরকার এতে উদ্বুদ্ধ হবে। আর কয়লাসহ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগোবে।’

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please Disable Your Ad Blocker.