মতামত ও বিশ্লেষণ

আদিবাসী নারীর উপর সহিংসতার সামগ্রিক চিত্রঃ ফাল্গুনী ত্রিপুরা

ভূমিকাঃ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় প্রায় ৫৪টির অধিক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। তন্মধ্যে ১৪টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ৩ পার্বত্য চট্টগ্রামে (খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি এবং বান্দরবান) বসবাস এবং বাকী আদিবাসী জনগোষ্ঠী দেশের সমতলে যেমন উত্তরবঙ্গে (রাজশাহী-দিনাজপুর অঞ্চল), মধ্য উত্তরে (ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল), উত্তর-পূর্বদিকে (বৃহত্তর সিলেট), দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিমদিকে (কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বৃহত্তর বরিশাল ও খুলনা) বসবাস রয়েছে। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে ২৭টি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ১৫ লাখ ৮৬ হাজার ১৪১ জন মানুষ বাস করে। এরা মোট জনসংখ্যার ১.১ %। ২০০১ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৪ লাখ ১০ হাজার ১৬৯। এসব আদিবাসী নারী সমাজের উপর যুগ যুগ ধরে পারিবারিক, সামাজিক, সাম্প্রদায়িক ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্য, বঞ্চনা ও নিপীড়ন চলে আসছে।
ভৌগলিকগত অবস্থানগত এবং প্রান্তিকতার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম বা সমতলের আদিবাসীদের জীবনধারা কঠিন সংগ্রামের মধ্যে টিকে আছে। সারা দেশব্যাপী আদিবাসীদের বৈষম্য এবং বঞ্চনার চিত্রও একই। বৈষম্য, মানবাধিকার লঙ্ঘন, ভূমি দখল, বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ভূমি দখল আদিবাসী এলাকায় সেটেলারদের বসতিস্থাপন, সামরিক শাসন, আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমিতে বনায়ন, আদিবাসী এলাকায় খনিজ সম্পদ উত্তোলনের ফলে ভূমি থেকে উচ্ছেদকরণ, আদিবাসী এলাকায় উন্নয়নের নামে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ যেমনঃ বাঁধ, ইকো-পার্ক, জাতীয় উদ্যান, সংরক্ষিত বন এমনকি আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় সামরিক প্রশিক্ষন স্থাপন তাদেরকে আরো বেশি প্রান্তিকায় ঠেলে দেয়। এমতাবস্থায় সামাজিক প্রেক্ষাপটে আদিবাসী নারীরা খুবই প্রান্তিক অবস্থায় বসবাস করে । আদিবাসী নারীরা জাতিগত, লিঙ্গগত, ভাষাগত, ধর্মীয়গত এবং শ্রেণীগত কারণে বৈষম্যের শিকার হয়। এসব কারণে বাংলাদেশের আদিবাসী নারীরা বিভিন্ন ভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়।
জাতীয় আইনে আদিবাসী নারীর অবস্থাঃ
১৯৭১ সালে পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশের জন্ম হলেও ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানে আদিবাসীদের কোন অধিকারের কথা উল্লেখ ছিল না। ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ২৩৯(ক) ধারা সংযোজন করা হয়। সংবিধানের ২৩ ক-তে রাষ্ট্র দেশের বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণের কথা উল্লেখ আছে। অন্যদিকে অনুচ্ছেদ ২৭ এ সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান ও সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী এবং অনুচ্ছেদ ২৮(১) এ কেবল ধর্ম,গোষ্ঠী, বর্ণ নারী পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি বৈষম্য মূলক আচরণ না করা এবং তাদের জন্য বিশেষ বিধি প্রণয়নের কথা উল্লেখ আছে সংবিধানে।
পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাংলাদেশ সরকার আদিবাসীদের সাংবিধানিক অধিকার আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে। যদিও বাংলাদেশ সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণের কথা উল্লেখ আছে। ফলে সরকার আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার না করে যে পারিভাষিক শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন তা দেশের আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়।
তাছাড়া পঞ্চদশ সংশোধনীতে বলা হয়েছে বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালী এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলে পরিচিত হবেন যদিও বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠী থেকে জাতিগত পরিচিতি, সংস্কৃতি, প্রথা, ভাষা ও সমাজ ব্যবস্থা ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান রয়েছে। সরকারের এই ধরনের পারিভাষিক শব্দ ব্যবহারের ফলে আদিবাসীরা বিশেষ করে সমতল অঞ্চলের আদিবাসীরা নারী পুরুষ উভয়ই বৈষম্যের শিকার হয়।
২০১০ সালে প্রণীত ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনে দেশে ২৭টি ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীর কথা বলা হলেও বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম সহ আদিবাসী আন্দোলনকর্মীরা দেশে ৫৪ টির অধিক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী রয়েছে বলে দাবি করেন। এছাড়া আদিবাসী সংক্রান্ত সংসদীয় ককাস বাংলাদেশের আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক আইন প্রনয়নের একটি প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনা করছেন এবং প্রস্তাবিত আইনের অধীনে আদিবাসীদের জন্য একটি আলাদা কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১ তে আদিবাসী নারীদের জন্য অনগ্রসর ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নারীর জন্য বিশেষ কার্যক্রমের ব্যবস্থা গ্রহণের কথা উল্লেখ আছে। এছাড়া এই নীতিমালায় আদিবাসী নারীদের জন্য স্পষ্টভাবে কিছু বলা হয়নি। এই নীতিমালা গ্রহণের সময় আদিবাসী নারী প্রতিনিধিত্বের কোন অংশগ্রহন বা মতামত গ্রহণ করা হয়নি। নারী উন্নয়ন নীতিমালা প্রকাশের পর আদিবাসী নারী নেতৃবৃন্দ আলাদা একটা অধ্যায়ের দাবি জানিয়ে আসছে। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন ২০০০ এর অধীনে তিন পার্বত্য জেলায় (খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটি) সেখানকার স্থানীয় নারী ও শিশু নির্যাতন বিষয়ে ন্যায্য বিচারের প্রাপ্তির ক্ষেত্রে তিনটি পৃথক আদালত গঠন করা হয়েছিল। প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতা, প্রশাসন ও পুলিশের অসহযোগিতা, মামলা চালানোর জন্য অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী নারীসহ মূলধারার নারী নির্যাতন কমেনি বরং আরো বেড়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশ দন্ডবিধি ১৮৬০, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (২০০৩ সনে সংশোধিত) এবং এসিড অপরাধ আইন ২০০২ (২০০৬ সনে সংশোধিত)-এ নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রতিকার লাভের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রাখা আছে। ২০১০ সালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন এবং ২০১০ সালে পারিবারিক সহিংসতা (নিবারন ও সুরক্ষা) আইন প্রণীত হয়। বাংলাদেশ মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন (২০১২) এ মানব পাচারকে একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করে এর শাস্তি বৃদ্ধি করে।
এছাড়া আরো কিছু আইনি ব্যবস্থা আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর অবস্থা উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে। যেমন-যৌতুক নিবারণ আইন (১৯৮৬ সালের সংশোধনীসহ), পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ (১৯৮৫), ২০০৯ সাল থেকে হাইকোর্টের বিভিন্ন নির্দেশনায় নারী-পুরুষ বৈষম্য নিরসনের প্রসঙ্গ যেমন- পাবলিক প্লেস বা উন্মুক্ত স্থানে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে গাইড লাইন প্রণয়নের নির্দেশনা (২০১০) ইত্যাদি।
সিডওঃ সিডও সনদে স্বাক্ষর করা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ নারীর বিরুদ্ধে সব ধরনের বৈষম্য বিলোপে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেও নারী-পুরুষের প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে আদিবাসী নারীকে লক্ষ্য করে বিশেষ কোনো প্রচেষ্টা নেওয়া হয়নি। গত ৮ নভেম্বরে জেনেভায় অনুষ্ঠিত সিডও’র অষ্টম পর্যবেক্ষন পর্বে সিডও কমিটি উল্লেখ করেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে জেন্ডার সংশ্লিষ্ট ধর্ষণসহ যে সকল মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে তা ভূমি সমস্যার সাথে জড়িত বলে উল্লেখ করেন এবং রাষ্ট্রকে এক্ষেত্রে পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেন।
ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ (ইউপিআর)ঃ জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের ইউপিআর এর দ্বিতীয় চক্রের অধিবেশনে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও সরকারের প্রথম চক্রের সুপারিশসমূহের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। এই পর্যালোচনার ফলাফলে দেখা যায় বাংলাদেশ কর্তৃক গৃহীত ইউপিআর প্রথম চক্রের আদিবাসীদের মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট সুপারিশসমূহের কোনটিই বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। ইউপিআর দ্বিতীয় চক্রের অধিবেশনে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর দেয়া ১৯৬টি সুপারিশের মধ্য থেকে ১৬৪টি সুপারিশ বাংলাদেশ সরকার গ্রহণ করে। তন্মধ্যে মেক্সিকো, ডেনমার্ক, অস্ট্রেলিয়া, ইকুয়েডর, ভ্যাটিকান সিটি ও স্লোভাকিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিসহ আদিবাসী নারী ও শিশুদের প্রতি সকল ধরনের সহিংসতা ও বৈষম্যের হাত থেকে রক্ষা করতে সঠিক এবং কার্যকর কর্মদ্ধতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করে।
আদিবাসী নারীর উপর সহিংসতা ও ন্যায্য বিচার প্রাপ্তি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিঃ আদিবাসী নারী ও কন্যা শিশুদের প্রতি সহিংসতার মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। চলতি বছরের শুরুতে বিভিন্ন বয়সের আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা বা হত্যার চেষ্টা, পাচারের চেষ্টা, শারীরিক লাঞ্চনার শিকার হয়েছেন। মানবাধিকার সংস্থা কাপেং ফাউন্ডেশনের অনুসন্ধানী তথ্য মতে, ২০১৬ জানুয়ারী থেকে জুন পর্যন্ত মোট ২৪টি (২৪ জন নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে) বিভিন্ন ধরনের সহিংসতায় আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশু বিভিন্ন ধরণের শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২৪ টি ঘটনার মধ্যে ১৪টি সমতল অঞ্চলে, বাকী ১০টি পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি ঘটনার মামলা দায়ের করা
কাপেং ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, ২০০৭ সালের জানুয়ারী থেকে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কমপক্ষে ৪৬৬ টি ঘটনার আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর নির্যাতনের প্রতিবেদন নথিবদ্ধ হয়েছে। উল্লেখ্য যে, নির্যাতনের শিকার আদিবাসী নারী ও কন্যা শিশুদের বয়স ৩ থেকে ২৪ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। সবচেয়ে বড় কথা নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের যে পারিপার্শ্বিকতার অবস্থার সম্মুখীন হতে হয় তা উত্তোরনের জন্য এখন পর্যন্ত সেরকম কোনো ব্যবস্থা বা পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ নেই।
উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে ৫৪টির অধিক জাতিগোষ্ঠীর ৩০ লক্ষ আদিবাসীর বসবাস রয়েছে যাদের অর্ধেক অংশ নারী। আদিবাসী নারী সমাজের উপর যুগ যুগ ধরে পারিবারিক, সামাজিক, সামপ্রদায়িক ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্য, বঞ্চনা ও নিপীড়ন চলে আসছে। বাংলাদেশের আদিবাসীরা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হওয়ায় আদিবাসী নারীরা আরো বেশি প্রান্তিকতার শিকার। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত নারীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য সরকারী পর্যায়ে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণে বা নীতি নির্ধারণের পর্যায়ে প্রান্তিক ও সুবিধা বঞ্চিতদের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় সরকারী উন্নয়ন কর্মসূচীগুলোতে আদিবাসী নারীরা অগ্রাধিকার পান না। আদিবাসী নারী নেত্রীরা অভিযোগ করেন, জাতীয় পর্যায়ে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা মোকাবেলার অনেক পরিকল্পনা ও আইন থাকলেও তা আদিবাসী নারী বান্ধব নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভূমি বিরোধ ও সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনের কারণে সংখ্যালঘু আদিবাসী নারীরা সহিংসতার শিকার এবং অধিকাংশ ঘটনাই অ-আদিবাসী দ্বারা সংঘটিত হয়ে থাকে। কাপেং ফাউন্ডেশন আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার মূল কারণ হিসেবে সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়া, অপরাধীদের বিচার না হওয়া, দীর্ঘায়িত ও অসহযোগিতামূলক আইনী ব্যবস্থাকে দায়ী করেছে।
লক্ষ্য করা যায়া যায়, যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের ডাক্তারী পরীক্ষার ক্ষেত্রে চলে নানা তালবাহানা। অধিকাংশ মেডিক্যাল পরীক্ষার সার্টিফিকেট ভিকটিমের হাতে দেওয়া হয়না। মেডিক্যাল পরীক্ষাগুলো যথাসময়ে করা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। মূলত আলামত যাতে নষ্ট হয়ে যায় বা যাতে নেগেটিভ ফলাফল দেয়া যায় সেজন্য দেরীতে মেডিক্যাল পরীক্ষা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
আদিবাসী নারীর উপর সহিংসতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল এসব মানবতাবিরোধী সহিংসতায় জড়িত অপরাধীদের বিচারের আওতায় না আনা। এভাবে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ায় সারা দেশে আদিবাসী নারী ও শিশুর উপর সহিংসতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বিচারহীনতা যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বৃদ্ধির সবচেয়ে মারাত্মক অনুষঙ্গ হিসেবে ভূমিকা পালন করছে।
কাপেং ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় (২০১৩) দেখা গেছে, আদিবাসী নারীর উপর সহিংসতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হল রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক নীতি, দোষীদের দায়মুক্তি অর্থাৎ শাস্তির আওতায় না আনা, বিচার বিভাগের প্রলম্বিত বিচার প্রক্রিয়া ও বিরুপ পরিবেশ, বিচার ব্যবস্থা সর্ম্পকে আদিবাসীদের সচেতনতার অভাব ও অনভিজ্ঞতা, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্নীতি ও অনিয়ম, আদিবাসীদের দুর্বল প্রথাগত অনুষ্ঠান, ভূমি জবরদখল ও ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়া, সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত আইনি ও বস্তগত সহায়তার অভাব, ঘটনার অব্যাহত অনুগামী কর্মসূচী ও পরিবীক্ষণের অভাব, ঘটনার শিকার পরিবারের নিরাপত্তার অভাব, জাতীয় মানবাধিকার ও নারী সংগঠনের বলিষ্ঠ ভূমিকার অভাব ইত্যাদি।
বস্তুত আদিবাসী নারীর উপর সহিংসতার পেছনে অন্যতম একটি লক্ষ্য হল পাশবিক লালসার পাশাপাশি আদিবাসীদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি করা, আতঙ্কে সৃষ্টি করে তাদের জায়গা জমি থেকে বিতাড়ন করা এবং চূড়ান্তভাবে তাদের জায়গাজমি দখল করা। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর ১৭ বছর পার হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ এখনো নিষ্পত্তি না হওয়ায় সেটেলার বাঙালী কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীর উপর সহিংসতাসহ ভূমিকে কেন্দ্র করে আদিবাসীদের উপর প্রতিনিয়ত হামলা, হত্যা, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি মানবতা বিরোধী কার্যকলাপ সংঘটিত হচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি-উত্তরকালেও পাহাড়ী নারী সমাজের উপর জাতিগত নিপীড়ন ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রধান কারণ হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হওয়া। এরমধ্যে অন্যতম কারণ হল পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী অধ্যুষিত বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সরকারের কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা। পক্ষান্তরে সরকারের বিভিন্ন মহল কর্তৃক সেটেলার বাঙালীদের পুনর্বাসন; সেটেলার বাঙালীদের গুচ্ছগ্রাম সম্প্রসারণ, ভূমি জবরদখলে সেটেলার বাঙালিদেরকে মদদ দান; রোহিঙ্গা শরণার্থীসহ বহিরাগতদের পার্বত্য চট্টগ্রামের ভোটার তালিকায় অন্তভুর্ক্তকরণ, পার্বত্য চুক্তিকে লঙ্ঘন করে সেটেলার বাঙালীদের অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসেবে গণ্য করে টাস্কফোর্স কর্তৃক পুনর্বাসনের উদ্যোগ, জেলা প্রশাসন কর্তৃক স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদান; চাকুরি ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা প্রদান; বহিরাগতদের নিকট অব্যাহতভাবে ভূমি বন্দোবস্তী ও ইজারা প্রদান ইত্যাদি পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিপন্থী কার্যক্রম বাস্তবায়র করা হচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী জুম্ম নারীর উপর সংঘটিত যৌন হয়রানি, ধর্ষণ হত্যা ও অপহরণের বিরুদ্ধে যতগুলো মামলা হয়েছে তার কোন উদাহরণ নেই যে দোষী ব্যক্তিরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেয়েছে। দেশের সমতল অঞ্চলে দু/একটি মামলার আদালত অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত ও শাস্তির রায় দিলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে অধিকাংশ ঘটনায় ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ফলশ্রুতিতে অপরাধীরা সম্পূর্ণভাবে দায়মুক্তি পেয়ে থাকে। ফলে সহিংসতার শিকার আদিবাসী নারীরা ন্যায় ও সুবিচার থেকে বরাবরই বঞ্চিত হয়ে আসছে।

ফাল্গুনী ত্রিপুরা, মানবাধিকার কর্মী ও সমন্বয়কারী, বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক
(গত ২১ ডিসেম্বর ২০১৬ কাপেং ফাউন্ডেশন আয়োজিত আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর উপর নির্যাতন প্রতিরোধ পরামর্শ সভায় পঠিত ধারণাপত্র)

বিজ্ঞাপণ

Back to top button